নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » গণশুনানি একটি মহৎ উদ্যোগ : প্রয়োজন ধারাবাহিকতা

গণশুনানি একটি মহৎ উদ্যোগ : প্রয়োজন ধারাবাহিকতা

গণশুনানি ইতিমধ্যে সাড়া ফেলেছে রাঙামাটিবাসীর মাঝে। রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে প্রতি বুধবার দুই ঘন্টার এই গণশুনানি কার্যক্রমে স্থানীয় লোকজন তাদের সুযোগ সুবিধা এবং অসুবিধার কথা তুলে ধরেন জেলা প্রশাসকের সামনে। কিছু সমস্যা কিংবা অভিযোগের তাৎক্ষণিক সমাধান ও পাওয়া যায়। এতেই খুশি রাঙামাটিবাসী।

গণশুনানির প্রসঙ্গে আসার বিষয়ে একটি বিষয় খুব সহজেই সকলের চোখের সামনে উঠে আসে। একজন রাঙামাটিবাসী হিসাবে আমার এই অভিজ্ঞতার সাথে সকলেই একমত হবেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। দেশের ৬১ টি জেলার সাথে তুলনা করলে এই বিষয়টি খুব সহজেই উঠে। বিষয়টি হচ্ছে কোন সমস্যার সমাধান কে দেবে? কোন সমস্যার জন্য কোথায় যেতে হবে? কার দ্বারস্থ হতে হবে সমাধানের জন্য? এই রকম হাজারো প্রশ্ন সমস্যায় ভূগতে থাকা রাঙামাটিবাসীর। যে কারণে একটি সমস্যার সমাধানের জন্য রাঙামাটিবাসীকে একাধিক জায়গায় আবেদন নিবেদন করতে হয়। কিন্তু এরপরেও অনেক ক্ষেত্রে বলা হয় সঠিক জায়গায় নিবেদন করুন। কিন্তু সঠিক জায়গা কোনটি এই বিষয়ে কোনও উত্তর নেই।

রাঙামাটি জেলাসহ তিন পার্বত্য জেলায় একাধিক সরকারি ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংস্থা বিরাজমান। সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় সংস্থাগুলোর মধ্যে অনেক সময় পারস্পরিক সামঞ্জস্যতা ও সমঝোতার ঘাটতি চোখে পড়ে। এর ফলে জনগণকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। প্রসঙ্গ ক্রমেই বলা যায় রাঙামাটি জেলায় প্রচলিত সরকারি সংস্থার পাশাপাশি রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এর মতো শক্তিশালী সংগঠন। আবার এই সব সংস্থার নেতৃত্বেও রয়েছে শক্তিশালী ব্যক্তিগণ। যাদের পদ মর্যাদাও অনেক উর্ধ্বে। পাশাপাশি জেলায় পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ এবং উপজেলাসমূহে ও উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদও রয়েছে। এছাড়া এখানে একাধিক দেশি-বিদেশি একাধিক শক্তিশালী এনজিও সংস্থাও রয়েছে যারা এখানকার বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

দেশের অপরাপর জেলার মতো রাঙামাটিতেও সরকারের শাসন ব্যবস্থারগুরুত্বপূর্ণ অংশ জেলা প্রশাসন, উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ বিদ্যমান। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান পরিস্থিতির কারণে এখানকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই এখানে সেনবাহিনী ও বিজিবির শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। সব কিছু বিবেচনা করলে দেখা যাবে রাঙামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলার সার্বিক ব্যবস্থা দেশের অপরাপর জেলাসমূহ থেকে ভিন্ন। তাই প্রসঙ্গক্রমেই উঠে আসে এই ভিন্নতায় লোকজন তাদের সমস্যার সমাধানের জন্য কোথায় গেলে প্রকৃত সমাধান পাবে ?

ফিরে আসি গণশুনানির প্রসঙ্গে– রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিশেষ করে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হওয়া গণশুনানিতে প্রতি বুধবার সেবা প্রত্যাশী লোকজনের নিয়মিত উপস্থিতি প্রমাণ করে এই কার্যক্রমে জনগণ নতুন করে আশার আলো দেখেছে। জেলাপ্রশাসনের পক্ষ থেকে এই গণশুনানি কার্যক্রমের বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আগত লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের প্রবেশমুখেই গণশুনানির কার্যক্রমের সুন্দর ডিজিটাল ব্যানার সর্বদা প্রদর্শিত হচ্ছে।

