নীড় পাতা » খাগড়াছড়ি » চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা হলেন পানছড়ির রোমান চাকমা

চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা হলেন পানছড়ির রোমান চাকমা

ভালো বেতনেই চাকুরি করতেন ইউএনডিপি’র মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার একটি প্রকল্পে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে চাকুরি জীবনের ইতি টানেন। বাবার উৎসাহে হয়ে যান একজন কৃষি উদ্যোক্তা। সম্বল ছিল শুধু নিজেদের জমি আর ইচ্ছাশক্তি। সেই জমিতে চাষাবাদ শুরু করেন। উৎপাদিত ফসল থেকে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের কারখানায় মিলিং করা প্রক্রিয়াজাত পণ্য বিক্রয় করতেন। এখন নিজের দোকানঘর, নিজস্ব প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, সহযোগী কর্মচারী সবই হয়েছে। স্ত্রী ও এক মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার স্বাবলম্বী রোমান চাকমার। স্বাধীন পেশায় স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন চলে যাচ্ছে।

এতক্ষণ বলছিলাম খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার বাউড়া পাড়ার সতীশ চন্দ্র চাকমা ও মিনতি খীসা দম্পত্তির অষ্টম সন্তান রোমান চাকমার কথা। পানছড়ি সদর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূর এবং জেলা সদর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরের অনুন্নত গ্রাম কুড়াদিয়াছড়ায় সফল ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তৈল, খৈল, চাল, মশলার উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর কাজ অনেকের জন্য হয়ে উঠেছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

নয় ভাই-বোনের মাঝে অষ্টম রোমান চাকমা। বিএসসি, বিএজিএড পাস। উদ্যোক্তা হওয়ার আগে ইউএনডিপির দীঘিনালা মং সার্কেলের একজন প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ছিলেন। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে অন্যের অধীনস্থ চাকুরি জীবনের ইতি টানেন। ২০১১ সালের দিকে সরিষা নিয়ে কাজ শুরু করেন। শুরুতে বাবার ইচ্ছায় নিজেদের প্রায় ৩ কানি জমিতে সরিষা চাষ করেন। সরিষা বীজ সংগ্রহ করেন পার্শ্ববর্তী দুই উপজেলা দিঘীনালা ও মাটিরাঙ্গার তবলছড়ি থেকে। উৎপাদিত সরিষা খাগড়াছড়ি থেকে মিলিং করে জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় সরবরাহ করতেন। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনেরাও নিতেন। এভাবে খাঁটি সরিষা তেলের ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত বাড়ে।

স্থানীয় চাকুরিজীবীদের অনেকেই সেই মিলিং করা তেল সংগ্রহ করে চট্টগ্রামে আত্মীয়দের কাছে পাঠাতেন। তেলের চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকে। লাভজনক হওয়ায় এই ব্যবসার আরও বেশি সময় দেওয়া শুরু করেন। এক পর্যায়ে চাচা এগিয়ে আসেন। ২০১৭ সালে কুড়াদিয়াছড়া গ্রামে চাচার জায়গায় দেড় লাখ টাকায় গড়ে তুলেন শোভিতা অয়েল অ্যান্ড রাইচ মিল। এখন কাজ করেন তৈল, খৈল, চাল, মশলা নিয়ে। সরিষা প্রক্রিয়াজাতকরণ করার জন্য ২ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি মেশিনও কিনেন। কিন্তু পুঁজির অভাব ও ইতোমধ্যে সরিষার মৌসুম শেষ হওয়ায় সেটি প্রথম বছর ব্যবহার করতে পারেননি।

রোমান চাকমা বলেন, তেল তৈরির কাঁচামাল সরিষার উৎপাদন স্থানীয়ভাবে যতটুকু হয়, তা দিয়ে স্থানীয় চাহিদা মিটে না। উৎপাদিত সরিষার বেশকিছু অংশ শহরে চলে যায়। গতবছর ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজনকে উদ্বুদ্ধ ও বীজ সরবরাহ করায় সরিষা চাষী বেড়েছে। তারপরও চট্টগ্রাম থেকে আনতে হয়। এতে খরচ বেড়ে যায়। স্থানীয়ভাবে যদি সরিষার উৎপাদন বাড়ানো যায় তাহলে আরও কম দাম দামে খাঁটি সরিষার তেল গ্রাহকদের হাতে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

