নীড় পাতা » সাক্ষাৎকার » কেমন ছিল দেবাশীষ রায়ের ছেলেবেলা?

কেমন ছিল দেবাশীষ রায়ের ছেলেবেলা?

চাকমা সার্কেল চীফ ব্যারিষ্টার রাজা দেবাশীষ রায়। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী। নিজ নামেই পরিচিত সারাদেশের,সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে। আন্তর্জাতিক নানা ফোরামে সারা বিশ্বের আদিবাসীদের কণ্ঠস্বরও তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত বিনয়ী এই রাজার মুখোমুখি হয়েছিলাম আমরা । খোলামেলা আলোচনায় তিনি জানিয়েছেন,নিজের ফেলে আসা শৈশব, স্কুলজীবন,বন্ধু বান্ধবীদের কথা,আরো কত কি! স্কুলবেলার বন্ধুদের জন্য সেই আলোচনার চুম্বক অংশটি তুলে ধরা হলো –

আপনার জন্ম এবং জন্মস্থান সম্পর্কে বলুন

আমার জন্ম ১৯৫৯ সালের ১০ এপ্রিল। তবে রাত ১.৩০ এ হওয়ায় তৎকালীন রেওয়াজ ধরে ৯ই এপ্রিল দলিলপত্রে লেখা হয়ে থাকে। আমাদের চট্টগ্রামের রাজাপুর লেইনের বাসায়।

পড়াশুনার শুরুটা সম্পর্কে যদি বলেন

আমার আনুষ্ঠানিক পড়াশুনা শুরু হয়েছিলো বেশ কিছুটা দেরীতে। সাত বছর বয়সে আমি স্কুলে যাওয়া শুরু করি। তবে এর আগে আমার বাসায় গৃহশিক্ষক ছিলো, আমি তাদের কাছেই আমার প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ শুরু করি। এরপর আমার আনুষ্ঠানিক পড়াশুনা শুরু হয় চট্টগ্রামের সেন্ট প্লাসিড্স হাই স্কুল থেকে। সেখানে আমি ১৯৭১ এর মার্চ পর্যন্ত পড়াশুনা করেছি। এই সময় ২/১ বছর আমার স্কুলে পড়াশুনার গ্যাপ পরে। সেই সময় আমার বাসায় পূর্নমোহন দেওয়ান নামের একজন পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন,তিনিই আমাকে পড়াতেন। এইভাবে ২ বছর আমি পড়াশুনা করি। এরপর ১৯৭৩ সালে রাঙাামটি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণীতে ভর্তি হই। এই স্কুল থেকেই আমি ১৯৭৬ সালে এসএসসি পাশ করি। দ্বিতীয় বিভাগে আমি পাশ করলেও আমার আজও মনে হয় আমার খাতার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি। কারণ এইচএসসিতে প্রায় একই মানের পরীক্ষা দিয়েই আমি প্রথম বিভাগ পেয়েছি। এরপর রাঙামাটি কলেজে আমি ভর্তি হই,এইখান থেকেই আমি বিএ পাশ করেছি।

