নীড় পাতা » খাগড়াছড়ি » খাগড়াছড়ির মেম্বার রাঙামাটিতে হেডমাস্টার !

একসাথে দুই সরকারি দায়িত্বে সূর্য্যলাল

খাগড়াছড়ির মেম্বার রাঙামাটিতে হেডমাস্টার !

সূর্য্যলাল ত্রিপুরা

সূর্য্যলাল ত্রিপুরা। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বোয়াখালি (সদর) ইউনিয়ন পরিষদে যিনি নির্বাচিত মেম্বার (সদস্য) হিসেবে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিই আবার রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক! মেম্বার হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদে নিয়মিত উপস্থিত থাকলেও কিন্তু বিদ্যালয়ে বরাবরই অনুপস্থিত; তবুও টিকে আছে চাকুরি। তবে নিজ কর্মস্থলে একজন বর্গা শিক্ষক দিয়েও রেখেছেন তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম-এর অনুসন্ধানে এমন তথ্য পাওয়ার পর বিষয়টি শুনে রীতিমতো হতবাক হয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা। অবশ্য তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষা কর্মকর্তা।

দীঘিনালা উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, ভোটার তালিকা অনুযায়ী সূর্য্যলাল ত্রিপুরা বোয়ালখালি ইউনিয়নের ৯নম্বর ওয়ার্ডের রাজেন্দ্র কার্বারি পাড়ার ভোটার। ভোটার ক্রমিক ০২৭ আইডি ৪৬০০৭১৬০১৬৬৩, পিতা মৃত- নীতি রায় ত্রিপুরা, মাতা- সাতেন্দ্রী ত্রিপুরা। তবে তিনি বাড়ি স্থানান্তর করে বর্তমানে থাকছেন উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের ভৈরফা নোওয়া পাড়াতে। দীঘিনালার বোয়ালখালি ইউনিয়নের ৯নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান মেম্বার সূর্য্যলাল খাগড়াছড়ি জেলা কৃষকলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বেও রয়েছেন।

অপরদিকে সূর্য্যলাল ত্রিপুরার চাকুরির কর্মস্থল রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের দুর্গম লংকার এলাকার থলছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তিনি। বিদ্যালয়টিতে যেতে হয় সাজেক পর্যটন এলাকা থেকে প্রায় সাড়েতিন ঘন্টা পায়ে হেটে। এত দুর্গম এলাকায় সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্তৃপক্ষের তদারকিও প্রায় অসম্ভব; আর এ সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছেন সূর্য্যলাল।

দীঘিনালার স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে মেম্বারের দায়িত্ব পালন করলেও সূর্য্যলাল ত্রিপুরার বিরুদ্ধে রাঙামাটির স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে ভূয়া সনদে চাকুরি গ্রহনেরও অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাঘাইছড়ির অনেকের দাবি, পার্বত্য এলাকায় এক জেলার বাসিন্দা হয়ে অন্য জেলায় চাকুরিতে আবেদনেরই কোনো সুযোগ নেই; সে ক্ষেত্রে সূর্য্যলাল অবশ্যই স্থায়ী বাসিন্দার সনদে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন।

থলছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বিনয় ত্রিপুরা বিনয় জানান, প্রধান শিক্ষক সূর্য্যলাল ত্রিপুরা বিদ্যালয়ে যান না। বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষকসহ মোট শিক্ষক রয়েছেন চার জন। তবে প্রধান শিক্ষক ২/৪ মাসে কোনো দিন বিদ্যালয়ে গেলেও তিনি কর্মক্ষেত্রে অনিয়মিত। বিনয় জানান, তাদের প্রধান শিক্ষকযে দীঘিনালার মেম্বার তাও জানেন অন্যান্য শিক্ষকরা। তবে সূর্য্যলালের ক্ষমতার প্রভাবে কিছুই বলতে পারেন না তারা। বিদ্যালয়টি আগে বেসরকারি থাকলেও ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয়করণ করা হয়েছে।

সাজেক ইউনিয়নের আরেক মেম্বার জয়পুইথাং ত্রিপুরা। জয়পুইথাং জানান, শিক্ষকতা করার জন্য এ এলাকায় শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন চাকমা সম্প্রদায়ের লোকের অভাব নেই; কিন্তু নেই ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের লোক। তাই বিদ্যালয়টি যখন বেসরকারিভাবে স্থাপনের পর দীঘিনালার সূর্য্যলাল ত্রিপুরাকে এনে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিয়োগের জন্য স-জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হয়।

এ কারণে সূর্য্যলালের জন্য স্থায়ী বাসিন্দার জাল সনদ দেখানো হয়েছিল কী না এমন প্রশ্নের জবাবে জয়পুইথাং বলেন, ‘এত কিছু বললে তো সমস্যা বেড়ে যাবে, ভাই আপনি দেখা করুন একটা নিকুইজিশন করে ফেলি।’ তবে কর্মক্ষেত্রে সূর্য্যলাল অনুপস্থিত থাকেন এবং একই সাথে দীঘিনালায় তিনি যে বর্তমান মেম্বার সেটিও জানেন বলে স্বীকার করেছেন জয়পুইথাং।

থলছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি রবামোহন ত্রিপুরা। তাঁর মোবাইল নম্বরে ফোন দিলে রিসিভ করেন তাঁর বড় ছেলে কলিন ত্রিপুরা। কলিন জানান, তাঁর পিতা দূরে কাজে গেছেন। সে জানায়, থলছড়া পাড়ায় বিদ্যালয়ের পাশেই তাদের বাড়ি। প্রধান শিক্ষক সূর্য্যলাল দীঘিনালার মেম্বার এবং তিনি বিদ্যালয়ে যান না সবই তারা জানেন। তবে প্রধান শিক্ষকের পরিবর্তে পাঠদানের জন্য স্বপন ত্রিপুরা নামে একজন স্থানীয়কে বর্গা শিক্ষক রাখা হয়েছে। বিনিময়ে স্বপনকে বছরে ১২হাজার টাকা দেন প্রধান শিক্ষক সূর্য্যলাল।

এদিকে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বোয়ালখালি (সদর) ইউনিয়নের চেয়ারম্যান চয়ন বিকাশ চাকমা ওরফে কালাধন জানান, সূর্য্যলাল ত্রিপুরা তাঁর ইউনিয়নের ৯নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান মেম্বার। সূর্য্যলাল নিয়মিত ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত থেকে বরাদ্দ, উন্নয়ন কর্মকান্ডসহ সকল কাজেই অংশগ্রহণ করছেন। তবে রাঙামাটিতে সূর্য্যলাল চাকুরি করছেন তা চেয়ারম্যানের জানা নেই।

সূর্য্যলাল ত্রিপুরা জানান, তিনি যখন চাকুরিতে যোগদান করেন তখন বিদ্যালয়টি বেসরকারি ছিল। পরে সরকরারি হলেও এখনো গেজেট হয়নি তাই তিনি মেম্বার পদটি ছাড়েন নি। আরেক প্রশ্নের জবাবে সূর্য্যলাল জানান, প্রথম যোগদানের সময় নিয়োগ দিয়েছিল বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি; তখন রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের নিকট থেকে জাতীয়তার সনদ পত্র নিয়ে সেটি জমা দিয়েই নিয়োগ পেয়েছিলেন।

বাঘাইছড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘এরকম বিষয় আগে জানা ছিলো না। এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলির জন্য শিথিলতা থাকলেও নিয়োগের সুযোগ নেই। আর তিনি এক জেলার শিক্ষক একই সাথে আরেক জেলার মেম্বার এটিতো অসম্ভব কর্মকান্ড।’ তবে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেওয়াও কথা জানিয়েছেন তিনি।

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহসান হাবিব জিতু জানান, ‘একসাথে দুই জেলায় দুই দায়িত্ব পালনের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা বিভাগের সাথে কথা বলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Micro Web Technology

আরো দেখুন

রাবিপ্রবি’র ভর্তি পরীক্ষা শুক্র ও শনিবার

রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ৪ বছর মেয়াদী  প্রথম বর্ষ স্নাতক সম্মান …

Leave a Reply