তিনি আরও জানান, আগে যেখানে প্রতি মন সরিষা ২৪০০-২৬০০ টাকায় কেনা যেতো এখন তা প্রায় ৩২০০ টাকা পড়ে। সাথে পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ আছে। যেমন, আমার এখানে কিছুদিন আগে দুইজন শ্রমিক কাজ করতো। এখন একজন আছে। দৈনিক ৫০০ টাকা করে তাকে দিই। এসব কিছু মিলিয়ে প্রতি লিটার সরিষা তেল ২৫০ টাকা বিক্রি করি। এটি ভেজালহীন। বাজারের অন্যান্য তেলের তুলনায় ভালো। অন্যদিকে এর উচ্ছিষ্ট থাকে খৈল। তৈলের পাশাপাশি সরিষার নির্যাসগুলিকে খৈল বলা হয়ে থাকে। এই খৈলের চাহিদাও অনেক। পশুখাদ্য হিসেবে বিশেষ করে দুগ্ধবতী গরুকে খৈল খাওয়ানো হলে দুধের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় তাই গবাদিপশু পালকরা এই খৈল নিয়ে যান। ১ মন সরিষা প্রক্রিয়াকরণ করলে ১৩-১৫ কেজি তেল উৎপাদন হয়। খৈল বিক্রয় থেকেও আয় হয়।

স্থানীয় মিলিং করা এই তেলের বেশ চাহিদা রয়েছে। মানুষজন নিজেরাই এসে কারখানা থেকে তেল নিয়ে যায়। কারণ এখানে তাদের চোখের সামনেই সরিষা থেকে তেল বের করা হয়। এই তেলে কোন ভেজাল থাকে না ফলে মানুষ খুব উৎসাহ, আস্থার সঙ্গে নিয়ে যান। শোভিতা অয়েল অ্যান্ড রাইচ মিলের একজন নিয়মিত ক্রেতা উপজেলা সদরের সাঁওতাল পাড়ার বাসিন্দা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক লিটন দাশ। তিনি জানান, প্রতি মাসে ২-৩ লিটার সরিষা তেল নিই। বিশেষ আয়োজন থাকলে আরো বেশি নেওয়া হয়। খাঁটি সয়াবিন খুব একটা খারাপ না। কিন্তু বাজারের সকল ভোজ্য সয়াবিন তেল ৮০-৯০ শতাংশ পামওয়েল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থযুক্ত। যা দেহের জন্য নীরব ঘাতক। ক্ষতিকর কোলেস্টেরল যুক্ত, হৃদরোগের ঝুঁকি সৃষ্টিকারী, দেহের স্থূলতা বাড়ায়। স্থূলতা কমাতে বাধা সৃষ্টি করে।

আগামী দিনের পরিকল্পনা কী? জানতে চাইলে উদ্যোক্তা রোমান বলেন, কারখানাকে আরও বড় করার স্বপ্ন দেখি। সরিষা তেলের পাশাপাশি সূর্যমুখী তেল উৎপাদন করার পরিকল্পনা আছে। আমার আগ্রহের কথা পানছড়ি উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসকে জানিয়ে তাদের সহযোগিতা কামনা করেছি। সুযোগ এলে তারা ভবিষ্যতে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

পানছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্র জানা যায়, উপজেলায় তৈল ফসলের মধ্যে সরিষা চাষ হয়। বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষ হয়না। গত মৌসুমে পানছড়িতে ৪০ হেক্টর জমিতে ৫৬ টন সরিষা উৎপাদিত হয়েছিল। পানছড়ি উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা অরুনাংকর চাকমা বলেন, চাষীরা মূলতঃ তেলের চাহিদা মেটানো এবং আমন এবং বোরো মৌসুমের মাঝামাঝি সময়টাতে পতিত জমি ব্যবহার করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য সরিষা চাষ করে। আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ম্যাগনেসিয়াম সরিষার তেলে বিদ্যমান। চুলের বৃদ্ধিতে সরিষার তেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সূর্যমুখী চাষাবাদের জন্য আমাদের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামার বাড়ি, ঢাকাতে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। আশা করি, আগামী মৌসুমেই পানছড়িতে সূর্যমুখীর চাষ শুরু হবে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা হলেন দীপংকর তালুকদার

বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদ রাঙামাটি জেলা শাখার প্রধান উপদেষ্টা হয়েছেন খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী …

Leave a Reply