নীড় পাতা » করোনাভাইরাস আপডেট » গ্রীষ্মকালীন ১০ লাখ টন ফল বাজারজাতকরণে শঙ্কায় চাষী

তিন পার্বত্য জেলা

গ্রীষ্মকালীন ১০ লাখ টন ফল বাজারজাতকরণে শঙ্কায় চাষী

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় প্রতিবছর ফলের আবাদ হয় প্রায় ১৮ লাখ টন। প্রতিবছর ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ে উৎপাদন। চলতি গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে বাজারে আসবে বার্ষিক মোট উৎপাদনের ৫০ শতাংশ ফল। কিন্তু চলমান করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে সাধারণ ছুটির কারণে এসব ফল বাজারজাতকরণ নিয়ে শঙ্কার মধ্যে রয়েছে পাহাড়ের উদ্যান চাষীরা। মূলত পার্বত্য এলাকায় সারাদেশের ব্যাপারী ও আড়তদাররা আসতে না পারায় উৎপাদিত ফল বিক্রি করতে পারছে না কৃষকরা।

খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার কৃষক উশেথোয়াই মারমা। তিনি নিজস্ব পাহাড়ি জমিতে জুম চাষের পাশাপাশি উদ্যান ফসলও চাষ করেন গত দশ বছর ধরে। এক সময় পারিবারিক ঐতিহ্য হিসাবে চাষ হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক ভাবে জুমের জমিতে উদ্যান ফসলের চাষ বাড়াচ্ছেন তিনি। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার পাশাপাশি সারাদেশে পাহাড়ি ফলের চাহিদা থাকায় প্রতিবছর ভালোই আয় করেন তিনি। তবে চলতি বছর কাঁঠাল, লিচু ও আনারসের চাষে লোকসানে পড়েছেন তিনি। গড় দেড়মাস ধরে সাপ্তাহিক হাটে শহর থেকে ব্যাপারী না আসায় কম দামে ফলগুলো বিক্রি করতে হচ্ছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে গ্রীষ্মকালীন ফল কাঁঠাল, লিচুর অধিকাংশ ফলনই উত্তোলন শুরু হবে পুরোদমে। ব্যবসায়ীদের পার্বত্য বাজারগুলোতে আসার সুব্যবস্থা না করলে মাঠের ফল নষ্ট করা ছাড়া উপায় থাকবে না বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাঙামাটি অঞ্চল (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ মৌসুমে ৪৫ প্রজাতির প্রায় ১৭ লাখ ০ হাজার ৪০৫ টন ফল উৎপাদন হয়। চলতি মৌসুমে আবাদ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ১৯ লাখ ৩৬ হাজার ৪৪৫ টন। কিন্তু মার্চের মাঝামাঝিতে কভিড-১৯ এর কারণে সারাদেশে যানবাহন চলাচল সীমিত হয়ে যাওয়ায় উৎপাদিত ফলের বিপণন নিয়ে সংকটে পড়েছে পাহাড়ের কৃষক। নিত্যপণ্য, ওষুধ ও কৃষিপণ্য পরিবহনে বাধা না থাকলেও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ী, আড়তদার ও ব্যাপারীরা পার্বত্য এলাকায় যেতে পারছে না। উৎপাদিত ফলে স্থানীয় চাহিদা খুবই সীমিত হওয়ায় বাজারজাতকরণ নিয়ে সমস্যা ক্রমশ বাড়ছে। মূলত ব্যবসায়ীদের যাতায়াত সমস্যা ও পণ্য পরিবহনের যানবাহনের সংকটে ফলের বিক্রি অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে। এতে করে এক দিকে পার্বত্য কৃষক কম দামেও ফল বিক্রি করতে হিমসিম খাচ্ছে। অপরদিকে গ্রীষ্মকালীন ফলের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী পার্বত্য এলাকার ফল না আসায় সারাদেশে এসব ফলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে।

ডিএই রাঙামাটি অঞ্চলের উদ্যান ফসলের বার্ষিক প্রতিবেদন সূত্রে দেখা গেছে, ২০১৮-১৯ মৌসুমে পার্বত্য তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে কলা উৎপাদন হয়েছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৫০ টন, আম উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৮৭ হাজার ৩০৬ টন, কাঁঠাল উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৫৭ হাজার ২ টন, লিচু ২৪ হাজার ৩৫২ টন, তরমুজ ২১ হাজার ২৯৮ টন, লেবু ৪১ হাজার ৫০৫ টন, বাতাবিলেবু ৩৮ হাজার ১২১ টন, পেয়ারা ৪৯ হাজার ৪৯১ টন, পেঁপে উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৫৪ টন, আনারস উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৫৯ হাজার ২৭৭ টন। কলা, পেঁপে ও আনারস প্রায় সারাবছর উৎপাদন হলেও কাঁঠাল, আম, লিচু, লেবু, তরমুজ, বাতাবীলেবুর গ্রীষ্মকালীন ফল হওয়ায় এসব ফল নিয়েই সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় কৃষক। অর্থাৎ গ্রীষ্মকালীন প্রায় ২০টি ফলের মোট উৎপাদন বার্ষিক উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি হওয়ায় চলতি মৌসুমে উদ্যান ফসল অর্থাৎ ফলের আবাদে বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে পার্বত্য কৃষকরা।