এই পর্যন্ত প্রতিটি গণশুনানিতে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান। তাঁর সাথে তাঁর সহকর্মী অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকগণ এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণও উপস্থিত থাকেন গণশুনানি কার্যক্রমে। গণশুনানি কার্যক্রমে আসা সাধারণ জনগণ তাদের সমানে জেলা প্রশাসক এবং জেলা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের দেখতে পেয়ে আনন্দিত হন। প্রত্যাশার বীজবপন করে এই ভেবে যে এই বার হয়তো সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে। আসলে রাঙামাটিবাসী অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত সেবা পান না। সেবা পেতে গিয়ে তাদের বিভিন্ন সমস্যার সন্মুখীন হতে হয়। তাই জেলা প্রশাসকের সামনে তাদের সমস্যা তুলে ধরতে পেরে তারা সন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান গণশুনানি কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিকতার শুরুতেই ঘোষণা দিয়েছেলেন গণশুনানি কার্যক্রম শুধুমাত্র জেলাতেই নয়, উপজেলা পর্যায়েও সম্প্রসারণ করা হবে। এর ফলে উপজেলার লোকজন তাদের সমস্যাসমূহ উপজেলা পর্যায়েই উপস্থাপন করতে পারেন। উপজেলা ছেড়ে সেবা প্রত্যাশিত লোকজনকে জেলা সদরে আসতে হবে না। জেলা প্রশাসক তাঁর কথা রেখেছেন। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসক যেসব উপজেলায় সফল করেছেন সেই সব উপজেলার প্রতিটিতেই তাঁর কর্মসূচির অংশ হিসাবে গণশুনানি কার্যক্রমকে অন্তর্ভূক্ত করেছেন।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে গণশুনানি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে সরকারের মন্ত্রী পরিষদের নির্দেশনা অনুসারে প্রতিটি সরকারি দপ্তর এবং সংস্থাসমূহের ও অনুরূপ গণশুনানি কার্যক্রম পরিচালনার কথা থাকলেও এখানে এর ব্যত্যয় ঘটছে। এর ফলে লোকজন তাদের অন্যান্য দপ্তরের সমস্যার সমাধানের জন্যও জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের দ্বারস্থ হচ্ছেন। সরকারি নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করা হলে জনগণ তাদের সমস্যাগুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরেই উপস্থাপন করতে পারতো। এই বিষয়টি এখন সময়ের প্রয়োজনে করণীয় হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের গণশুনানি কার্যক্রমে এই পর্যন্ত যে সব বিষয়ে ভূক্তভোগীরা অভিযোগ করেন তাঁর সিংহভাগই হচ্ছে ভূমি ও জমিজমা সংক্রান্ত। রাঙামাটি পার্বত্য জেলার সর্বাধিক সমস্যা বহুল সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত এখানকার এই সব জমিজমা সংক্রান্ত সমস্যা। আবার জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে তৃণমূল করে সার্কেল চিফ, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ. উপজেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ এবং জেলা প্রশাসনের। এর ফলে এসব ভূক্তভোগীদের অনেক সমস্যার সমাধানেও একাধিক সংস্থার সাথে সমন্বয় সাধন সমাধানের পথ খুঁজতে হয়। তবে গণশুনানি কার্যক্রমে অংশ নেয়া কয়েকজন জনিয়েছেন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জমিজমা সংক্রান্ত অনেক সমস্যার সমাধান তারা গণ শুনানি কার্যক্রমে অংশ নিয়ে তৎক্ষণাৎ পেয়েছেন। এই বিষয়ে আরেকটি কথা না বললেই নয় জমি-জমা সংক্রান্ত বিভিন্ন ফাইল কিংবা নথি নিয়ে যারা চালাচালি করেন তাদের মধ্যে অনেক দুর্নীতিবাজ কর্মচারী রয়েছেন যাদের কারণে সেবা প্রত্যাশী লোকজনকে ভোগান্তি পোহাতে হয়। এই গণশুনানি কার্যক্রমে এই ধরনের ভোগান্তির কথা উঠে আসায় দুর্নীতিবাজ অনেক কর্মচারীও এখন সাবধান হয়ে গেছেন। ফলে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে হলেও দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের দৌরাত্ম্যও কিছুটা কমে এসেছে।

গণশুনানি কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে তা এই জেলার সার্বিক নাগরিক সুবিধায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি জনগণের দোরগোড়ায় সরকারি বিভিন্ন সেবা পৌঁছে দেয়ার যে কর্মকান্ড তারও সুফল আসবে। তবে গণশুনানির দৃশ্যমান অগ্রগতিগুলো ব্যাপকভাবে প্রচার করা প্রয়োজন। এতে করে সেবা প্রত্যাশী লোকজনের মাঝেও এই বিষয়ে ব্যাপকভাবে সচেতনতা সৃষ্টি হবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও অধ্যক্ষ,রাঙামাটি শিশু নিকেতন

Micro Web Technology

আরো দেখুন

রাঙামাটিতে টিসিবি’র পেঁয়াজ বিক্রি

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)’র মাধ্যমে পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে ৪৫ টাকা মূল্যে পেঁয়াজ …

One comment

  1. রাংগামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদালয়ের নানা রকম সমসসার সমাধান চাই একজন অভিভাবক হিসেবে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: