নীড় পাতা » করোনাভাইরাস আপডেট » ঘোষিত ৪% সুদে ঋণ পাচ্ছেন না রাঙামাটির মৎস্য চাষীরা

কভিড-১৯ প্রণোদনা প্যাকেজ

ঘোষিত ৪% সুদে ঋণ পাচ্ছেন না রাঙামাটির মৎস্য চাষীরা

ফাইল ছবি

কভিড-১৯ এর সংকট উত্তরণ ও উৎপাদনশীলখাতের সক্ষমতা ধরে রাখতে খাতওয়ারী প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। সরকারি এ সুবিধায় ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন খাতসংশ্লিষ্টরা। কিন্তু পার্বত্য রাঙামাটি জেলায় বিশেষ এ ঋণ পেতে ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন মৎস্য চাষীরা। নিয়ম মেনে আবেদন সত্ত্বেও ঋণ পেতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

ঋণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছে কয়েক দফায় গিয়েও ঋণ পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন মৎস্য চাষীরা। পার্বত্য জেলাটির দুর্গম এলাকা থেকে মৎস্যচাষীদের অনেকে জেলা সদরে এসে আবেদন করা সত্ত্বেও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে সমক্ষেপণ ছাড়াও নানা ভাবে বিভ্রান্ত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি সরকার ঘোষিত বিশেষ এ ঋণ সুবিধা পেতে হয়রানির শিকার হয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অভিযোগ করেছেন লংগদু উপজেলার এক মৎস্য চাষী। ভুক্তভোগী আরও কয়েকজন মৎস্য চাষী এ বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসনকে।

অভিযোগকারী মৎস্য চাষী নুর হোসেন বলেন, ‘আমি জেলায় শ্রেষ্ঠ মৎস্য চাষী হিসেবেও পুরস্কৃত হয়েছি। লংগদু উপজেলায় ৩৫৪টি পুকুর রয়েছে। এরমধ্যে আমার চাষ করা পুকুরটি সবচেয়ে বড়, যার আয়তন ২৬ একর। আমার মৎস্য পুকুরে উৎপাদিত মৎস্য প্রতিবছর এপ্রিল-মে মাসে বাজারজাত করে থাকি। চলতি বছর করোনাকালীন সময়ে লকডাউনের প্রভাবে পুকুরে উৎপাদিত মাছ ঠিকমত বাজারজাত করতে না পারিনি। ক্রেতা না থাকায় দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে লোকসানে এসব মাছ বিক্রি করতে হয়েছে। এতে করে আমি ব্যাপক অর্থ সংকটে থাকায় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ পেতে উপজেলা কৃষি ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংকের রাঙামাটি আঞ্চলিক কার্যালয়ে কয়েকবার গেছি। আবেদন করা সত্ত্বেও ঋণ প্রদানে গড়িমসি করছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।’

ভুক্তভোগী ওই কৃষক ১৬ জুলাই জেলা প্রশাসনে জমা দেয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, ‘লংগদু উপজেলা ব্যাংক ব্যবস্থাপক আমাকে পুকুরের যাবতীয় কাগজপত্রসহ সাক্ষাৎ করতে বলেন। পরবর্তীতে আমি সাক্ষাতকালে কাগজপত্রসহ ঋণ আবেদন করি। সে সময় উপজেলা ব্রাঞ্চ ব্যবস্থাপক চারদিনের মধ্যেই আমার পুকুর পরিদর্শন করবে বলে জানায়। কিন্তু একাধিকবার যোগাযোগ করা সত্ত্বেও ব্যাংক থেকে আমার মৎস্য প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে আসেননি কেউ। পরিপ্রেক্ষিতে আবারো আঞ্চলিক কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে ব্যাংক ব্যবস্থাপক পুকুরের রেকর্ড খতিয়ান চান। আমি তাকে জানাই, কাপ্তাই হ্রদ এলাকায় সৃষ্ট পুকুর হওয়াতে লংগদু উপজেলায় যারাই মৎস্য চাষ করেন তাদের কারোই রেকর্ডীয় খতিয়ান নেই। হেডম্যানদের প্রত্যয়ন রয়েছে। তখন ব্যবস্থাপক আমাকেসহ অন্য সকল মৎস্য চাষীকে ঋণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।’ এই চাষী বলেন, তারা প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করে ৯ শতাংশ সুদে স্বল্প টাকার শস্য ঋণ দেওয়ার কথা বলেন। ইতোমধ্যে পুকুরে পোনা ছাড়ার সময় হয়েছে। সময়ক্ষেপণের কারণে সঠিক সময়েও ঋণ পাচ্ছি না, পাবো কিনা আদৌ তাও নিশ্চিত নই। সময়মত ঋণ না পেলে পরে ঋণ পেয়েও সঠিক কাজে লাগানো যাবে। এসব কারণে বারবার হয়রানির শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের দ্বারস্তও হয়েছি।

