নীড় পাতা » খাগড়াছড়ি » ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বিএনপি‘র ওয়াদুদ বিরোধী শক্তি

ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বিএনপি‘র ওয়াদুদ বিরোধী শক্তি

Wadudu-coverতিনি দীর্ঘ ৮ বছর ধরে অনুপস্থিত খাগড়াছড়িতে। তবুও তিনি ছিলেন অবিকল্প। তার কথাতেই চলে জেলা বিএনপি। ওয়ার্ড কমিটি হতে জেলা কমিটি; সবখানেই তিনি যা চান, তাই হয়ে আসছে। দলের একজন কর্মী হতে নেতা পর্যন্ত কেউই তাকে ডিঙ্গিয়ে কিছু চিন্তা করার ক্ষমতা রাখেননা। এমন কি কেন্দ্রীয় নেতা বা মিডিয়ার সাথে কথা বললেও তার পূর্বানুমতি নিতে হয়। তাতেও মিলেনা অনুমতি।
এলাকায় ভিন্ন ধরনের জনপ্রিয়তার সুযোগে তাঁর একক সিদ্ধান্ত, কর্তৃত্বে তটস্থ থাকেন নেতারা। অনেকে প্রকাশ্যে না বললেও স্বীকার করেন একনায়কতন্ত্র চলছে খাগড়াছড়ি বিএনপিতে। নেতার নাম ওয়াদুদ ভূইয়া। জেলা বিএনপি‘র সভাপতি; সাবেক সংসদ সদস্য।
বিক্ষুব্দ নেতাকর্মীদের ভাষায় ‘ডিক্টেটরসীপ ওয়াদুদ ভূইয়া’র আচরণের বিরুদ্ধে এবার মুখ খুলেছেন খোদ তার বড় ভাই বেলায়েত হোসেন ভুইয়া। কোনঠাসা এই নেতা আরো আগেই ঘুরে দাঁড়ানোর ঘোষনা দিয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কথা জানান দেন। এবার তার পথ ধরেছেন ওয়াদুদ ভূইয়ার শক্ত হাত, তারই ঘনিষ্ঠ মনীন্দ্র লাল ত্রিপুরাও। ওয়াদুদ বিরোধী জোটের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএনপি‘র কেন্দ্রীয় কার্যকরি সদস্য সমীরন দেওয়ান। তারা ওয়াদুদ ভুইয়ার একক নেতৃত্বের তীব্র বিরোধীতা করে কেন্দ্রীয় বিএনপি‘র হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। সবমিলিয়ে খাগড়াছড়ি বিএনপি‘র অভ্যন্তরে গৃহদাহ আরো তীব্র হলো।
ওয়াদুদ বিরোধী অংশের নেতারা দাবী করেছেন, এখনই নাম প্রকাশ না করলেও ওয়াদুদ ঘরোনার বেশ কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ইতিমধ্যে যোগাযোগ করেছেন জেলা বিএনপি‘র অপর অংশের শীর্ষনেতা ও কেন্দ্রীয় বিএনপি‘র সদস্য সমীরণ দেওয়ান এর সাথে। তার অংশ হিসেবে গত দু‘দিনে বিভক্ত মেরু’র শীর্ষ নেতারা কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে দেখা করে ওয়াদুদ ভূইয়ার স্বেচ্ছাচারিতা, ঢাকা ও ফেনীতে বসে নেতাকর্মীদের কাছ হতে চাঁদাবাজিসহ মোবাইল রাজনীতির যত অভিযোগ তুলে ধরেন।
এদিকে ওয়াদুদ বলয়ের পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপি‘র সহ-সভাপতি মনীন্দ্র লাল ত্রিপুরাসহ ওয়াদুদ বিরোধী বলয়ের শীর্ষ কয়েকজন নেতার একজোট হওয়া এবং ভূইয়ার নামে নালিশ করার ঘটনায় গোটা জেলা জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ভূইয়া সমর্থকরাও বিষয়টিতে অনেকটাই বিব্রত।
নানাবিধ বাস্তবতায় খাগড়াছড়িতে বিএনপিতে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ওয়াদুদ ভুইয়ার। একসময়ে জেলা বিএনপি‘র সভাপতি আবুল কাসেমকেও দল ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। ২০০১ সাল পরবর্তী বিএনপি-জামাত জোট আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়ে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন কর্মকান্ডের কারনে যেমন প্রশংসিত হন; তেমনি বিতর্কিত কর্মকান্ড, দূর্নীতি করে গাড়ী-বাড়ী ও সম্পত্তির মালিক হওয়াসহ নানা কারনে আছে অনেক সমালোচনা। জেলা বিএনপি‘র (কেন্দ্রীয় অনুমোদনপ্রাপ্ত নয়) অপর অংশের সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, সেসময় বিএনপি করলেও তার মতের বাইরের হলেই নির্যাতন বা মামলার আসামী হতে হয়েছে অনেককে। ফলে বিএনপি নেতা জাফর আহমদ, নাসির চৌধুরী‘র মত বহু ত্যাগী নেতা এখন বিপরীত মেরুতে রয়েছেন।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ওয়াদুদ ভূইয়া ২০০৭ সালে আইন শৃংখলাবাহিনীর হাতে আটক হন। বিশেষ ক্ষমতা আইনে জেল খাটেন। বিশেষ আদালতে ২০ বছরের জেলও হয়েছে। অবশ্য এখন জামিনে আছেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা সমীরণ দেওয়ান বিএনপি‘র প্রার্থী হন। কিন্তু ওয়াদুদ ভূইয়া জেলে থেকেও প্রার্থী হয়ে তা বাতিল হলে বিএনপি‘র বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দাড় করেছিলেন তারই ভাতিজা দাউদুল ইসলাম ভূইয়াকে। এরপর থেকে খাগড়াছড়ি বিএনপিতে প্রকাশ্য বিরোধ দেখা দেয়। ২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর একই দিনে ওয়াদুদ ভুইয়া ও সমীরণ দেওয়ান গ্রুপের আলাদা আলাদা জেলা কমিটি গঠন করা হয়। সর্বশেষ ২০১১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ওয়াদুদ ভুইয়া তার নেতৃত্বাধীন কমিটির অনুমোদন পেলেও সমীরণ দেওয়ান পাননি। তবে আভ্যন্তরীন দ্বন্ধ ও বিরোধ আর কাটেনি।
