নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » চর্চার অভাবে ম্লান বিজু উৎসবের রীতিনীতি

চর্চার অভাবে ম্লান বিজু উৎসবের রীতিনীতি

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে চাকমাদের বিজু উৎসবের প্রচলিত রীতিনীতিগুলো চর্চার অভাবে দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে। এই রীতিনীতির সাথে নতুন প্রজন্মের তেমন একটা পরিচিতি নেই বললেই চলে। চর্চার অভাবে অদূর ভবিষ্যতে বিজু উৎসবের রীতিনীতিগুলো একেবারে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখনই সময় এসেছে নতুন প্রজন্মের কাছে বিজুর রীতিনীতির পরিচিতি তুলে ধরা।
খুব একটা বেশী সময়ের ব্যবধান নয়। আশির দশকের শুরুর দিকের কথা। যদিও আশির দশকের প্রথমভাগ পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য খুব একটা সুখকর ছিল না। তারপরও সেই সময়ে অনুকুল পরিস্থিতির সময়েই যতটুকু পেরেছি উৎসবের দিনগুলোতে আনন্দে মেতে উঠতে। আমার বেড়ে উঠা এক প্রত্যন্ত গ্রামে। যখন থেকে কিছু কিছু বুঝতে, মনে রাখতে ও জানতে শিখছি তখন থেকে গ্রামের বন্ধু—বান্ধবদের সাথে আমার বিজু উৎসবে মেতে উঠা। সেই সময়ে বিজু উৎসব আসলে অন্যরকম এক আনন্দ আর নতুন জামা কাপড় পাওয়ার অনুভূতি। সারাটা বছর অপেক্ষা করতাম বিজু’র দিনগুলোর জন্য। আমি জানি না এখনকার ছেলে—মেয়েরা বিজুর দিনগুলোতে কি রকম আনন্দ ও অনুভূতি খুঁজে পায়!
প্রসঙ্গত বলতে হয়, চাকমা জনগোষ্ঠীরা সাধারণত তিন দিনের বিজু উৎসব পালন করে থাকে। তা হল ফুল বিজু, মুল বিজু ও গজ্যাপজ্যা বিজু।
বিজু শুরুর আগেই আমরা গ্রামের সমবয়সী বন্ধু—বান্ধবরা মিলেই ঠিক করতাম বিজু’র দিনে কি করবো, কোথায় কোথায় ঘুরবো ইত্যাদি। তারপর প্ল্যানিং অনুযায়ী বিজু’র প্রথম দিন অর্থাৎ ফুল বিজু’র দিনে আমরা খুব খুব ভোরে ওঠে গ্রামের যত ফুল গাছ বা বনফুল রয়েছে সংগ্রহ করে প্রথমে কলা পাতায় সুন্দর করে সাজিয়ে নদীতে জলদেবের উদ্দেশে ফুল ভাসিয়ে দিতাম। এরপর নদীতে ডুব দিয়ে গোসল ও বিজু গুল খাওয়ার চেষ্টা করতাম। যদিও আমাদের বয়োঃজ্যৈষ্ঠরা বলতেন, পানিতে ডুব দিলে বিজু গুল খাওয়া যায়। এ কথায় আমরা খুব আগ্রহ ভরে পানিতে ডুব দিয়ে বিজু গুল খাওয়ার চেষ্টা করতাম। আসলে বয়োঃ জ্যৈষ্ঠরা আমাদেরকে গোসল করার জন্য প্রলোভন দেখাতেন যাতে আমরা গোসল করি। এরপর সংগ্রহ করা ফুল দিয়ে আমরা যে যার বাড়ির আঙিনা সুন্দর করে সাজাতাম। এছাড়া গ্রামের বয়োঃজ্যৈষ্ঠদের আর্শীবাদ নিতাম ও তাঁদের øান করাতাম। নতুন নতুন জমাকাপড় পড়ে নিজেরাই বিভিন্ন খেলাধূলায় মেতে উঠে ফুল বিজু’র দিনগুলো কাটিয়ে দিতাম। এছাড়া এই দিনে সন্ধ্যায় নিজেদের বাড়ির আঙিনায় প্রদীপ জ্বালাতাম ও মন্দিরে গিয়ে ভগবান বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা করতাম। তবে ইদানিং বিশেষ করে শহরে বিভিন্ন সংগঠন বা এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে বিজু উদ্যাপন কমিটি গঠন করে দিয়ে ফুল বিজু’র দিনে নানান খেলাধুলা বা অনুষ্ঠানের অয়োজন করা হচ্ছে। এতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলেও নদীতে কলাপাতায় করে ফুল ভাসানো এবং øান বা বিজুগুল খাওয়াসহ বনফুল দিয়ে বাড়ির আঙিনা সাজানোয় বর্তমান প্রজন্ম তেমন একটা পরিচিতি নয়। যা অদূর ভবিষ্যতে এই প্রচলিত রীতিনীতিগুলো হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
মুরগীদের জন্য খাবার ছিটিয়ে দেয়া বাড়ীগুলোতে দলবেধে ও নেচে—গেয়ে আমরা বিজু খাওয়া—দাওয়া শুরু করতাম। বাড়ীর আঙিনায় মুরগীদের খাবার ছিটিয়ে দেয়ার প্রচলিত রীতিনীতিই হল বাড়ীর লোকজনকে জানান দেয়া বা বুঝিয়ে দেয়া যে বাড়ীতে দল বেঁধে ছেলে—মেয়েরা বিজু খাবার খেতে আসবে। আর সেভাবে বাড়ীর গৃহস্থও বিজু’র মজার মজার খাবার আয়োজন করে রাখতেন। তবে আজকাল ছেলে—মেয়েদের মাঝে গ্রামের বাড়ীর উঠোনে গিয়ে মুরগীদের খাবার ছিটিয়ে দেয়ার প্রচলনটি চোখে পড়ে না বললেই চলে। শহরের কথা বাদ দিলাম, গ্রামের মধ্যেও এখন আর এগুলো প্রচলন নেই। আমরা এখনো শুনি গ্রামের বয়োঃজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে এসব রীতিনীতির কথা। এছাড়া চাকমা সমাজে মূল বিজু’র দিনে খাবারের অনেকখানি পরিবর্তনও এসেছে। তবে পাঁচন তরকারিটি সব বাড়ীতে পরিবেশন করলেও বিশেষ করে শহরের বিজু উদ্যাপনে মাংস দিয়ে পোলাওসহ বিভিন্ন মসলা জাতীয় খাবার অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়ে থাকে। তাই এ দিক দিয়েও পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হচ্ছি।
বর্তমানে আমরা আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি যুগের মধ্যে বসবাস করছি এবং তথ্য প্রযুক্তির সাথেও তালমিলিয়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবন যাপন এগুচ্ছে। আবার তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে অনেক কিছুরই পরিবর্তন এসেছে। পাশাপাশি সমাজেও অনেক উন্নতি এবং পরিবর্তন ঘটেছে। এ সব প্রচলিত রীতিনীতিগুলো বাদ দেয়া মানেই হল উৎসবের যে মূল চেতনা থেকে যোজন যোজন দূরে সরে যাওয়ার সমান। তাই চাকমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী প্রধান সামাজিক উৎসব বিজু’র রীতিনীতিগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আবশ্যক। যাতে নতুন প্রজন্ম জানতে পারে, শিখতে পারে ও রীতিনীতিগুলো যুগ যুগ ধরে বহাল থাকে। অবশ্যই তার জন্য সমাজের সচেতন নাগরিকদের উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লংগদুতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিএনপি’র প্রচারপত্র বিতরণ

রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতামূক প্রচারণা ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার …

Leave a Reply