নীড় পাতা » ফিচার » অন্য আলো » কাজের আগে নয় কোটি ৪৪ লাখ টাকা বিল উত্তোলন!

কাজের আগে নয় কোটি ৪৪ লাখ টাকা বিল উত্তোলন!

রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার ঘিলাছড়ি-বুড়িঘাট সড়কের সাড়ে সাত কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সড়ক নির্মাণকাজের শতভাগ অগ্রগতি দেখিয়ে আট মাস আগে নয় কোটি ৪৪ লাখ ৭০ হাজার ৮৩৯ টাকা বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। অথচ এখনো সড়কের নির্মাণকাজ চলছে ধীরগতিতে।
সড়কটির তিনটি কাজ নিম্নদরে নেওয়ার পর আবার কৌশলে তা বাড়িয়ে নেওয়া এবং নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে সড়ক নির্মাণের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) যৌথ অর্থায়নে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পের’ আওতাধীন এ সড়কটি নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
এলজিইডির রাঙামাটি নির্বাহী প্রকৌশলী মলয় কুমার ভৌমিক কাজে কিছু অনিয়ম হওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে দুর্নীতির বিষয়টি স্বীকার করেননি।
মলয় কুমার ভৌমিক বলেন, ‘আমরা টাকাগুলো রেখে দিয়েছি। কাজ দেখে তা পরিশোধ করছি। এখানে দুর্নীতির কিছু নেই।’
এভাবে ঠিকাদারের বিল নিজের কাছে রাখার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নির্বাহী প্রকৌশলী উত্তর দেননি।
যেভাবে টাকা তুলে নেওয়া হয়: সড়কের ৩ থেকে ১০ দশমিক ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত কাজের তিনটি অংশে ভাগ করে দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে। পরে একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর তিনটি কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কাজের সর্বশেষ সময়সীমা দেওয়া হয় ২০১২ সালের ১৫ ডিসেম্বর। কিন্তু ওই সময়ে সড়ক নির্মাণের কাজই শুরু করা হয়নি। পরে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ কাজের সময় বাড়িয়ে ২০১৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করে।
‘পার্বত্য চট্টগ্রাম গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পের’ সর্বশেষ সময়সীমাও ছিল ২০১৩ সালের ৩০ জুন। বর্ধিত সময়ে কাজ শুরুর আগেই ঠিকাদার প্রকৌশলীদের যোগসাজশে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে সব টাকা তুলে নেন।
অভিযোগ রয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলী জোর করে বিল করতে বাধ্য করেছেন। অগ্রিম বিল দেওয়া ও জোর করে বিল করানোর বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মলয় কুমার ভৌমিক বলেন, ‘কাজের স্বার্থে অনিয়ম হলেও তা করতে হয়েছে। কাজ তো এখন চলছে। প্রকল্প শেষ হয়ে যাওয়ার পর টাকা রয়ে গেলে তা ফেরত নেওয়া হতো।’
কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন: কাজের দরপত্র অনুযায়ী সড়কের মাটি কেটে বক্স করে প্রথমে ছয় ইঞ্চি বালু, তারপর ছয় ইঞ্চি বালু ও এক নম্বর ইটের খোয়া এবং ওপরের অংশের ছয় ইঞ্চি এক নম্বর ইটের খোয়া দেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু সড়ক নির্মাণে ব্যবহার হচ্ছে নিম্নমানের ইটের খোয়া ও পাহাড়ের মাটি।
এলজিইডির একাধিক সূত্র জানায়, কাজের বিল হয়ে যাওয়ায় ঠিকাদারেরা প্রকৌশলীদের কথা মানছেন না। তবে নির্বাহী প্রকৌশলীর দাবি, কাজের গুণগতমানের কোনো হেরফের হচ্ছে না।
কাজ না করে বর্ধিত বিল: সড়কের তিন থেকে পাঁচ কিলোমিটার অংশের দর ছিল তিন কোটি ১৫ লাখ ৯২ হাজার ১০১ টাকা। কিন্তু তা নিম্নদর দিয়ে দুই কোটি ৯৫ লাখ ৪৭ হাজার ৬০৪ টাকায় ঠিকাদার অনন্ত বিকাশ ত্রিপুরার নামে কাজটি নেওয়া হয়। কিন্তু কাজ শুরু না হতেই তা বাড়িয়ে করা হয় তিন কোটি চার লাখ ৭৭৪ টাকা।
একইভাবে পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটার অংশের কাজের দর ছিল দুই কোটি ৮৮ লাখ ৫৪ হাজার ৬০০ টাকা। নিম্নদর দিয়ে দুই কোটি ৮৭ লাখ দুই হাজার ৬৫৬ টাকায় কাজটি নেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাঙামাটি ট্রেডার্স। পরে তা বাড়িয়ে করা হয়, দুই কোটি ৯৬ লাখ ৯১ হাজার ৭৬৯ টাকা।
৭ থেকে ১০ দশমিক ৫ কিলোমিটার অংশের দর ছিল তিন কোটি ৩৩ লাখ ২৩ হাজার ৮১৬ টাকা। এই কাজটি নিম্নদর দিয়ে দুই কোটি ৯৫ লাখ ৫৪ হাজার ৮৯২ টাকায় নেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড সাপ্লাইয়ার্স। পরে তা বাড়িয়ে করা হয় তিন কোটি ৪৩ লাখ ২৮ হাজার ২৯৬ টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের উদ্বৃত্ত টাকা ভাগাভাগি করতে ঠিকাদার আর নির্বাহী প্রকৌশলী যোগসাজশে কাজের বিল বাড়িয়েছেন।
এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে মলয় কুমার ভৌমিক বলেন, সড়কটির স্থায়িত্বশীলতার কথা বিবেচনা করে ‘এল’ ড্রেন ও প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণের জন্য কাজের দর বাড়ানো হয়েছে। সেখানে দুর্নীতির প্রশ্নই আসে না।
ঠিকাদারদের বক্তব্য: ইউনাইটেড কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড সাপ্লাইয়ার্সের মালিক সাইদুল হক ওরফে টিপু গতকাল শুক্রবার যোগাযোগ করা হলে বলেন, ‘প্রকল্পের সময়সীমা অনেক আগে শেষ হয়েছে, তা আমাদের জানা আছে। কর্তৃপক্ষ এখনো আমাদের কাজ করতে দিচ্ছে। তাই কাজ করছি। টাকা কোথায় রাখল তা আমাদের বিবেচ্য বিষয় না। সেটা কর্তৃপক্ষ দেখবে। আমরা কাজ করে টাকা নিচ্ছি। কাজের মানের ব্যাপারে আপনাদের কে কি বলল তা দেখলে হবে না। সেখানে প্রকৌশলীরা আছেন।’

(এই সংবাদটি দৈনিক প্রথম আলোতে ১৫ মার্চ প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম আলোর সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের অনুমতি সাপেক্ষে প্রতিবেদনটি পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম এর পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো)

Micro Web Technology

আরো দেখুন

নানিয়ারচর সেতু : এক সেতুতেই দুর্গমতা ঘুচছে তিন উপজেলার

কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির ৬০ বছর পর এক নানিয়ারচর সেতুতেই স্বপ্ন বুনছে রাঙামাটি জেলার দুর্গম তিন …

Leave a Reply