আপনার শিক্ষা জীবনের প্রিয় শিক্ষকদের সম্পর্কে বলুন

আমাদের সময় রাঙাামটি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন এমাদুল ইসলাম। আমার খুবই পিয় এবং শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক ছিলেন তিনি। তিনি কেবল আমার কাছেই নয়,সব ছাত্রদের কাছেই তিনি শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন তিনি। ছিলেন সহকারী প্রধান শিক্ষক কুঞ্জ বিহারী সাহা। এছাড়াও প্রিয় শ্রেণী শিক্ষক ছিলেন ৮ম শ্রেণীর হরিকমল দত্ত,নবম শ্রেণীতে আলাউদ্দিন স্যার,দশম শ্রেণীতে সুবোধ স্যার। এদের সবার কথাই খুব মনে পড়ে।
যোগ্রেন্দ্রনাথ পোদ্দার নামের একজন স্যারের কথা মনে পড়ে,তিনি বাংলা পাড়াতেন, এতো ভালো করে সমাস বুঝাতেন যা আজো ভুলিনি। তিনি খেলাধূলার প্রতি খুব আগ্রহী ছিলেন। স্কুলের ফুটবল টীমে তার প্রচেষ্টায় আমি এবং দয়াল অল্প বয়সী হওয়া সত্ত্বেও সুযোগ পেয়েছি। আর ছিলেন আওয়াল স্যার। তিনি সবসময় রাস্তার একপাশ ধরে হাঁটতেন। তাই আমরা অনেকেই আড়ালে আবঢালে ওনাকে ‘তক্যা’ বলেও ডাকতাম। প্রত্যেক শিক্ষককে ছাত্র-ছাত্রীদের দ্বারা একটি বিশেষ নামে দেওয়ার একটা রেওয়াজ ছিলো। পালি পড়াতেন নতুন বিহারী স্যার,লাইব্রেরিয়ান বনবিহারী স্যার,———–স্যার(রাজীবের বাবা)। ছিলেন বকুল বালা দিদি (মনিস্বপন দেওয়ানের মা), ওনি খুব কড়া ছিলেন, মেযেরা ওনাকে খুব ভয় পেতো। খুবই শৃংখলা মেনে চলা একজন মহিলা ছিলেন তিনি।
তবে মাঝখানে দিনকয়েক আমি শাহ উচ্চ বিদ্যালয়েও পড়েছি। সেই সময় নির্মলেন্দু স্যার, (অরুন স্যার,পন্ডিত) J. High School স্যারের কথা মনে পড়ছে।

আপনার স্কুল জীবনের বন্ধুদের কথা বলুন-

আমার আসলে বন্ধুত্বের প্রকারটা ভিন্ন ছিলো। কেউ ছিলো বাড়ীর পাশের অর্র্থাৎ একই এলাকার হওয়ায় খেলার সাথী হিসেবে বন্ধু,কেউ কেউ একসাথে পড়ার বন্ধু,চট্টগ্রামে থাকার সুবাদে কিছু বন্ধু,আর সারাজীবন ভরই যোগাযোগ ছিলো এমন বন্ধু।
প্রথমেই বলি চট্টগ্রামের কথা। সেখানে স্কুলে নবার্ট ম্যান্ডেজ নামের এক বন্ধু ছিলো,খুবই ঘনিষ্ঠ। খুব দুষ্ট আর প্রানবন্ত ছিলো ম্যান্ডেজ। সে আর আমি চাইনিজ বল (সেই সময়ের জনপ্রিয় খেলা) খেলতাম। বহু বছর পর কিছুদিন আগে তার সাথে আবার যোগাযোগ হলো। সে আমেরিকা-ঢাকা আসা যাওয়া করে,ব্যবসা করে।
আরেকজন এখনকার বিখ্যাত স্থপতি ফুয়াদ মালিক। আরেকজন সুজিত সরকার,ওর বাবার ঘড়ির দোকান ছিলো। কামরুজ্জমান নামের এক খুবই ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলো,যার সাথে আর কোনদিন যোাগযোগ হয়নি।
আর ছিলো জনি ও অ্যালেন হ্লাসীন। কিন্তু আমরা ওকে বার্মিজ নামে ডাকতাম। পরে শুনেছি সে রাখাইন।
আর রাজাপুর লেইনে আমার যারা বন্ধু বা খেলার সাথী ছিলো তাদের মধ্য টিপু আহমেদ নামের একজন ছিলো,সে আসলে আমার ক্রিকেট খেলার বন্ধু ছিলো।

