নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » ওপারেও সদানন্দ থাকুন শৈলেন দা

ওপারেও সদানন্দ থাকুন শৈলেন দা

Soilen-da-00পার্বত্য চট্টগ্রামের সংবাদ মাধ্যমে আমার নিযুক্তি পাবার দিন থেকেই শৈলেন দা’র লেখার সাথে আমার পরিচয়পর্ব। মুখোমুখি দেখা হয়েছে আরো ক’দিন পর।
‘বাংলার বাণী’ পত্রিকায় আন্তর্জাতিক বিষয়ে নিয়মিত কলাম লেখা, দৈনিক ইত্তেফাক, সংবাদ, বাংলার বাণীসহ সংবাদ সাময়িকীগুলোতে গল্প-ছড়া, প্রবন্ধ লেখায় সম্পৃক্ত থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতিকে কাছ থেকে জানার প্রত্যাশায় পদ খালি না থাকায় ‘দৈনিক গিরিদর্পণ’-এ নিযুক্তি নিই সংশোধনী বিভাগের একজন কনিষ্ঠ কর্মী হিসেবেই। পত্রিকা ছাপার আগে মুদ্রণ সংশোধন করতে গিয়ে প্রতিটি মেইন স্ক্রিপ্ট দেখতে হতো।
দেখতাম, কোন দিন যদি ২০টি রিপোর্ট থাকতো, তার ১৮টিই শৈলেন দা’র হাতে লিখা। সম্পাদক মক্ছুদ ভাই লিখতেন বাকিগুলো।
মক্ছুদ ভাই লিখতেন বড় বড় অক্ষরে। শৈলেন’দা তার বিপরীত। তারপরও আকারের দিক থেকে শৈলেনদা’র স্ক্রিপ্ট থাকতো মক্ছুদ ভাইয়ের চেয়ে অনেক বড়। শৈলেন’দা-কে না দেখার আগে ভাবতাম- কি করে লোকটি এত্তো লিখেন?
প্রথম যে দিন দেখা- তার সৌম্যমূর্তি, বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি, ঋজু দেহ এবং কন্ঠের মাদকতা মুহুর্তেই আমাকে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিল- হ্যা, তিনিই পারেন।
এরপর কত স্মৃতি। কতবার দুঃখ ভাগাভাগি। কতদিনের সখাসখি। এখন শৈলেন’দা বিগত। আমরা যারা তার অনুজ, তারা বেঁচে আছি হয়তো অগ্রজের স্মৃতি কথা লিখার জন্যেই।

এক সময়কার জাতীয় সংবাদপত্রের অর্থনৈতিক অবস্থা, বেতন কাঠামো, বেতন দেয়ার কিস্তি পদ্ধতির যে হাল ছিল, আজকের প্রজন্ম তা বিশ্বাস করবেন না। আঞ্চলিক পত্রিকার অবস্থা তুলে আর কি লাভ?

একা আমি। তারপরও স্বল্প বেতনের একজন সংবাদকর্মী’র যন্ত্রণা নিয়ে চট্টগ্রামের সদরঘাটের অফিস থেকে সুলভ মুল্যে দুপুর-রাতের ভাত খেতাম তিনপুলের মাথায় দেশবাংলা হোটেলে। শৈলেন’দা থাকতেন রাঙামাটিতে। তিনি যে কিভাবে পরিবার চালাতেন, সদা তার মুখের হাসি দেখে অনুভবের কোন জো ছিল না।
তবে এত কষ্টের মধ্যেও পরের দিন প্রকাশিত ‘গিরিদর্পণ’ দেখে তৃপ্তিতে আবারও নতুন দিনের স্বপ্নযাত্রা শুরু হতো আমাদের দু’জনের।Shilen
‘গিরিদর্পণ’ বার্তা সম্পাদক ছিলেন সুখময়’দা (এডভোকেট সুখময় চক্রবর্তী)। সৌম্য চেহারার এই মানুষটি পেশাগত উৎকর্ষতা প্রকাশে আমাদের অপার সুযোগ দিতেন। তার আনুকুল্য পেয়ে বিভিন্ন বিষয়ে কাজ দেখিয়ে সংশোধন কর্মী থেকে ২/৩ মাসের মাথায় আমি রিপোর্টার পদে উন্নীত হই। এরপর কার্পণ্য না করে মক্ছুদভাই আমাকে সহ-সম্পাদক, কলাম লেখক, সহকারী সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক এবং জেনারেল ম্যানেজার পদে কাজ করার সুযোগ দেন। শৈলেনদা’র পদবী পরিবর্তন হয়েছিল কিনা জানি না, বেতন বেড়েছিল কিনা জানি না। শুধু জানি ক্রমশঃ তার মুখের হাসি যেন কৃত্রিম হয়ে আসছিল। অনেক কষ্টে যেন তিনি হাসতে চেষ্টা করতেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংবাদিকতায় মক্ছুদ ভাই, সুখময় দা, সুনীল দা, রানা ভাইসহ অনেকেই আমার পথ প্রদর্শক। আর শৈলেন’দা ছিলেন আমার কাছে তথ্যের ভান্ডার। না চাইতেই সব উজাড় করে দিতেন। আর আমি সেগুলো আত্মস্ত করে লিখে যেতাম অনবরত।
এরপর ‘গিরিদর্পণ’র পাঠ চুকিয়ে আমি বান্দরবান চলে আসি। সম্পাদকের দায়িত্ব নিই সাপ্তাহিক সচিত্র মৈত্রী’র (পত্রিকাটি এখন দৈনিক হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে)। জীবিকা হিসেবে ঢাকার পত্রিকায়ও কাজ করি।
‘গিরিদর্পণ’-এ কাজের পাশাপাশি শ্রদ্ধাভাজন অমিত হাবিব ভাইয়ের সহযোগিতায় শৈলেন’দাকে ভোরের কাগজ-এ সহকর্মী হিসাবে নিয়োজিত করতে পেরেছি। জনকণ্ঠ হয়ে আমি চলে যাই ‘দি ডেইলি স্টার’-এ।
বেতনের অনিয়ম সইতে না পেরে শৈলেন’দা ভোরের কাগজ ছেড়ে দিলেন। এক সময় কি এক অব্যক্ত অভিমানে তিনি ‘গিরিদর্পণ’-ও ছেড়ে দেন। পত্রিকা পরিবর্তিত হলেও একটিবারের জন্যেও ছাড়াছাড়ি হয়নি আমাদের দু’জনায়।
সহকর্মী ফজলে এলাহী ফোন করে জানালেন শৈলেনদা’র পৃথিবী ছেড়ে যাবার কথা।
প্রচন্ড অভিমানে শৈলেন’দা অসময়েই চলে গেলেন। কিন্তু ৩১ বছরের মাখামাখি স্বত্বেও একবারের জন্যেও জানার সুযোগ দিলেন না তার কোন দুঃখ-গাঁথা।
কি হবে তার বেদনার কাহিনী জেনে? তার চেয়ে এ-ই ভালো, শৈলেন’দা আমার কাছে বেঁচে থাকুন সদানন্দ অগ্রজ সাংবাদিক হিসেবেই। এ্যারিখ স্যাগালের ভাষায়- “লাভ মিনস ইউ নেভার হেভিং টু সে- ইউর সরো।”

মনিরুল ইসলাম মনু : স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক কালের কন্ঠ

Micro Web Technology

আরো দেখুন

মহালছড়িতে পানিতে ডুবে ২ শিশুর মৃত্যু

খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার মনাটেক গ্রামে পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার দুপুর আড়াইটায় মনাটেক …

Leave a Reply