একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

কে তাকিয়ে কার দিকে?

একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে সরগরম হয়ে উঠেছে পাহাড়। রাঙাামাটি আসনে ছয় প্রার্থী নেমে পড়েছে ভোটযুদ্ধে। প্রতিদিনই একেক জায়গায় নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। বসে নেই তাদের সমর্থকরাও। তারাও ভাগ হয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছে। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ হিসাব কষছে কে আসছে পরবর্তী সংসদ সদস্য হয়ে। কার ভাগ্যে জুটছে আয়তনের দিক দিয়ে দেশের সবচে বড় আসনটি। আর জয় ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য প্রার্থীরাও তাকিয়ে আছে আঞ্চলিক দলগুলোর দিকে। শত্রুর শত্রুকে মিত্র বানিয়ে ভোটযুদ্ধে জেতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রার্থীরা।

এবার রাঙামাটি আসনে ছয় প্রার্থী ভোটযুদ্ধে অংশ নিলেও মূলত লড়াই হবে তিন প্রার্থীর মধ্যেই। আওয়ামীলীগের প্রার্থী দীপংকর তালুকদার, বিএনপির প্রার্থী মনিস্বপন দেওয়ান ও আঞ্চলিক দল জনসংহতি সমিতির প্রার্থী ঊষাতন তালুকদারের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। প্রচারণার শুরুতেই এখনো কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে তেমনটা আঁচ পাওয়া না গেলেও নিজেদের ভোটব্যাংকের পাশাপাশি এবার যাদের ওপর ভর করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে, শেষ পর্যন্ত তাদের সমর্থনের ওপর প্রার্থীর জয়-পরাজয় নির্ভর করছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে তৎকালীন পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার জনসংহতি সমিতির প্রার্থী ঊষাতন তালুকদারের কাছে প্রায় ২০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরে যায়। নির্বাচনে হারার পর থেকেই দীপংকর তালুকদার পরবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রায় ৫ বছর মাঠেই পড়ে ছিলেন। এসময় তিনি মাঠ গোছানোর চেষ্টা করেন। তারই ফলশ্রুতিতে বিএনপির শক্তিশালী ঘাঁটি লংগদু উপজেলায় নানান উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করেন তিনি। সংসদ সদস্য না থাকলেও তাঁর নির্দেশেই এই উপজেলায় বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করা হয়। উন্নয়ন কর্মকান্ড, দলীয় অনুষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার জন্য অন্যান্য উপজেলার তুলনায় এই উপজেলায় তিনি ঘন ঘন সফর করেছেন। এতে এই উপজেলায় তাঁর নিজস্ব একটি ভোটব্যাংক তৈরি হয়েছে। সে হিসেবে এবার বিএনপির শক্তিশালী ঘাঁটি লংগদু থেকে বড় একটি ভোটের আশা করছেন দীপংকর তালুকদার। এছাড়া বরাবরের মতো এবারও সংখ্যালঘু ভোট তাঁর বাক্সেই যাবে। এছাড়া মারমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের ভোট তাঁর বাক্সে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। তবে এসব ছাড়িয়েও স্থানীয় রাজনৈতিক দলের সমর্থনও তাঁর জয়ের পথে বড় সহায়ক কিংবা বাধা হতে পারে। যদি কোনও আঞ্চলিক দলের সমর্থন তিনি আদায় করতে না পারেন সেক্ষেত্রে জয় পাওয়া কষ্টকর হবে তাঁর জন্য। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আঞ্চলিক দুই সংগঠন জনসংহতি সমিতি(এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) এর দুই দলের ভোট তাঁর বাক্সে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি রয়েছে। সে হিসেবে তাঁর জয়ের জন্য এই দুটি দলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে।