এবার আসি রাঙামাটিতে-

এখানে খুব ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলো-এখন কানাডা প্রবাসী আশীষ দেওয়ান,সে আবার আমাদের আত্মীয়ও। ছিলো জীবক রায়, উমেশ রায়, রীতেন দেওয়ান, গৌতম রায়, রাহুল রায়। আমরা একসাথে পিকনিকে যেতাম। ছিলেন করবী রায় (এখন স্কুল টিচার),ডাক্তার সুচরিতা (তিনি যদিও আমাদের একটু সিনিয়র ছিলেন)।
ছিলো মদন মোহন চাকমা, দীপ্তেন দেওয়ান, শোভা চন্দ্র চাকমা,সূর্যচন্দ্র চাকমা,গোলাম মোস্তফা ( এখন উন্নয়ন বোর্ডে চাকুরী করে), চঞ্চল বড়–য়া।
রাঙামাটিতে স্কুলে যারা বন্ধু ছিলো তারা হলো প্রকাশ দেওয়ান (এখন কাস্টমসে চাকুরী করে),দিবাকর চাকমা (অনেকদিন যোাগযোগ হয়না নাকি প্রয়াত, চেক করতে হবে),দিলীপ কুমার চাকমা,অমিত রায়,সুভাষ চন্দ্র চাকমা, আরো অনেকেই। এখন তো অনেকেই নেই,কেউ কেউ মারাও গেছে,আবার সময়ের ব্যবধানে হয়ত অনেকের নামই ঠিকমতো মনে পড়ছেনা।
ক্লাসমেট ছিলো মিনাক্ষী খীসা,নাসিরউদ্দিন। ছিলো প্রকৌশলী জীবন রোয়াজা ( এখনো নিয়মিত যার সাথে যোাগযোগ হয়)।

সারাজীবনই যোগাযোগ ছিলো এমন বন্ধুরা হলো-

নবার্ট ম্যান্ডেজ। বহুবছর পর হঠাৎ দেখা হওয়ার পর থেকেই নিয়মিত যোগাযোগও হচ্ছে। প্রকাশ দেওয়ান,জীবন রোয়াজা আর দীলিপ কুমার চাকমার সাথে মাঝে মধ্যে যোগাযোগ ছিলো সব সময়ই।

ছোটবেলায় প্রিয় খেলা ছিলো?

জীবনের বেড়ে উঠার স্তরে স্তরে এটি পরিবর্তন হয়েছে। কখনো বাস্টেকবল খেলেছি,আবার কখনো ক্রিকেট। তবে ক্রিকেট,ব্যাডমিন্টন এবং ফুটবলই ছিলো প্রিয় খেলা। তবে এ্যাথলেটিক এর প্রতিও আগ্রহ ছিলো। রাঙামাটি কলেজে যে চার বছর পড়েছি সেই সময় এ্যাথলেটিক ছিলো খুবই প্রিয় ইভেন্ট। ছেলেবেলায ডাংগুলি খেলেছি, কুস্তি এবং বক্সিংও লড়েছি। কাঠের তরবারী নিয়ে যুদ্ধ করেছি। দা দিয়ে গুহা বানাতাম। গোয়েন্দা গোয়েন্দা খেলা পছন্দ করতাম।
বন্ধুদের অনেকেই শিকার পছন্দ করত। তাই আমিও মাঝে মাঝে শিকারে গেছি। তখন একসাথে বনভোজনে যেতাম। সেটিও ছিলো খেলার মতই।

মজার স্মৃতি-

আমরা বন্ধুরা সবাই মিলে নৌকা নিয়ে বনভোজনে যেতাম। মানিকছড়িতে একটা বড় ঝর্না ছিলো। সেখানে অনেকবার গেছি। বন্ধুরা সবাই মিলে মোরগ কিনতাম,তখন একটা মোরগের দাম ছিলো ২/৩ টাকা। বনভোজনে অনেক মজা হতো । ছেলেরা লাকড়ী যোগাড় করত আর পানি আনত। মেয়েরা রান্না করত। কখনো কখনো ছেলেরাও রান্না করত। তখনতো রান্না করেই বনভোজন হতো। এখন তো অনেকে রান্না করে নিয়ে যায়। কিন্তু আমরা সেইসময় সত্যিকার বনভোজনই করতাম। সেখানে অন্য ধরণের একটা আকর্ষন,একটা মজা ছিলো।

ছোটবেলার কোন উৎসবের কথা মনে পড়ে-

আমাদের সময় দুইটি বড় উৎসব ছিলো। একটি বিজু আর অন্যটি রাজপুন্যাহ। এছাড়াও গ্রামে বেড়াতে যাওয়াও ছিলো আমাদের কাছে এক ধরনের উৎসবের মতো। এই্ সময় আমরা গরু এবং মহিষের পিঠে ছড়তাম। গ্রামের লোকদের কাছে কবিতা আর ছড়া শুনতাম। শুনতাম গেংখুলি আর উভগীত। গ্রামের স্মৃতি অন্য রকম। গ্রাম একেবারেই আলাদা। এখনো গ্রামে গেলে আমি ভীন্ন রকম অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হই। বিঝু উৎসবে সকালে উঠেই গোসল করতাম,নতুন কাপড় চোপড় পড়ে (ঈদ ও পূজার মতো) বেরিয়ে পড়তাম বাড়ী বাড়ী বেড়াতে। আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো,কে কত বেশি বাড়ী বেড়াতে পারে। আমার মনে হয় সেই সময় দিনে ৩০/৪০টি বাড়ী বেড়াতে পারতাম। এখন ভাবি,কিভাবে যে সেটা সম্ভব হতো !
আর রাজপূণ্যার সময় পুরো রাজবাড়ী প্রাঙ্গন ও রাজদ্বীপ এলাকা যেনো উৎসবের আমেজে সাজত। দরবারের সময় ব্যান্ডের সানাই ছিলো আমাদের জন্য বড় একটি আকর্ষন। দুইটি ব্যান্ড পার্টি আসতো মেলায়। একটি আসত রাজনগর থকে আরেকটি স্থানীয়। দরবারের সময় পারিবারের ছেলেদের পাগড়ি পড়তে হতো। সেই পাগড়ি পড়ে ২ ঘন্টা বসে থাকা ছিলো আমাদের জন্য ভীষণ কষ্টের। তবে সেই বসে থাকার সময়ও নিজেদের মধ্যে দুষ্টমি করতাম। তবে সেটা করতাম খুব গোপনে,যেনো বাবা টের না পায় সেইভাবে।
মেলার সময় পুরো এলাকা জুড়ে ছিলো অজস্র দোকান। মেলার শেষ দিন কম দামে দোকানীরা জিনিসপত্র ছেড়ে দিতো। মেলার সময় যাত্রা হতো। সেই যাত্রার প্রতি আমাদের টানটা ছিলো অন্যরকম। রাত জেগে জেগে যাত্রা দেখতাম। আর আমাদের কাছে যাত্রার সবচে আর্কষনীয় পর্ব ছিলো যুদ্ধ পর্বটা। অন্য সংলাপ অনেক বুঝতামনা। ২/৩ রাত ধরে যাত্রা চলত।

কষ্টের স্মৃতি –

আমি যখন চট্টগ্রাম পড়তাম সেই সময় বাবা-মাকে ছাড়া চট্টগ্রামে থাকার সময়টাকে আমার বেশ কষ্টের মন হতো। পড়াশুনার জন্যই যদিও এই থাকা,তবু সেখানে একদম মন টিকতনা। তাই যতবারই চট্টগ্রাম যেতে হতো সেই যাত্রাপর্বটিতে আমার খুব কষ্টের মনে হতো। আবার যখন চট্টগ্রাম থেকে রাঙামাটি আসতাম সেই সময় যখন মানিকছড়ি পাহাড়ে গাড়ী উঠলেই রাঙামাটি শহর পুরো দেখা যেতো, তখন মনটা খুশিতে ভরে উঠত।

আনন্দের স্মৃতি –

বিঝুর স্মৃতি,রাচজপূণ্যাহর স্মৃতি,গ্রামে বেড়াতে যাওয়ার স্মৃতি,ঝর্ণায় গোসল করার স্মৃতি সবই ছিলো বেশ আনন্দের। বিশেষ করে রাজপুন্যাহর স্মৃতি। এখনো ঢাকের শব্দ শুনলেই ছেলেবেলার রাজপূণ্যার কথা মনে পড়ে যায়।

রাজপরিবারের সন্তান হিসেবে বন্ধুদের সাথে কি সহজে মিশতে পারতেন ?

অন্য দশটা ছেলেমেয়ের সাথে আমি কখনই আমার কোন পার্থক্য খুঁজে পাইনি। উপলদ্ধি করিনি। আমার পরিবার থেকেও এই ব্যাপারে কোন বাধা নিষেধ ছিলোনা। চট্টগ্রামে পড়ার সময়তো এটা বুঝতেই পারিনি,সেখানে এটা কোন ব্যাপারাই ছিলোনা। তারা তো আর জানতো না আমি কার ছেলে,কোত্থেকে এসেছি। সবাই ছিল বন্ধু।
তবে রাঙামাটি হাই স্কুলে ভর্তির পর একটা সমস্যায় পড়ি। মা তো আমাকে পায়ে জুতা-মৌজা পড়িয়ে পাঠাতেন। কিন্তু অধিকাংশ ছাত্রই সেন্ডেল পড়ে আসত। বিষয়টি আামর কাছে কেমন যেনো লাগত। খুব অস্বস্তিঃ বা এরকই কিছু। আমি কি করতাম বাসা থেকে জুতা পড়ে গেলেও মার অজান্তে বাগানে জুতা খুলে সেন্ডেল পড়ে নিতাম। পড়ে অবশ্য কোন কোন সময় বাসা থেকে সেন্ডেল পড়েও যেতাম।

আপনার প্রিয় লেখক কে ?

যেহেতু আমার পড়াশুনার বড় একটা অংশই ছিলো ইংরেজীতে,তাই এনিড ব্লাইস্টন নামের একজন লেখকের বই ছোটবেলায় খুব পড়তাম। স্কুলে যেসব লেখকের কবিতা বা ছড়া পড়েছি তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ,জসীমউদ্দীন এবং বন্দে আলী মিয়ার লেখা ভালো লাগত।
এখন ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথ,নাটকে অস্কার ওয়াইল্ড,নাটক এবং গদ্যে সমারসেট মম এর রেখা আমার ভালো লাগে। চাকমা কবিতা পড়েও আমি বেশ আনন্দ পাই। নিজেও কিছু কিছু লিখেছিও। তবে দীপংকর শ্রীজ্ঞান এর কবিতা আমার ভালো লাগে। গীতিকবিতার মধ্যে কুমার সমিত রায় এবং গদ্য সাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ এবং তার ‘লালসালু’ আমাকে ভীষন মুগ্ধ করে।
বিশ্ব সাহিত্যে ভিএস নাইপল এর কিছু লেখা এবং ডেভিড লজ এর লেখার ভক্ত আমি।

আপনার সময় আর বর্তমান সময়ের শিক্ষকের মধ্যে যে পার্থক্য, তাকে কিভাবে দেখেন?

তখন প্রাইভেট টিউশন কম ছিলো,শিক্ষকরা অনেক বেশি আত্মত্যাগী ছিলেন। শিক্ষক মানেই অন্ধভাবে একটা বিশ্বাস ছিলো। তখনকার শিক্ষক মানেই এমন একজন যাকে চোখ বন্ধ করেই অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করা যায়।
এখন পরিস্থিতি অনেক বদলেছে। শিক্ষকরা- ছাত্রদের সাথে অনেক বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ,শিক্ষকদের প্রতি ভয় বা ভীতিও কমে গেছে। শিক্ষকদের অনেক এখন অনেক সুযোগ আছে। প্রচুর প্রশিক্ষন পাচ্ছেন শিক্ষকরা। কিন্তু কোথায় যেনো একটা ছন্দপতন আছে। তবে, সেটা হয়তো আমার sentimentalism.

দাদা, আবার কি ছেলেবেলায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করে ?

দেখুন,জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের আলাদা আলাদা মজা আছে। শৈশব বা কৈশরের মজাটা আলাদা। স্কুলে পড়ার সময় পড়া আর মজা করা ছাড়া আর কোন কাজ নেই,যেসখানে ফিরে যাবো এটা বলবনা,তবে সেই জীবনটা বড় মধুর, এটা নিদ্বির্ধায় বলি। তবে পরের জীবনটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কৈশর,যৌবন এবং এখনকার সময়। প্রতিটি সময় এবং সেই সময়ের বহমান জীবনের অনুভূতি আমার মনে হয় আলাদা আলাদা।

আপনাদের সাথে এখনকার শিক্ষকদের পার্থক্য কোথায় ?

