নীড় পাতা » পাহাড়ে নির্বাচনের হাওয়া » চ্যালেঞ্জে পাহাড়ের তিন হেভিওয়েট

চ্যালেঞ্জে পাহাড়ের তিন হেভিওয়েট

Pic-cover-01পার্বত্য জেলা রাঙামাটি,খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান। এর মধ্যে রাঙামাটিতে দীপংকর তালুকদার আর বান্দরবানে বীর বাহাদুর দীর্ঘ দুইযুগ ধরেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী এবং বীর বাহাদুর প্রতিবারই বিজয়ী আর দীপংকরও একবার ছাড়া প্রতিবারই। পার্বত্য আরেক জেলা খাগড়াছড়িতে নানাসময় প্রার্থী বদল হলেও এবারের প্রার্থী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরাও বেশ শক্ত প্রতিদ্বন্ধি এবং জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে নির্বাচনের মাছে নেমেছেন। ফলে নানান হিসাবে এবার আওয়ামী লীগের তিন প্রার্থীই বেশ হেভিওয়েট।

কিন্তু বাস্তবতা হলো,সারাদেশে প্রধানবিরোধী দল বিএনপি নির্বাচন না করায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা প্রায় বিনাপ্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বাচিত হলেও পাহাড়ে এসে ভোটের এই হিসাবটা ঠিক যেনো বিপরীত। এখানে বিএনপি নির্বাচন না করায় বেকায়দায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। শুধু বেকায়দায়ই নয়,বিপাকেও। কারণে ভোটার হিসেবের যে মেরুকরণ তাতে বিএনপির নিজস্ব ভোটের পাশাপাশি রয়েছে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোরও বিশাল ভোট ব্যাংক। সেই ভোট এককভাবে কোন প্রার্থীর জয়ে ভূমিকা রাখতে না পারলেও পরাজয়ে ঠিকই ভূমিকা পালন করতো এতোদিন। কিন্তু জাতীয় প্রধান দুই দলের ভোট কাটাকাটির ইস্যুতে সুবিধা করতে পারতোনা আঞ্চলিক দলগুলো। এবার হিসাব একেবারেই ভিন্ন। বিএনপি নির্বাচন না করায় মাঠে নেমে গেছে আঞ্চলিক দলগুলো,শুধু নেমে পড়াই নয়,তারা বেশ শক্তভাবেই এগিয়েছে,তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংকের পাশাপাশি যোগ হচ্ছে বিএনপির ভোটারদের একটি অংশের নেপথ্যে সহযোগিতা। ফলে ভোটের এতোদিনের হিসাবটা এবার যেনো উল্টে যাচ্ছে আর বিপাকে ফেলে দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের।

পাহাড়ে ভোটের এবারকার চালচিত্র বেশ চিন্তায় ফেলেছে আওয়ামী লীগকে। ফলে বেকায়দায় পড়া দলটি এবার নিজেরাও শুরু করেছে ‘পাহাড়ী-বাঙালী’ ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি। পেশাদার রাজনীতিবিদ দীপংকর তালুকদারও এখন প্রকাশ্যে প্রতিপক্ষ আঞ্চলিক দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাস’ ‘চাঁদাবাজির’ অভিযোগ তুলছেন,করছেন বিষোদগারও। আবার চিরকালই যে পুনর্বাসিত বাঙালীদের ‘অচ্ছ্যুত’ হিসেবে মূল্যায়ন করে এসেছে পাহাড়ী যে আঞ্চলিক দলগুলো,তারাও এখন ভোটের জন্য যাচ্ছেন তাদের দ্বারে দ্বারে। ফলে এবার নির্বাচনের হিসাবটা যেনো বেশ জটিল মেরুকরণে আটকে যাচ্ছে। ভোটের রাজনীতি মানুষের দুরত্ব যেমন কমাচ্ছে,বাড়াচ্ছে উদ্বেগও। কারণ কোন প্রার্থী বিজয়ী হচ্ছেন তা নিয়ে জাতিভেদে ভোটারদের মধ্যেও রয়েছে অজানা আতংক আর সংশয়।

আর পাহাড়ী তিন জেলাতেই বিএনপিতে রয়েছে প্রকাশ্য গ্রুপিং। এই বিভক্তির কারণে বিএনপির ভিন্ন ভিন্ন অংশ ভিন্ন ভিন্ন রকম ভূমিকা পালন করছে,একগ্রুপ যে প্রার্থীর দিকে ঝুঁকেছে,বাকীরা স্বভাবতই বিপরীতদিকে ছুটছেন। চলছে চুলছেড়া বিশ্লেষন আর হিসাব নিকাশ।pic-033