জানতে চাইলে কৃষি ডিএই (রাঙামাটি) অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্যান) কাজী শফিকুল ইসলাম বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের কৃষকদের উদ্যান ফসলের সরবরাহ চেইনের সংকট দূর করতে ইতোমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে অধিদফতর। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ছাড়াও সারাদেশের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের তালিকা চেয়েছে কৃষি বিভাগ। আমরা তালিকা তৈরি করে আগামী সপ্তাহের মধ্যে ঢাকায় পাঠিয়ে দেব। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে পার্বত্য এলাকার উৎপাদিত ফল সারাদেশে বাজারজাতকরণে বড় ধরনের কোন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগী একাধিক কৃষকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলে প্রশাসনিক বাধা না থাকলেও সীমিত যানবাহনের কারণে কৃষকরা উৎপাদিত ফল পাঠাতে পারছে না। মার্চ ও এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত পার্বত্য এলাকায় পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলও সীমিত ছিল। তাছাড়া স্থানীয় কৃষক ও ব্যাপারীরা পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন বাজার থেকে ফল ও কৃষিজ পণ্য ক্রয় করে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে। কিন্তু লকডাউনের কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় কেউই পার্বত্য এলাকার বাজারগুলোতে আসছে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবসায়ীরা বাস কিংবা অন্যান্য গণপরিবহনে পার্বত্য বাজারগুলোতে এসে পণ্য ক্রয় করে। পার্বত্য জেলাগুলোর বিভিন্ন বাজারগুলোতে সাপ্তাহিক হাট বসে (সপ্তাহে দুটি)। পার্বত্য জেলাগুলোতে যেকোন পণ্য নিয়ে এসে ফিরতি পথে খালি চলে যাওয়া যানবাহন তুলনামূলক কম দামে ভাড়া করে বিভিন্ন বাজারে আসা ব্যবসায়ীরা। এরপর সড়ক পথের সংশ্লিষ্ট বাজারগুলো থেকে ক্রয় করা ফল বা কৃষিজ পণ্য ভাড়া করা যানবাহনে লোডিং করে চট্টগ্রাম, ঢাকা-সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যায়। পার্বত্য জেলাগুলোতে ব্যবসায়ী বা কৃষক পর্যায়ে আড়তে পণ্য পৌঁছানোর সংস্কৃতি গড়ে না ওঠায় দেশের অন্যান্য এলাকার কৃষকদের তুলনায় পার্বত্য কৃষকরা সবচেয়ে বেশি সমস্যার মধ্যে রয়েছে। বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাজারে কম দামে পণ্য বিক্রি করে দিচ্ছেন কৃষকরা। অনেকে বিক্রি ও কম দামের কারণে বাগান থেকে ফল সংগ্রহ বন্ধ করে দিয়েছেন। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে গ্রীষ্মকালীন প্রধান ফল কাঁঠাল, আম, লিচু উত্তোলনের ভরা মৌসুম। এই সময়ের মধ্যে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সহজ করা না গেলে কয়েক লাখ টন মৌসুমী ফল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ডিএই রাঙামাটি অঞ্চলের (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) উপ-পরিচালক মো. ফজলুর রহমান বলেন, কৃষি বিভাগ পার্বত্য কৃষকদের উৎপাদিত ফল সারাদেশের বাজারজাত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শিগগিরই কৃষক, ব্যবসায়ীদের সাথে মন্ত্রণালয়ের ভার্চুয়াল বৈঠক করে পরামর্শ চাওয়া হবে। পার্বত্য এলাকার কৃষিপণ্য, ফল-সহ উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য নির্বিঘেœ পরিবহনে গ্রহণযোগ্য ও সহজলভ্য সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

পাহাড়ে ফল চাষ ও বাজারজাতকরণের সাথে যুক্ত একাধিক চাষী ও ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করলেই পণ্যের সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক হয় না। এর জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের সমন্বয় করে মাঠ পর্যায়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা। তাছাড়া চলমান সংকটময় সময়ে সরকারিভাবে যানবাহনের মাধ্যমে পাহাড়ে উৎপাদিত ফল প্রধান প্রধান জেলা শহরের আড়তে পৌঁছানো ও বিক্রির ব্যবস্থা করা।

চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গিবাজারের বিসমিল্লাহ বাণিজ্যালয়ের স্বত্তাধীকারী আবদুল কাদের বলেন, চট্টগ্রামের অনেক ব্যবসায়ী মৌসুমে পার্বত্য এলাকায় গিয়ে ফল নিয়ে আসে আড়তে। কমিশনের ভিত্তিতে তারা ফলগুলো চট্টগ্রামের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করে। কিন্তু কৃষিপণ্যের যানবাহন চলাচল করলেও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপারীরা যেতে পারছে না। ফলে পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলের সুবিধা রাখা হলেও সেটি কাজে আসছে না বলে মনে করছেন তিনি।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

ছেলের হাতে মা-বাবা আহত হয়ে হাসপাতালে

খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় নেশাখোর বখাটে ছেলের মারধরের শিকার হয়ে আহত বৃদ্ধ মা-বাবা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঘটনাটি সোমবার …

Leave a Reply