এখনকার শিশুরা অনেক বেশি আধুনিক। তারা ইন্টারনেট,কম্পিউটার এর কত কাছকাছি। তাদের জন্য অনেক সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান। কিন্তু নগরায়নের প্রভাব তাদের জীবনেও। তারা তাদের পরিবেশ প্রতিবেশ সম্পর্কে জানেনা। এখনকার শিশুরা পশু পাখীর নাম বলতে পারেনা,ছবি দেখেই তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় কোনটা কোন প্রাণী বা পাখী। প্রকৃতি থেকে সে অনেক ধূরে।
এখন পড়াশুনা মানেই ক্লাসে আর বাসায় পড়াশুনা। প্রকৃতির কাছাকাছি গিয়ে শেখা সেটাতো এখন নেই। তাকে অবশ্যই আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে হবে,শিখতে হবে,পাশাপাশি তার প্রতিবেশ এবং পরিবেশ সম্পর্কে জানতে হবে।

এর জন্য কি করা যেতে পারে ?

পরিবেশ-প্রতিবেশ-জলবায়ু সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জানতে হবে। এর জন্য কয়েক মাস পর পর অন্ততঃ ক্লাসভিত্তিক বা বয়সভিত্তিক শিক্ষা সফর বা আউটিং হতে পারে। বাইরে প্রাকটিক্যাল ক্লাস হতে পারে। উদ্ভিদবিজ্ঞান বা পরিবেশ বিজ্ঞান সম্পর্কে তো ক্লাসে বসে পড়লেই হবেনা,তাকে পরিবেশ আর উদ্ভিদের কাছে যেতে হবে। তাহলেই তার পরিবেশ প্রতিবেশ এবং আদিবাসী জনবৈচিত্র্যের ও সাংস্কৃতিক বহু মাত্রিকতার প্রতি তার শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা বাড়বে। বাইরের অনেক দেশেই এই পদ্ধতি চালু আছে।
এখনকার শিক্ষার্থীরা সংস্কৃতি,পরিবেশ,প্রতিবেশ সম্পর্কে যা পড়ছে,তাতো রূপকথা। সেতো জীবনেও তা দেখেনি ! শিক্ষা মন্ত্রনালয় ও প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগকে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। এই খাতে তাদের বরাদ্ধ রাখতে হবে। এতে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীলতা বাড়বে।

রাঙামাটি শহরে একটি শিশু পার্ক নেই,এমনকি পার্বত্য তিন জেলা শহরের কোথাও কোন শিশু পার্ক নেই , এটাকে কিভাবে দেখেন ?

বিষয়টি দুঃখজনক। আমি ভাবছি,আমি নিজেই অন্ততঃ একটা পার্ক করব। শিশুদের জন্য। শিক্ষার্থীদের জন্য কোন প্রবেশ ফি থাকবেনা। আমি ইতোমধ্যেই কার্যক্রম শুরু করেছি। তবে ওদের জন্য একটি পার্কতো থাকাই উচিত। এই ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
শিশুদের নিজস্ব কিছু অধিকার আছে,তা আমরা ভূলে যাই। শিশুরা যেটা চায় সেটাকে আমাদের অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। শিশুদের জন্য মিটিং হয়,কিন্তু দেখা যায় সেখানে কোন শিশু নেই। শিশুদের জন্য সিদ্ধান্ত নেয় বয়োজ্যোষ্ঠরা। যেমন মেয়েদের জন্য সিদ্ধান্ত নেয় ছেলেরা। এর ফলে বড়দের সম্পর্কে শিশুর মধ্যে বিরূপ ধারণা তৈরি হয়। শিশুদের তাদের ক্লাস রুমের রঙ কি হবে সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে। আমরা বড়রা যে রঙ করি সেটা তার পছন্দ নাও হতে পারে। আর ক্লাস রুমের রঙ কি সবসময় সাদা’ই হতে হবে ? সেটা রঙিন হলে কোন সমস্যা আছে ?

ছোটবেলায় কি হতে চাইতেন ?

