নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » ঘুনে ধরা সমাজ : বার্ধক্য যেখানে অভিশাপ

ঘুনে ধরা সমাজ : বার্ধক্য যেখানে অভিশাপ

boyoshko“সারাজীবন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যাদের লালন পালন করেছি, যাদের মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য করেছি কঠোর পরিশ্রম, বার্ধক্যে তারা কোনো কাজেই আসছে না। আজ জীবনের শেষ লগ্নে এসে মনে হচ্ছে সন্তান জন্ম দেয়াটাই বৃথা হয়েছে; একমুঠো ভাত পর্যন্ত দেয় না তারা”।
সন্তানদের ওপর চরম বিরক্তি নিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাসের সাথে কথাগুলো বলেন বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মং চিং লা। কর্মক্ষম এই বৃদ্ধের নিবাস এখন রাঙামাটি শহরের বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে। ৭২ বছর বয়সের এই বৃদ্ধের বাড়ি চন্দ্রঘোনার রাইখালী বাজারের পাশেই। তাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। এক ছেলে ঘর ছেড়ে ভিক্ষু হয়েছেন, অন্যজন আছেন বাড়িতেই। দুই মেয়ের এখনও বিয়ে হয়নি। বাসায় সবার জায়গা হলেও বৃদ্ধের জায়গা হয়নি। তাই একদিন কাউকে কিছু না বলে তিনি মনের দুঃখে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন; আশ্রয় নেন বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে।
মং চিং লা আরো বলেন, ছেলের সংসারে থাকতে কত না লাঞ্ছনার শিকার হয়েছি। তবুও আশা ছিল হয়তো পরিবর্তন আসবে; একদিন ছেলেদের আয়ে দু’মুঠো ভাত শান্তিতে খেতে পারবো। সে খাবারে থাকবে না কোনো খোঁচা বা লাঞ্ছনা। কিন্তু তা আর হলোই না। ঘরে থেকেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে একদিন বেরিয়ে পড়লাম। এক পরিচিতের মাধ্যমে এখানে ঠাঁই হলো। বৃদ্ধ বলেন, আমি এখানে এসেছি তিন বছর হলো কিন্তু, সন্তানরা কেউ আমাকে দেখতে আসাতো দুরের কথা আমি বেঁচে আছি কিনা এ খবরটুকুও নেয়নি। ছেলেদের বিষয়ে আরো বলেন, তাদের প্রতি আমার আর কোনো সহানুভূতি নেই। আশির্বাদেরতো প্রশ্নই আসে না। এখানে অনেক সুখে-শান্তিতে আছি। খেতে পারছি, থাকতে পারছি। কিন্তু নেই কোনো খোঁটা বা লাঞ্ছনা। একটা ছেলে ধর্মের পথে যাওয়ায় তিনি খুশি কিনা এমন প্রশ্নেœর জবাবে তিনি বলেন, যে ছেলে বাবা-মাকে ভাত দেয় না, তার আবার কিসের ধর্ম। আমি আশির্বাদ করি; ‘আর কারো ঘরে যেনো এমন ছেলেমেয়ের জন্ম না হয়। বৃদ্ধের কথা বলার সময় পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকা আরো কয়েকজন বৃদ্ধ তাঁর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন। এ যেনো তাদেরই অভিব্যক্তি।
রাঙামাটি শহরের আপার রাঙামাটি এলাকায় এই বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের অবস্থান। বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রটি ডিভেন্সি গ্র“প অব ইন্ডাঃ এর চেয়ারম্যান খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুলের একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে বর্তমানে ১৫জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা রয়েছেন। এই উদ্যোক্তা গাজীপুর ও রাঙামাটিতে দুইটি বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন।
বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রকল্প কর্মকর্তা খোকন কান্তি বড়–য়া জানালেন, আমাদের এখানে যারা রয়েছেন, তারা সকলেই কোনো না কোনোভাবে পরিবারিক লাঞ্ছনার শিকার। এখানে যারা রয়েছেন, তাদের সবার পরিবার রয়েছে। অনেকের ছেলেমেয়ে আছে সত্যি, কিন্তু বাবা- মাকে দেখে না। তাই বাধ্য হয়ে তারা এখানে আশ্রয় নিয়েছে। আমরা সাধ্যমত তাদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। নিয়মিত প্রার্থনা, ব্যায়াম ও খাবার ছাড়াও প্রতি সপ্তাহে দুই বা তিন দিন সাবেক সিভিল সার্জন ডাঃ সুপ্রিয় বড়–য়া তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। তিনি জানান, যাদের এখানে মৃত্যু হবে তাদেরকে এখান থেকেই নিজ নিজ ধর্মীয় রীতিতে সমাহিত করা হবে। অথবা তাঁর পরিবার ইচ্ছা পোষণ করলে তারাও নিয়ে যেতে পারবে।
পুনর্বাসন কেন্দ্রের অশীতিপর বৃদ্ধ তরুনি সেন বললেন, তাঁর বাড়ি লংগদু উপজেলায়। ছয় বছর পূর্বে একমাত্র মেয়ে চন্দ্রমোগি চাকমার বিয়ের পর এখানে চলে আসি। কিন্তু এই ছয় বছরে একবারও মেয়ে আমার খোঁজখবর নেয়নি। কষ্ট লাগে, তবুও শেষ জীবনে আর কোনো আশা রাখতে চাই না। যদি কোনোদিন পারি মেয়েকে দেখতে যাব। মেয়ে আমাকে না চাইলেও আমি তো আর মেয়েকে ফেলে দিতে পারি না।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কাপ্তাইয়ে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান

কাপ্তাই নতুন বাজারে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। বুধবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশ্রাফ আহমেদ …

Leave a Reply