অন্যদিকে পারিবারিক দ্বন্ধ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে অদূরদর্শিতার অজুহাতে বড়োভাই জেলা বিএনপি‘র সহ-সভাপতি বেলায়েত হোসেন ভূইয়ার সাথে ওয়াদুদ ভ’ইয়ার বিরোধ চরমে পৌছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের জনসংযোগ কর্মকর্তার পদে অব্যহতি নিয়ে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন মনীন্দ্র লাল ত্রিপুরা। পরে ওয়াদুদ ভূইয়ার নেতৃত্বে জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি মনোনিত হন।
কিন্তু জেলার বাইরে বসে খাগড়াছড়ির রাজনীতি নিয়ন্ত্রন, নেতাকর্মীদের ওপর খবরদারি, চাঁদাবাজি এবং উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীতা, নির্বাচনে হার-জিতসহ নানা কারনেই জেলা বিএনপিতে নতুন মেরুকরণ দেখা দেয়। এসব নানা প্রশ্নে বিভক্ত বিএনপি‘র গুরুত্বপূর্ন নেতারা এক জোট হলেন ওয়াদুদ ভুইয়ার বিরুদ্ধে। গত দু‘দিনে বিএনপি‘র কেন্দ্রীয় কার্যকরি সদস্য ও অপর গ্রুপের সভাপতি সমীরণ দেওয়ান, ওয়াদুদ ভূইয়া নেতৃত্বাধীন জেলা কমিটির সহ-সভাপতি বেলায়েত হোসেন ভূইয়া ও মনীন্দ্র লাল ত্রিপুরা, মানিকছড়ি বিএনপি‘র প্রভাবশালী নেতা এসএম রবিউল ফারুকসহ আরো কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের বিএনপি নেতা ঢাকায় গিয়ে দেখা করেন দলের স্থায়ী কমিটির দুই নেতা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) হান্নান শাহ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং আব্দুল্লাহ আল নোমানের সাথে।
ওয়াদুদ ভূইয়ার নেতৃত্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা মনীন্দ্র লাল ত্রিপুরা কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে দেখা করার কথা স্বীকার করে জানান, বিএনপিতে ক্রান্তিকাল যাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে দলের কাজ করেও ওয়াদুদ ভূইয়ার কাছে মুল্যায়ন তো দূরে থাক; উল্টো হুমকি ধমকি আর চোখ রাঙ্গানি সহ্য করতে হচ্ছে। দলের নেতাকর্মীদের ত্যাগ-তিতিক্ষা কষ্টের কথা চিন্তা করেই দায়িত্ববোধ হতেই তাঁকে (ওয়াদুদ ভূইয়া)কে শিক্ষা দেবার জন্যই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তিনি অনেকটা ক্ষোভ হতে বলেন, ‘ওয়াদুদ ঢাকায় বসে চাঁদাবাজি করবেন; আর নিরবে সহ্য করবো এটা তো হয়না।’
বিএনপি নেতা নাছির আহমেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ‘আমরা ওয়াদুদ ভূইয়ার একক নেতৃত্ব, খবরদারি, পকেট কমিটির বিরুদ্ধে কথা কেন্দ্রীয় নেতাদের অবহিত করেছি। একপাক্ষিক জেলা কমিটি পুনর্গঠনের কথা বলেছি।’
এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক আবু ইউসুফ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপি‘র মত একটা বড় রাজনৈতিক দলে এটা স্বাভাবিক ঘটনা। ভবিষ্যতে দলীয় সংসদ সদস্য পদের মনোনয়ন এবং ক্ষমতায় আসলে পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বা শরণার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান পদ পদবির লবিং করতেই তাঁরা কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে যেয়ে থাকতে পারেন। এই নিয়ে দল চিন্তিত নয়। তবে বিষয়টি একেবারেই দলীয় অভ্যন্তরীন বিষয়।
জেলা বিএনপি‘র সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়ার ৭ বছর ধরে খাগড়াছড়িতে না আসা প্রসঙ্গে জেলা সাধারন সম্পাদক আবু ইউছুপ চৌধুরী জানিয়েছেন, ‘মূলত: ক্ষমতাসীন দলের হামলা মামলার ভয়ে নিরাপত্তাজনিত কারনে ওয়াদুদ ভ’ইয়া খাগড়াছড়ি আসতে পারছেননা। তবে দল ঠিকই তাঁর নির্দেশে চলে।’

Micro Web Technology

আরো দেখুন

স্বাস্থ্য বিভাগকে সুরক্ষা সামগ্রী দিলো রাঙামাটি রেড ক্রিসেন্ট

নভেল করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে রাঙামাটির ১২টি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রসমূহে স্বাস্থ্য …

Leave a Reply