১৯৯১ সাল থেকেই রাঙামাটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দীপংকর তালুকদার । ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নেননি আর ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন। এছাড়া ৯১,৯৬ আর ২০০৮ সালে নির্বাচনে জয়ী দীপংকর এবার বেশ বেকায়দায়ই আছেন। বিএনপির মাঠে না থাকার কারণে বাঙালী ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে কতটা যাবেন আর পাহাড়ী ভোটাররা আঞ্চলিক দলগুলোর প্রবল চাপের মুখেও কতটা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন,সেটার উপরই নির্ভর করছে তার জয় পরাজয়। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে পাহাড়ীদের একটি বড় অংশই ক্ষুদ্ধ তার উপর। আর বিগত পাঁচ বছর পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী থাকাকালের অনেকের চাহিদা আর প্রাপ্তি মেটাতে না পারার দায়ও বহন করতে হচ্ছে তাকে। অতীতের প্রায় সব নির্বাচনেই স্পষ্ট ব্যবধানে বিজয়ী দীপংকর এবার তার নৌকা সঠিকভাবে তীরে ভেড়াতে পারেন কিনা তাই এখন দেখার বিষয়।

বান্দরবানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ১৯৯১ সাল থেকে টানা বারবারের বিজয়ী সাংসদ ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের দুই মেয়াদের সাংগঠনিক সম্পাদক বীর বাহাদুর। সেখানে তিনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন নিজ দলের সভাপতি প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যার। দীর্ঘদিনের সভাপতি পদ থেকে বহিঃষ্কৃত হয়েও হাল ছাড়েননি প্রসন্ন। তার পেছনে দাঁড়িয়ে গেছে জনসংহতি সমিতি,বিএনপির একটি বড় অংশ এবং আওয়ামী লীগের বীর বাহাদুর বিরোধী হিসেবে পরিচিত অনেক নেতা। এদের মধ্যে আছেন বান্দরবান পৌরসভার সাবেক দুই মেয়র মিজানুর রহমান বিপ্লব ও আইয়ুব চৌধুরীও। আর দীর্ঘদিন ধরে বীরবাহাদুরের কারণে বিজয় বঞ্চিত বিএনপিও এবার তাকে একটা শিক্ষা দিতে চাইছে। ফলে শেষ পর্যন্ত বীর বাহাদুর এতোসব প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে বিজয়ী হতে পারবেন কিনা তা নিয়ে সংশয়ে তার কর্মীরাও। তবে তাদের বিশ্বাস ঝানু রাজনীতিবিদ বীর বাহাদুর সব বাঁধা পেরিয়ে ঠিকই আবারো নির্বাচিত হয়ে পঞ্চমবারের মতো সংসদে যাবেন।

আরেক পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে গতবারের সাংসদ যতীন্দ্রলাল ত্রিপুরা এবার মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন। এবার তার স্থলে মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও গত পাঁচ বছর ধরে পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালণ করা কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। নির্বাচনে দাঁড়াতে এসে ছাড়তে হয়েছে চেয়ারম্যান পদও। কিন্তু মহাজোটের রাজনীতির জটিল সমীকরণে তাকে বাদ দিয়ে আসনটি দেয়া হয় জাতীয় পার্টির সোলায়মান আলম শেঠকে। মনোনয়ন প্রত্যাহারের আবেদনও করেন তাই সবকূল হারানো কুজেন্দ্র। কিন্তু বিধাতা সহায় হওয়ায় হঠাৎ করেই পাল্টে যায় দৃশ্যপট,অজ্ঞাত কারণে গৃহীত হয়নি তার আবেদন,ফলে আবারো নির্বাচনের মাঠে কুজেন্দ্র এবং তার পেছনেই আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মীরা। কিন্তু মাঠেই থেকে যান সোলায়মান আলম শেঠ।

ফলে এখানে জোটের প্রার্থী দৃশ্যতঃ দুইজন। আর তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্ধি হিসেবে মাঠে আছেন খাগড়াছড়ির প্রভাবশালী আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফ এর প্রধান প্রসিত বিকাশ খীসা। আছেন জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)র প্রার্থী মৃণাল কান্তি ত্রিপুরাও। ফলে এখানেও বেশ চ্যালেঞ্জেই আছেন কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। সোলায়মান আর কুজেন্দ্রর ভোটা কাটাকুটির হিসেবে শেষাবধি প্রসিত বিকাশ খীসার সম্ভাবনাই প্রবল। কিন্তু রাজনীতির শেষ বলে যেমন কোন কথা নেই,তেমনি ভোটার আর ভোটেও শেষ কিছু নেই।

তাই অপেক্ষা ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যা অবধি। যখন নিয়তি নির্ধারিত হবে পাহাড়ের তিন হেভিওয়েট প্রার্থীর। আপাততঃ সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষাই করতে হবে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

২ জেএসএস নেতা হত্যার প্রতিবাদে মহালছড়িতে বিক্ষোভ

রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা) সমর্থিত যুব সমিতির কেন্দ্রীয় নেতাসহ ২ জনকে হত্যার ঘটনার …

Leave a Reply