আসলে কি যে হতে চাইতাম ! সবসময় ভাবনারা বদলাতো। কখনো মনে হতো জঙ্গলে যাবো,ডাকাতের সাথে যুদ্ধ করব,আবার বড় হয়ে ভেবেছি নৃতত্ববিধ হবো, নৃগোষ্ঠী সম্পর্কে জানব,তবে সবসময় এমন কিছুই হতে চাইতাম,যাতে নিজের মতো করে কাজ করতে পারব। কারো অধীনতা থাকবেনা।
তবে এখন যা আছি আমি তা নিয়ে আমি সন্তুষ্ট । সারা পৃথিবীর আদিবাসীদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছ্ িপৃথিবীর দেশে দেশে সুযোগ পেলেই ঘুরে বেড়িয়েছি। ঘুরে বেড়াচ্ছি। আদিবাসী এবং সংখ্যালঘু,সুবিধা বঞ্চিতদের মানবিাধিকার, পরিবেশ,প্রতিবেশ নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছি।

আপনি তো পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরেছেন,সেখানকার শিশুদের সাথে আমাদের শিশুদের পার্থক্য কোথায় ?

দেখুন,পার্থক্যটা আসলে দেশ বা জনপদেও না। পার্থক্য গ্রাম বা শহরের। নিউই্য়র্কের একটা শিশু এবং গুলশানের একটা শিশুর মধ্যে আসলে খুব একটা পার্থক্য নেই। পার্থক্যটা সুভলং এর শিশুর সাথে। আবার পেরুর একজন আদিবাসী শিশুর সাথে আমাদের আদিবাসী সমাজের একজন শিশুর মধ্যে প্রচুর মিল আছে। এর সাথে পরিবেশ এবং প্রতিবেশ জড়িত। ধনী এবং দারিদ্রতা জড়িত। সুযোগ এবং সুবিধাবজ্ঞিত থাকার বিষয়টি জড়িত।

সারাজীবন আপনার ব্যক্তিগত জীবনে অনুসরণীয় মানুষ ছিলেন কে ?

একাধিকজন ছিলেন। তবে আমি সবচে বেশি প্রভাবিত হয়েছি নেলসন ম্যান্ডেলা দ্বারা। ওনার যে সাহস,প্রজ্ঞা,সততা তা আমাকে মুগ্ধ করেছে। ওনাকে দেখলেই আমার মনে হয় তার মধ্যে হিংসা বলে কোন জিনিস নাই। আর এই কারণেই যারা ওনাকে সারজীবন কষ্ট দিয়েছে ,জেলে পুরে রেখেছে তিনি তাদের কি নিদ্বির্ধায় ক্ষমা করে দিয়েছেন। তার এই মহত্ত্বের কারণেই আফ্রিকায় আজকের পরিবর্তন। সহাবস্থান।
আর আরেকজন শ্রদ্ধেয় ‘বনভান্তে’। সর্বগুরু। তার কাছ থেকে একটা শিক্ষা পেয়েছি-সকরের প্রতি মৈত্রীভাব পোষণ কর। তিনি বলেন-আমি কারো বড়ও না ছোটও না,সমানও না। এটা আমাকে জীবন চলতে সহযোগিতা করেছেন।
আসলে জীবনকে যেভাবে চলে সেভাবে দেখলেই হয়, নিজের মতো করে না দেখলেই হয়।

স্কুলবেলা সম্পর্কে বলুন –

প্রথমতঃ এটা খুবই ভালো একটি উদ্যোগ। শিশুদের জন্য ভাবে,শিশুদের জন্য সময় দেয়,এমন মানুষ বিরল। শিশুদের জন্য,তাদের জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য এই প্রকাশনাটি অব্যাহত থাকা প্রয়োজন। এই কাজে সবার সহযোগতা করার উচিত। পাশাপাশি স্কুলবেলা যেনো পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ সারাদেশের সকল শিশুর কাছে পৌঁছে দেয়া যায় সেই ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। স্কুলবেলার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা,এটাই আমার জীবনের সবচে বড় অহংকার’

এখনো ঘুমঘোরে দূর অতীতে ফিরে যান মনীষ। ক্যাডেট কলেজের মেধাবী এক ছাত্র নিজ মাতৃভূমিতে ভিনদেশী …

One comment

  1. Thanks you very much. After long time you have remembered name of favourite teacher. I am eldest son of Awal sir.

Leave a Reply

%d bloggers like this: