নীড় পাতা » পাহাড়ের রাজনীতি » খাগড়াছড়ি বিএনপিতে ওয়াদুদ-সমীরণ : গ্রুপিংয়ে অস্বস্তি, তবুও চাঙ্গা নেতাকর্মীরা

খাগড়াছড়ি বিএনপিতে ওয়াদুদ-সমীরণ : গ্রুপিংয়ে অস্বস্তি, তবুও চাঙ্গা নেতাকর্মীরা

রাজনীতির মাঠে এখন শুধুই বিএনপি আর বিএনপি। মিছিল, মিটিং আর সভা, সমাবেশসহ নানা কর্মসুচিতে সরব, জেলার সবখানে। ক্ষমতার মোহে, রাজনীতি আর ভোটের হিসেব নিকেশ হতে যখন অনেক দূরে ক্ষমতাসীন দল; তখন বিএনপি ব্যস্ত সাংগঠনিক তৎপরতায়। সারাদেশের চেয়ে ভিন্ন এবং অনুকূল পরিবেশের কারনে রাজনীতির মাঠে নির্ঝজ্ঝাটভাবে গতিশীল রয়েছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। তবে, অভ্যন্তরে দ্বিধাবিভক্তি, ‘ওয়াদুদ-সমীরণ’ প্রকাশ্য গ্রুপিং, সর্বশেষ বিএনপি‘র প্রভাবশালী নেতা বেলায়েত হোসেন ভূইয়ার ভিন্নধারার ‘নাগরিক পরিষদ’ গঠন এবং সংসদ নির্বাচনে ওয়াদুদ ভূইয়ার প্রার্থী হওয়া নিয়ে সন্দেহ সংশয়সহ নানা কারনে কিছুটা অস্বস্থিতে দলটি। সম্প্রতি জেলা বিএনপি‘র দ্বিতীয় সহ-সভাপতি ও রামগড় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন ভুইয়া আগামীতে প্রতিটি স্থানীয় নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ গ্রহনের ঘোষনা দিয়েছেন। সংক্ষেপে বললেই এইতো খাগড়াছড়ি বিএনপি।

বিএনপিতে প্রকাশ্য গ্রুপিং

গ্রুপিং মানেই রাজনীতির অংশ। বাদ যায়নি পাহাড়ী জেলা খাগড়াছড়িও। নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব এবং ব্যক্তি দ্বন্ধের কারনে এখানে বিএনপিতে আছে বিবেধ। নেতাদের বিরোধে কর্মীরাও দ্বিধাবিভক্ত। আদালতে সাজার কারনে ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে অযোগ্য হন খাগড়াছড়ি বিএনপি‘র সভাপতি ওয়াদুদ ভুইয়া। পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা সমীরণ দেওয়ানকেই মনোনয়ন দেয় বিএনপি। তিনি পান ৬৩ হাজার ভোট। কিন্তু প্রভাবশালী বিএনপি নেতা ওয়াদুদ ভুইয়া তখন কারাগারে থেকেও স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। যদিও তা খারিজ হয়। এছাড়া ধানের শীষের বিপক্ষে ওয়াদুদ ভুইয়ার ভাতিজা দাউদুল ইসলাম ভুইয়া বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার পর থেকে খাগড়াছড়িতে বিএনপিতে দ্বন্ধ শুরু। সেই নির্বাচনে ওয়াদুদ ভুইয়া সমর্থিত নেতাকর্মীরা বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন এবং সেই নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী ভোট পান ১২ হাজারের কিছু বেশি। পরবর্তীতে দলটির জেলা কমিটি গঠন নিয়েই মূলত: প্রকাশ্য বিরোধ দেখা দেয়।
২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর একই দিনে ওয়াদুদ ভুইয়া ও সমীরণ দেওয়ান গ্রুপের আলাদা আলাদা জেলা কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি দুটি‘র কেন্দ্রীয় অনুমোদন নিয়ে অন্তত বছর দুয়েক নানা অনিশ্চয়তা থাকলেও ২০১১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ওয়াদুদ ভুইয়া তার নেতৃত্বাধীন কমিটির অনুমোদন নিয়ে আসেন। কমিটির বৈধতা নিয়ে ভিন্ন গ্রুপের পক্ষ হতে নানা প্রশ্ন উঠলেও বর্তমানে খাগড়াছড়িতে বিএনপি‘র অধিকাংশ কার্যক্রম চলে ওয়াদুদ ভুইয়ার নেতৃত্বেই। তবে, সমীরণ দেওয়ান গ্রুপের সাংগঠনিক তৎপরতাও কম নয়।
সমীরণ দেওয়ান গ্রুপের প্রস্তাবিত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ’দলের চেয়ারপার্সনের গঠন করা ৭১ সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটির ৩ যুগ্ন আহবায়কসহ অন্তত ৩০জন সদস্যকে বাদ দিয়ে যে কমিটি অনুমোদন করে আনা হয়েছে; তা বৈধ হতে পারেনা। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অনিয়ম ও দূর্নীতির আশ্রয় নেয়া হতে পারে বলে অধিকাংশ নেতাকর্মীর ধারণা।’
জেলা বিএনপি‘র সাধারন সম্পাদক আবু ইউছুপ চৌধুরী বলেছেন, খাগড়াছড়িতে বিএনপিতে কোন গ্রুপিং এর অস্থিত্ব নেই। ওয়াদুদ ভুইয়ার নেতৃত্বে বিএনপি এখন সাংগঠনিকভাবে অনেক শক্তিশালী ও সংগঠিত।

বিএনপিতে নতুন ধারা

বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর হতে স্পষ্ট দুই ভাগে বিভক্ত খাগড়াছড়ি বিএনপি। এতোদিন জেলা সভাপতি ওয়াদুদ ভুইয়া ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য সমীরণ দেওয়ানের নেতৃত্বাধীন দ্বিধাবিভক্তি দেখা যায়। অতিসম্প্রতি জেলা বিএনপির সভাপতি ওয়াদুদ ভুইয়ার বড় ভাই রামগড় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপি‘র সহ-সভাপতি বেলায়েত হোসেন ভুইয়ার নেতৃত্বে নতুন ধারার আতœপ্রকাশ ঘটে। ‘নাগরিক পরিষদ’ নামে নতুন ধারার কারনে স্থানীয় বিএনপিতে চলছে তোলপাড়। শুরু হয় নতুন হিসেব নিকেশও।
বেলায়েত হোসেন ভূইয়ার সমর্থকরা অভিযোগ করেছেন, কারচুপির মাধ্যমে রামগড় বিএনপি‘র বিভিন্ন কমিটি হতে নিবেদিত, ত্যাগী ও তার (বেলায়েত ভুইয়া) সমর্থিত নেতাকর্মীদের বাদ দেয়া হয়েছে। তারা আরো অভিযোগ করে জানান, রামগড় উপজেলা ও পৌর কমিটিতে সুবিধাবাদীদের জায়গা হয়েছে। কর্মীদের সক্রিয় রাখতেই এই নাগরিক পরিষদ। তারা বলেন, এই কমিটি প্রাথমিকভাবে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী দিবে।
নাগরিক পরিষদের সভাপতি ও রামগড় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন ভুইয়া বলেন, ‘রামগড় বিএনপি‘র দায়িত্ব চলে গেছে উচ্ছৃংখল ও অযোগ্য ছেলেপেলেদের হাতে। ফলে অধিকাংশ ত্যাগী ও যোগ্য নেতারাই বাদ পড়েছেন। বাধ্য হয়েই নাগরিক পরিষদ গঠন করেছি। এতে বিএনপি‘র লাভলস দেখার মত অবস্থা নেই।’
এ বিষয়ে জেলা বিএনপি‘র সাধারন সম্পাদক আবু ইউছুপ চৌধুরী বলেন, নাগরিক পরিষদের কারনে বিএনপি‘র ক্ষতি হবেনা। এছাড়া বেলায়েত হোসেন ভুইয়া বিএনপি‘র কেউ নন। ৪ বছর আগে বিএনপিতে অবসর নেন। এরপর থেকে সাংগঠনিক কাজে আসেননা। একই মন্তব্য করলেন জেলা বিএনপি‘র সিনিয়র সহ-সভাপতি প্রবীন চন্দ্র চাকমা।
জেলা ছাত্রদলের প্রাক্তন আহবায়ক ও বিএনপি‘র তরুন নেতা রিয়াজ উদ্দিন আহমদ রিপন জানান, এটি তৃতীয় কোন ধারা নয়। খাগড়াছড়ি বিএনপি মূলত: দু‘ধারায় বিভক্ত; সমীরণ দেওয়ান ও ওয়াদুদ ভুইয়া গ্রুপ।
তিনি দলের কেউ নন; এমন মন্তব্য সম্পর্কে বেলায়েত ভুইয়া বলেন, প্রবীন চাকমা ও ইউছুপ চৌধুরীরা হলেন মেরুদন্ডহীন। এরা আমাকে বিএনপি থেকে বাদ দেয়ার কে? আমি কখনো দল থেকে অব্যাহতি নেইনি। উপজেলা নির্বাচনের কারনে উপজেলা সভাপতি পদ থেকে সাময়িক অব্যাহতি নিয়েছিলাম।’

সাত বছরে মাত্র তিনবার

ওয়ান এলাভেন সরকারের আমলে যৌথবাহিনীর হাতে আটকের পর হতে এ পর্যন্ত মাত্র তিনবার আসেন খাগড়াছড়ি। একবার ২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর, ২০১১ সালের ১০ অক্টোবর মামলায় হাজিরা দিতে এবং সর্বশেষ বিএনপি নেতার জানাজায় যোগ দিতে ঘন্টা খানেকের জন্য তিনি মাটিরাঙ্গায় আসেন। তিনি ঢাকা অথবা ফেনীর শুভপুরে নিজের করা ‘বাঁশের কেল্লায়’ সময় কাটান। সেখানেও খাগড়াছড়ির নেতাকর্মী সমর্থকরা ছুটে যান অথবা তিনি ঢেকে পাঠান। ইদানিং চট্টগ্রামে দিনের পর দিন কনফারেন্স রুম ভাড়া করে সাংগঠনিক সভা করেন।
জেলা বিএনপি‘র সিনিয়র সহ-সভাপতি প্রবীন চন্দ্র চাকমা জানান, মূলত: ক্ষমতাসীন দলের চাপাচাপিতে প্রশাসন ওয়াদুদ ভুইয়াকে খাগড়াছড়িতে আসতে দিচ্ছেনা। তবে, সময় হলে তিনি ঠিকই খাগড়াছড়িতে চলে আসবেন বলে জানান।
‘অপরাধী বিবেক আতংকের শিকার’ এ কারনেই অনুকূল রাজনীতির পরিবেশে সত্বেও ৭ বছর ধরে খাগড়াছড়িতে আসছেন না ওয়াদুদ ভুইয়া। একথা বলেন, বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম। সমীরন দেওয়ান গ্রুপের আরেক নেতা নাসির আহমদ চৌধুরী জানান, বিএনপি‘র সব নেতারাই খাগড়াছড়িতে থাকতে পারলে ওনার এমন কী নিরাপত্তার সমস্যা হলো।
নিরাপত্তার অজুহাত দেখানো এক সময়ের আলেচিত এই নেতার খাগড়াছড়ি না আসাকে ব্যক্তিগত দূর্বলতাকে দায়ী করেছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।
আওয়ামীলীগের জেলা কমিটির সেক্রেটারী জাহেদুল আলম বলেন, ‘খাগড়াছড়িতে বর্তমান সরকারের আমলে একজন বিএনপি নেতাকর্মীও হামলা মামলার শিকার হননি। ওয়াদুদ ভুইয়া তার শাসনামলের অপকীর্তির ভয়েই হয়তো আসছেনা। এছাড়া নিজ দলের আভ্যন্তরীন দ্বন্দের কারনে ভয়ে আসছেননা।

ওয়াদুদ ভুইয়ার টেলি রাজনীতি

বিগত ৭ বছরের মধ্যে পুরোটাই সময় ছিলেন জেলার বাইরে। তাই বলে রাজনীতির দিক নির্দশনা থেমে থাকেনি তার। টেলি কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজনীতি করেন।
প্রায়ই টেলিফোনে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ডে বিএনপির সভা সভাবেশে বক্তব্য দিয়ে থাকেন।
সর্বশেষ ৩১ জুলাই জেলা বিএনপির ইফতার পার্টিতে টেলি কনফারেন্সে বক্তব্য দেন ওয়াদুদ ভূইয়া। এ সময় তিনি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে খাগড়াছড়ি থেকে নির্বাচন করার আশা প্রকাশ করেছেন। এ জন্য সবাইকে প্রস্তুতি নেয়ারও আহ্বান জানান।
বিএনপি নেতা ও পৌরসভার কাউন্সিলর শাহ আলম বলেন, ‘আমাদের নেতা না থাকলেও তার নির্দেশনা অনুযায়ী সব চলে। টেলি কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি সাংগঠনিক কাজের তদারকি করেন।’

Micro Web Technology

আরো দেখুন

পিসিপি’র সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা

দেশে অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীর জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারি চাকুরীতে সংরক্ষিত ৫% কোটা পুনর্বহালের দাবিতে …

Leave a Reply