এদিকে জেলার নানিয়ারচর উপজেলাতেও প্রণোদনার প্যাকেজের ঋণ পাচ্ছেন না বলে কয়েকজন মৎস্য চাষী অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি স্বীকার করেছেন নানিয়ারচর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) দিলীপ কুমার বিশ্বাস। তিনি জানান, তিনজন মৎস্য চাষীর আবেদনপত্রসহ আমি নিজে উপজেলা কৃষি ব্যাংক কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত সুপারিশ করেছি। এছাড়া ইউএনও ম্যাডামও মৎস্য চাষীদের ঋণ দিতে ব্যাংক ব্যবস্থাপককে মৌখিকভাবে বলেছেন। অথচ এখনো কেউ ঋণ পায়নি। একজন মৎস্য চাষী কৃষি ব্যাংকে যোগাযোগ করলে তাকে প্রণোদনার কৃষি ঋণ না দিয়ে গরু মোটাজাতাকরণ ঋণ নেয়ার কথা বলেছেন।

নানিয়ারচর উপজেলার ইসলামপুর এলাকার মৎস্য চাষী মো. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ঋণ পাওয়ার জন্য আবেদন করার পরও ২০-২৫ দিন ধরে বারবার যোগাযোগ করে হয়রানির শিকার হয়ে আসছি। আমরা যেখানে মৎস্য প্রণোদনার ঋণ চাইছি, যে ব্যাংক গরু মোটাজাতাকরণের ঋণ দিতে চাইছে। মৎস্য ঋণ পেলে আমাদের সুদ দিতে হবে ৪ শতাংশ, আর গরু মোটাজাতাকরণ ঋণ নিলে সুদ দিতে হবে ৯ শতাংশ। ঋণ আবেদনের পর থেকে বেশ কয়েকবার ধরেই ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। মৎস্য কর্মকর্তাও আমাদের জন্য সুপারিশ করেছেন। হয়রানির শিকার হয়েও ঋণ না পেয়ে বিষয়টি ইউএনও’কে জানাই। তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বাস জানিয়েছেন।

জেলার মৎস্য চাষী আব্দুল ওহাব হাওলাদার বলেন, আমি মৎস্য প্রণোদনা ঋণের আওতায় কৃষি ব্যাংকে ৫ লাখ টাকা ঋণ আবেদন করি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী জমির কাগজপত্র ও স্থানীয় হেডম্যানের প্রত্যায়নপত্র জমা দিই। কিন্তু তারা জানায় মৎস্য ঋণের আওতায় ১ লাখ টাকার বেশি ঋণ দিতে পারবেন না। অথচ গরু মোটাজাতাকরণের আওতায় ঋণ দিতেও ইচ্ছুক। কিন্তু আমি ৯ শতাংশ সুদহারে অন্য ঋণ নিতে আগ্রহী না। সরকারের ঘোষিত প্রণোদনার ঋণ না দিতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কৃষকদের বিভিন্ন ভাবে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

নানিয়ারচর উপজেলার ইউএনও শিউলি রহমান তিন্নী এ বিষয়ে বলেন, কভিড-১৯ এ ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন মৎস্য চাষী আমাকে মৌখিকভাবে প্রণোদনার ঋণ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। এছাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাও এ বিষয়ে সুপারিশ করেছেন। আমি ব্যাংক ম্যানেজার ও মৎস্য চাষীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের বলা হয়েছে, নিজেরা আলোচনা করে বিষয়টি সুরাহা করে নিতে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে তারা মৎস্য ঋণের আওতায় দেড় লাখ টাকার বেশি ঋণ দিতে পারছে না। তবে গরু মোটাজাতাকরণের আওতায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার ঋণ দিতেই বেশি আগ্রহী ব্যাংকাররা।

জেলা মৎস্য অধিদফতর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য রাঙামাটির দশ উপজেলায় ১ হাজার ৮৫৯টি পুকুর রয়েছে, যার আয়তন ৪৩৭ হেক্টর। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মৎস্য চাষ সম্প্রসারণ (ক্রিক) প্রকল্পের অধীন জলাশয় রয়েছে ৭৬৬টি, যার আয়তন ৭০৮ হেক্টর। পেনে (খাচায় মাছ চাষ) মাছ চাষের সংখ্যা ৩০টি। ধান ক্ষেতে মাছ চাষের সংখ্যা ১৩টি। করোনাকালীন সময়ে সময়মত পোনা সংগ্রহ করতে না পারা, কম মূল্যে বিক্রয়, অতিরিক্ত পরিবহন খরচ, বাড়তি খরচে শ্রমিকের মজুরি প্রদানসহ নানামুখী সংকটে পড়েছে স্থানীয় মৎস্য চাষীরা। পুরো জেলায় ৩ হাজার ৪২১ জন মৎস্য চাষী রয়েছেন। ইতোমধ্যে জেলায় করোনাকালীন সময়ে ১ হাজার ৬২৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য চাষীর তালিকা তৈরি করেছে মৎস্য অফিস। তালিকার তথ্য মতে, রাঙামাটি সদরে ১২৯, কাপ্তাইয়ে ১৬৯, রাজস্থলীতে ১৬৬, কাউখালীতে ৯৬, নানিয়ারচরে ১১৪, জুরাছড়িতে ১৭৯, লংগদুতে ৩৪৫ ও বাঘাইছড়ি উপজেলার ৪২৬ জন মৎস্য চাষী ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা (ডিএফও) শ্রীবাস চন্দ্র চন্দ বলেন, কৃষি ব্যাংকের রাঙামাটি আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক জেলা পরিষদের জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের সভায় রাঙামাটিতে প্রণোদনা বাবদ সাড়ে ৩ কোটি টাকা এসেছে বলে জানায়। কিন্তু মৎস্য চাষীরা আমার কাছে ঋণ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন। সরকার করোনাকালীন সময়ে উৎপাদনশীল খাতসমূহের উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখতেই প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। এখন চাষীরা যদি স্বল্প সুদের প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ না পান তাহলে হয়ত অনেকেই ব্যবসায়িকভাবে আরও গুটিয়ে যাবে, আর্থিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের জুলাইয়ে করোনাকালীন সময়ে কৃষিখাতের সংকট উত্তরণে ও উৎপাদন বজায় রাখতে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। এই প্রণোদনার প্যাকেজের সুদ হার ৪ শতাংশ ধরা হয়েছে। এ তহবিল থেকে গ্রাম এলাকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষী যারা কৃষি, ফুল, ফল, মৎস্য চাষ, পোল্ট্রি ও ডেইরি খাতে নিয়োজিত, তারা সবাই এই প্রণোদনার আওতায় আর্থিক সহায়তা পাবেন। ঋণ পেতে কৃষক/চাষীরা ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকও ইতোমধ্যে দেশের সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চিঠির মাধ্যমে স্বল্প সুদে কৃষি ঋণ বিতরণ করতে চিঠি দিয়েছে। কিন্তু প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা এই ঋণ সুবিধা না পাওয়ায় পার্বত্য এলাকার কৃষকরা মূলধন হারিয়ে নতুন করে কৃষি উৎপাদনে পিছিয়ে পড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি ব্যাংক রাঙামাটি আঞ্চলিক কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মাহমুদুল আলম চৌধুরী এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ পর্যন্ত কতজন মৎস্যচাষীকে ঋণ প্রদান করা হয়েছে এমন তথ্য জানতে চাইলে তিনি এ সংক্রান্ত কোন তথ্য প্রদান করতে পারবেন না বলে অপারগতা প্রকাশ করেন।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

রাঙামাটিতে এক দিনেই ১১ জনের করোনা শনাক্ত

শীতের আবহে হঠাৎ করেই পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি জেলায় করোনা সংক্রমণে উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। বিগত কয়েকদিনের …

Leave a Reply