নীড় পাতা » খাগড়াছড়ি » গ্রামীণ খেলাধুলায় সংস্কৃতির শেকড় সন্ধান পানছড়িতে

গ্রামীণ খেলাধুলায় সংস্কৃতির শেকড় সন্ধান পানছড়িতে

gramen-sportsক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালি সংস্কৃতির সোনালি অতীত। কালচক্রে বিলুপ্ত প্রায় গ্রাম-বাংলার কৃষ্টি-কালচার ও ঐতিহ্যবাহী সব খেলাধুলা। একযুগ আগেও পাহাড়ি জনপদে নানা ধরনের খেলাধুলার প্রচলন ছিল। তবে বাঙালি সংস্কৃতির ওপর ভীনদেশি আগ্রাসন ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে স্বদেশি সু-সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের শেকড় আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোর বেশিরভাগই আজ বিলুপ্তির পথে। তবে বিশেষ কোনো দিবসের অনুষ্ঠানে কিছু সংস্কৃতি আজও বাঙালির অস্তিত্ব জানান দেয়। পাহাড়ি এই অঞ্চলে এখনও কিছু কিছু খেলা চোখে পড়লেও উদ্যোক্তা ও পৃষ্টপোষকতার অভাবে তাও ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছেনা।
আর তাই গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা পুনরুদ্ধার, শিশু-কিশোরদের মেধার বিকাশ এবং পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে পানছড়ি উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শনিবার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়েছে গ্রামীণ খেলাধুলা প্রতিযোগীতা। সকালে উপজেলা পরিষদ মাঠে এ প্রতিযোগীতার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন পানছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সর্বোত্তম চাকমা। এসময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুর্শিদুল আলম, উপজেলা মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান রতœা তঞ্চ্যগা, পানছড়ি উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা’র সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান কবির সাজু ও যুগ্ম-সম্পাদক নাজির মাহমুদ সহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। দিনব্যাপি আয়োজিত গ্রামীণ খেলাধুলা প্রতিযোগীতার মধ্যে ছিল- হা-ডু-ডু, দাঁড়িয়াবাঁধা, এক্কাদোক্কা, দড়ি লপ্প, বিস্কিট দৌঁড়, সাত চারা, মোরগ লড়াই সহ আরও নানানরকম খেলা। আর সেই সাথে আনন্দের মাত্রা বাড়িয়েছে নাগরদোলা। মূলত এ সবই ছিল গ্রাম-বাংলার কৃষ্টি-সংস্কৃতি। এসব খেলাধুলায় অংশ নেয়ার উন্মত্ত-আনন্দে মাতোয়ারা কিশোর-কিশারী-যুবক-যুবতীদের মুখে ছিল বাঁধভাঙা উল্লাস। এই সংস্কৃতি চর্চা করেই এসময় গ্রামাঞ্চলের শিশুরা তাদের মেধার বিকাশ ঘটাতো, কিন্তু এখন আর তা হয়ে উঠেনা। grammen-sports-02
একসময় খাগড়াছড়ি জেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে প্রায় শতাধিক গ্রামীণ খেলাধুলার প্রচলন ছিল। এর মধ্যে বাঙালি ছেলে-মেয়েদের হা-ডু-ডু, ডাংগুলি, কাবাডি, গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবাঁধা, ইচিং-বিচিং-চিছিং-ছা, এক্কাদোক্কা, দড়ি লপ্প, বালিশ বদল, পুতুল খেলা, রান্নাবাটি, পাঁচগুটি, কড়ি খেলা, চোরপুলিশ, বৌচি, কিত্িিকত্, দৌড়ঝাঁপ, গাদন, চিকে, কপালটোকা, কানামাছি ভোঁ ভোঁ, মালাম খেলা, কুস্তি, ডুব সাঁতার, নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগ লড়াই, হৈল-বৈল, বস্তাদৌড়, লুকোচুরি