২০০১ সালে নির্বাচনে হঠাৎই এসে জনসংহতি সমিতির নীরব সমর্থন নিয়ে আওয়ামীলীগের হেভিওয়েট প্রার্থী দীপংকর তালুকদারকে হারিয়ে তাক লাগিয়ে দেন মনিস্বপন দেওয়ান। পুরস্কার হিসেবে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকারের পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। কিন্তু মেয়াদের শেষদিকে অভ্যন্তরীণ সমস্যার জন্য দল থেকে বের হয়ে যান। দীর্ঘ এক দশকের নীরবতা শেষে স্থানীয় বিএনপি’র গ্রুপিং কাজে লাগিয়ে আবারো বিএনপির মনোনয়ন লাভ করেন মনিস্বপন দেওয়ান। মনোনয়ন লাভের পর থেকে তিনিও নেমে পড়েছেন প্রচারণার কাজে। যেখানে গত পাঁচ বছর আওয়ামীলীগ মাঠ গোছানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন, সেখানে বিএনপি মাত্রই মাঠ গোছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বরাবরই পুনর্বাসিত বাঙালিদের ভোট পেয়ে আসা দলটি এবারও তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। রয়েছে নিজেদের একটা ভোটব্যাংকও। তবে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে হলে শুধুমাত্র সেই ভোটব্যাংক দিয়ে কাজ হবে না। সেটা ভালোভাবেই জানেন দলটির নেতাকর্মীরা। তাইতো ২০০১ সালের মতো আবারো জনসংহতি সমিতির নীরব সমর্থন আশা করছেন দলটি। নেতাকর্মীদের আশা, ২০০১ সালে যেভাবে মনিস্বপন দেওয়ান তাঁর একক কারিশমায় জনসংহতি সমিতির নীরব সমর্থন আদায় করতে পেরেছিল, ঠিক এবারো তাদের সমর্থন আদায় করতে পারবেন। যদি জনসংহতি সমিতির সমর্থন পাওয়া যায়, তবে বিএনপির জয়লাভ সহজ হয়ে যাবে। তবে ২০০১ সালে জনসংহতি সমিতির প্রার্থী না থাকলেও এবার তাদের বর্তমান সাংসদ ঊষাতন তালুকদার প্রার্থী রয়েছেন। তাই দলটি শেষ পর্যন্ত কি ভাবছে তার ওপরই বিএনপির জয়-পরাজয় নির্ভর করছে।

অন্যদিকে গতবার বিএনপিবিহীন নির্বাচনে জয়লাভ করেন জনসংহতি সমিতির প্রার্থী ঊষাতন তালুকদার। ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো দলটি সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেয়। সেবার দলটির প্রার্থী উষাতন তালুকদার প্রায় ৫১ হাজার ভোট পান। কিন্তু পাঁচ বছরের ব্যবধানে ২০১৪ সালে প্রায় দ্বিগুণ ভোট পেয়ে ঊষাতন তালুকদার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে এজন্য আওয়ামীলীগ ৫৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট ডাকাতির অভিযোগ তুলেন। এবারও ঊষাতন তালুকদার ঐসব কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে আছেন। চাকমা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯০ ভাগ ভোট তাদের বাক্সে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে সেক্ষেত্রে বাঙালি তেমন একটা ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা নেই এই প্রার্থীর। ব্যক্তি ইমেজে কিছু বাঙালি ভোট সংগ্রহ করতে পারলেও সেটা খুব আহামরি নয়। সে হিসেবে তাঁর চোখ এককালের পরম শত্রু ইউপিডিএফের দিকে। বিভিন্ন সূত্রে খবরে জানা যায়, এককালের শত্রু ইউপিডিএফের সাথে ইতোমধ্যে জনসংহতি সমিতির যে মনোমালিন্য ছিলো, সেটা অনেকাংশে দূর হয়েছে। দল দু’টির মধ্যে এখন তেমন একটা বিভেদও নেই। দলীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফের প্রার্থীকে সমর্থন ও রাঙামাটিতে জনসংহতি সমিতিকে সমর্থন দেওয়া হবে এমন সমঝোতায় দল দু’টি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তাইতো রাঙামাটি আসনে ইউপিডিএফ থেকে দু’জন মনোনয়ন জমা দিলেও ইতোমধ্যে দু’জনই মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন। সে হিসেবে জনসংহতি সমিতি শুধুমাত্র নিজের ভোটের দিকে তাকিয়ে থাকলে জয় পাওয়া অনেকটা কষ্টকর হয়ে পড়বে। তাই ইউপিডিএফের সমর্থনের দিকে তাকিয়ে থাকবে দলটি। যা তারা ইতোমধ্যে আদায় করতে সক্ষমও হয়েছে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

বান্দরবানে ডেঙ্গুরোগ প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান

সারাদেশে ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যাওয়ায় আর এডিস মশার প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় ডেঙ্গু রোগ থেকে সকলকে …

Leave a Reply