এবং পাহাড়িদের পাশা খেলা, আলারী খেলা, বাঁশখরম, নাধেং খেলা, ঘিলা খেলা ও ধ-খেলা সহ হরেকরকম মজার সব খেলা। লাঠিখেলা এবং জাতীয় খেলা হা-ডু-ডু’র উন্মাদনাও ছিল পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে। বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে এবং কাশি-বাঁশি বাজিয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবেই আয়োজন করা হতো জাতীয় খেলা হা-ডু-ডু ও লাঠিখেলার। উত্তেজনাপূর্ণ ও মনোমুগ্ধকর এসব প্রতিযোগিতা উপভোগে ঢল নামতো মানুষের, বসতো বিশাল বিশাল মেলা। এসব এখন অতীত মাত্র। এখনকার সময়ের বেশীরভাগ পাহাড়ি-বাঙালি ছেলেমেয়েরাই অধিকাংশ খেলার সাথেই পরিচিত হতে পারেনি। কিছুদিন আগেও রাখালেরা মাঠে গরু চড়াতে গিয়ে ও স্কুলপড়–য়া ছেলে-মেয়েরা স্কুলের মাঠ কিংবা পথে প্রান্তরে নানা ধরনের গ্রামীণ খেলাধুলায় মেতে থাকতো। আর বর্তমানে শহরাঞ্চলে তো বটেই প্রত্যন্ত এ পাহাড়ি অঞ্চলেও খোলা জায়গা কিংবা খেলার মাঠের স্বল্পতার কারণে অনেক গ্রামীণ খেলার মৃত্যু ঘটেছে অনেক আগেই। বর্তমান সময়ে ভিডিও গেইম, টেলিভিশন, মুঠোফোন ইত্যাদি গ্রামীণ খেলাধুলার সে স্থান দখল করে নিয়েছে।
ঐহিত্যবাহী এসব খেলাধুলা বিলুপ্তির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে পানছড়ি উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা’র সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান কবির সাজু জানান, বিজ্ঞানের ক্রমউৎকর্ষতা, উদ্যোক্তা ও পৃষ্ঠপোষকের অভাব, উপযোগী পরিবেশ, পর্যাপ্ত খেলার মাঠের সঙ্কট সহ বহুবিধ সমস্যার ফলে গ্রাম-বাংলার অতীত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ওই করুণদশা। প্রযুক্তির আধুনিকতায় মানুষ গোটা পৃথিবীর কৃষ্টি-কালচার ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানসহ বিনোদন ঘরে বসেই উপভোগের সুবিধা পাচ্ছেন। সেই কারণেই এই যান্ত্রিকতার যুগে মানুষও একঘেঁয়ে ছকে আটকে পড়েছে।
গ্রামীণ খেলাধুলা প্রতিযোগীতার আয়োজন সম্পর্কে জানতে চাইলে পানছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সর্বোত্তম চাকমা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুর্শিদুল আলম বলেন, ‘পুরনো সেসব খেলাধুলা, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি এখন তো আর চর্চা করা হয় না। পুলকওয়ালা লোকের বড়ই অভাব। ক্রমান্বয়ে মানুষ হয়ে যাচ্ছে যন্ত্র।’ গ্রাম-বাংলার এসব শিল্প-সংস্কৃতি তরুণ এবং আগামী প্রজন্মের কাছে রূপকথার গল্পের মতোই মনে হবে। বিলুপ্তপ্রায় সংস্কৃতির অস্তিত্ব রক্ষা, সোনালি ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার, শিশু-কিশোরদের মেধার বিকাশ এবং পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টির লক্ষ্যেই আমরা এই গ্রামীণ খেলাধুলা প্রতিযোগীতার আয়োজন করেছি। এবং প্রতিবছরই এই উদ্যোগ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করবেন বলেও জানিয়েছেন তারা।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

নানিয়ারচর সেতু : এক সেতুতেই দুর্গমতা ঘুচছে তিন উপজেলার

কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির ৬০ বছর পর এক নানিয়ারচর সেতুতেই স্বপ্ন বুনছে রাঙামাটি জেলার দুর্গম তিন …

Leave a Reply