নীড় পাতা » পার্বত্য পুরাণ » একটি পাংখোয়া গানের জন্য

একটি পাংখোয়া গানের জন্য

pangkhoaপাংখোয়া লোক সাহিত্যের ভান্ডার অনেক সমৃদ্ধ। তারা খৃষ্ট্রীয় ধর্ম গ্রহণের পূর্বে শিবের পূজারি ছিল। সত্যিকার অর্থে তারা ছিল প্রকৃতি পূজারি। তখন তাদের সমাজে নানান ধরনের শিকারী নৃত্যগীত, প্রেমের পালাগানের আসর বসত। বিশেষত- জুমের ফসল ঘরে তোলার পর তিন চার মাস সময় আনন্দে মেতে উঠে। খৃষ্টীয় ধর্ম গ্রহণের পর তাদের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন নৃত্য ও গানের পরিবর্তে যিশু খৃষ্টের বন্দনা সংগীত প্রচার ও প্রসার লাভ করে।
পাংখোয়াদের ঐতিহ্যবাহী প্রেমের পালাগানের আসর ‘ইন দু ইন দিলা’ আজকাল কেউ আয়োজন করেননা। এক সময় প্রতিটি পাংখো পাড়ায় এ পালাগানের আয়োজন হত। পাড়ার যুবক যুবতীরা এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। কাছাকাছি অন্যান্য পাংখোয়া পাড়া হতেও অনেক পাংখোয়া যুবক যুবতী এ অনুষ্ঠানে এসে যোগ দিত। পালাগানকে উপলক্ষ্য করে শুকর, গরু, গয়াল মেরে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন হত। আবার কখনও কখনও অনুষ্ঠানের দুই একদিন আগে পাংখোয়া শিকারিরা দল বেঁধে দুই তিন ভাগে ভাগ হযে শিকারে বের হত। শিকারিরা শিকারকৃত প্রাণী নিয়ে নেচে গেয়ে পাড়ায় ফিরে আসত। একদিকে শিকার পাওয়ার আনন্দ অন্যদিকে অনুষ্ঠানের আনন্দ- সে এক মহা হুলস্থূল উৎসবে মেতে উঠে শিশু থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত। পালাগানে একদিকে যুবক দল অন্যদিকে যুবতীদল ভাগ হয়ে বসে। খোয়াং (ঢোল), দারখোয়াং (পিতলের ঘন্টা) ও গয়ালের শিঙের বৈচিত্র্যময় বাজনার শব্দ সারারাতব্যাপী পালাগান চলতে থাকে।
পাংখোয়াদের সাথে আমার পরিচয় এবং সখ্যতা গড়ে উঠার পর থেকে মনে অধিক আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকতাম কখন তাদের পালাগানের অনুষ্ঠান দেখতে পাব এবং পালাগানগুলো কিভাবে সংরক্ষণ করতে পারবো। একদিন সত্যি সত্যি সে সুযোগ এসে গেল। আমার পূর্ব পরিচিত রৌকিফ পাংখোয়া নামে একজন থেকে জানতে পারলাম রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি থানার একেবারে শেষ প্রান্তে বড়থলি নামক স্থানে এমন একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন হতে যাচ্ছে। বড়থলি গ্রামে বেশ কিছু পাংখোয়া ও বম পরিবার বসবাস করে। নতুন শতাব্দী অর্থাৎ একুশ শতককে বরণ উপলক্ষ্যে ৩১ ডিসেম্বর ২০০০ ইং তারিখে এ অনুষ্ঠান হবে। বন্ধুবর লালছোয়াক লিয়ানা আগে থেকেই বলে রেখেছে ২০০০ সালের বড়দিন এবং নতুন বছরের দিন আমি যেন অবশ্যই তাদের সাথে থাকি। কারণ এবার নতুন শতাব্দীকে বরণ উপলক্ষ্যে তাদের পাড়ায় বেশকিছু অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে। আমিও ব্যপক প্রস্তুতি নিয়ে তাদের পাড়ায় গেলাম। কিন্তু আমার মাথায় একটি চিন্তাই কেবল ঘুরপাক খাচ্ছিল কীভাবে বড়থলি পাড়ায় যাওয়া যায়। স্থানটি এতই দূর্গম যে, মালুম্যা পাংখোয়া পাড়ার যাকেই বলি সে-ই আমাকে নিরুৎসাহিত করে। লালছোয়াককে বলতেও বিবেকে বাঁধে। কেননা এ পাড়ার অনুষ্ঠানগুলো সুন্দরভাবে সফল করার দায়িত্ব তার উপর। এছাড়াও আমার নিরাপত্তার কথা ভেবে সে এবং তার পরিবারের কেউ যেতে দেবেনা। রাঙ্গা ভাবীকে (লালছোয়াকের স্ত্রী) একটু করে বলেছিলাম। তিনি বললেন, “আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে? এত কষ্ট করে অতদূরে যাওয়ার কি দরকার?” ভাবীর বাড়ি ফারুয়ায়। ওখান থেকেও দূর্গম পাহাড় ও গভীর জঙ্গলের পথে পায়ে হেঁটে বড়থলি যেতে সময় লাগে দুইদিন।
কে আমাকে বড়থলি পাড়ায় নিয়ে যাবে? এ ছাড়া খুব কষ্টদায়ক হবে এ ভ্রমণ। তারপর নানা রকমের ভয় ও সময় স্বল্পতা ইত্যাদি বিষয় চিন্তা করে যাওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিলাম। তবে বিকল্প একটি বুদ্ধি মাথায় এলো। কেননা পালা গানটি অবশ্যই সংগ্রহ করতে হবে। রৌকিপ দা’র সাথে ভালভাবে ভাব জমালাম। তিনি যেহেতু আমাকে প্রথম খবরটি দিয়েছে এবং একসময় বড়থলি গ্রামে বসবাস করতেন সেহেতু তিনিই পারবেন আমাকে এ কাজে সাহায্য করতে। তার অনেক আত্মীয়-স্বজন বড়থলি পাড়ায় বসবাস করে। এসব কারনে বড়থলির সাথে তার নিয়মিত যোগাযোগ এবং নিবীড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই মাঝেমধ্যে তাকে বড়থলি গ্রামে যেতে হয়। আমার বিনীত অনুরোধে শেষ পর্যন্ত রৌকিপ দা বড়থলি গ্রামে যেতে রাজি হল। যাতায়াতের জন্য কিছু রাহা খরচ ও ক্যাসেট প্লেয়ারটি তার হাতে তুলে দিলাম। তিনি পাঁচদিন পর ফিরে এসে আমার হাতে ক্যাসেট প্লেয়ারটি তুলে দিয়ে অনুষ্ঠানটির আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলেন। ক্যাসেটে ধারণকৃত পালাগানটি লালছোয়াক সহ আরো অনেককে নিয়ে ছয়-সাতবার শুনলাম। গানের সামান্য কিছু কথা ছাড়া অধিকাংশই আমরা বুঝিনি। বয়োজেষ্ঠ পাংখোয়া ছাড়া বর্তমান প্রজম্মের কেউই ভালোভাবে বুঝতে পারেনি। গানের কথাগুলো একেবারে আদি পাংখোয়া ভাষা এবং এ গানে কিছু কিছু বম ও লুসাই ভাষার মিশ্রণ রয়েছে।
নানান ব্যস্ততা ও গানের কথাগুলো ভালেভাবে বুঝতে পারে এমন পাংখোয়া লোকের সাথে সমন্বয়ের অভাবে প্রায় দুই বছর কেটে গেল। আমার চিন্তা ছিল প্রথমত-গানটির সম্পূর্ণ কথা লিপিবদ্ধ করা, দ্বিতীয়ত হচ্ছে- গানের কথাগুলো বাংলায় ভাবার্থ করা। না, এভাবে বসে থাকলে এ কাজ জীবনেও শেষ করা যাবেনা। মনের মধ্যে প্রচন্ড তাগাদা অনুভব করলাম। ছুটলাম বসন্ত ও নিউ থ্লাংপুই পাংখোয়া পাড়ায়। খবর পাঠিয়ে কন্ডাছড়া থেকে আনালাম কিপলাল পাংখোয়া ও লাল মূর পাংখোয়াকে। এরা পাংখোয়া শিল্পী। পুরনো অনেক গান জানেন, বুঝেন। তাদের সহযোগিতা নিলাম। এভাবে আরো অনেকের সহযোগিতায় বেশ কিছুদুর অগ্রসর হয়েছি। কিন্তু আমি সন্তুষ্ট হতে পারছিনা। মাঝে মধ্যে হতাশ হয়ে পড়ি। লাল ছোয়াকের সাথে পরিচয়ের কিছুদিন পরেই তিনি পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বসন্ত পাংখোয়া পাড়ার সাংথেয়া পাংখোয়ার সাথে। তিনি পাংখোয়াদের সর্ম্পকে অনেক কিছু জানেন। তার পেশাগত বিভিন্ন কাজের সহযোগিতার সূত্রে তার সাথে সু সম্পর্ক গড়ে উঠে। অবশেষে তার স্মরণাপন্ন হলাম। তিনি আমাকে অনুবাদে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিলেন এবং বিভিন্ন পাড়ায় ঘুরে অনেকের সহযোগিতা নিয়ে এ কঠিন কাজটি তিনি সম্পন্ন করে দিয়েছেন। আমি তার কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।

দীর্ঘ সাত বছর লাল ছোয়াক লিয়েনা সহ রাঙ্গামাটি জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল সমূহে ঘুরে বেড়িয়েছি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাংখোয়াদের স্বচক্ষে দেখা ও সংস্কৃতির উপাদান সংগ্রহের জন্য। একটানা হেঁটে গেছি মাইলের পর মাইল ছড়া, দূর্গম পাহাড় ও গভীর অরণ্য পেরিয়ে নতুন নতুন পাংখোয়া পাড়ায়। তাদের থেকে সংগ্রহ করেছি প্রবাদ-প্রবচন, ধাঁ ধাঁ, শিকারের গান, বিভিন্ন মন্ত্র, বিভিন্ন ধরনের শব্দ সহ ভাষার আরো রতœ খচিত উপকরণ সমূহ। যেখানে গিয়েছি সেখানেই পেয়েছি তাদের অফুরন্ত ভালবাসা ও নিরলস সহযোগিতা।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি আদিম জনগোষ্ঠির মধ্যে শিকারে শীর্ষ স্থানে রয়েছে পাংখোয়ারা। তারা শিকারের ফাঁদগুলো পেঁতে রাখে গভীর জঙ্গলে। ফাঁদগুলো দেখার জন্য ছুটে গেছি রাইনক্ষিয়াং, সাজেকের গহীন অরণ্যে। কত রাত কাটিয়েছি জুম ঘরে। ফাঁদের ধরা পড়া প্রাণীর পোড়া মাংশ খেয়ে নিবারণ করেছি পেটের জ্বালাময়ী ক্ষুধা। এসকলই এখন কেবল স্মৃতি। দিনে দিনে কমে যাচ্ছে বন জঙ্গল। হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন পশুপাখি। আজম্ম মাংসভূজী পাংখোয়াদের ভাগ্যেও সহজে জোটে না শিকারের মাংস।

লিয়ানার স্ত্রী রাঙ্গাবী তঞ্চঙ্গ্যা বেশ নম্র ও সুশিক্ষিত মহিলা। বিলাইছড়ি থানার ফারুয়া ইউনিয়নে তার বাবার বাড়ি। বি-এ পাশ করে শিক্ষকতা করতে আসেন পাংখোয়া পাড়া জুনিয়র হাই স্কুলে। লিয়ানা তখন ঐ স্কুলের প্রধান শিক্ষক। একই পেশায় একই কর্মস্থলে থাকতে থাকতে একই সূত্রে গেঁথে গেল তাদের মনও। ভাল লাগা থেকে ভালবাসা, অতঃপর পরিণয়। প্রথম দিকে দুই পরিবারের কেউই মেনে নিতে পারেনি। পরে ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যায়। রাঙ্গাবী এবং লিয়ানা দ্জুনেই আমাকে তাদের সুখ দুঃখের অনেক কিছুর অংশীদার করে। কবিতার সুরে আমিও তাদের সাথে মাঝে মধ্যে একাকার হয়ে যেতাম –
রাঙ্গা বনের রাঙ্গাবি, রাঙ্গা তার মন-
তীরন্দাজ লিয়ানা করেছে তা হরণ।
রাঙ্গাবি জুমে গেলে লিযেনা তার পিছু ছুটে
জুম ঘরে অভিসারে স্বপ্নের বীজ বুনে।

বিলাইছড়ি মালুম্যা পাংখোয়া পাড়ার জুনিয়র হাই স্কুলে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করতেন রাঙ্গাবি। পাংখোয়া সহ আশে পাশের চাকমা, মার্মা, তঞ্চঙ্গা ছেলে মেয়েরা এ স্কুলে আসে। তাদের জন্য তার চিন্তার অন্ত নেই। আদর্শ স্বামীর আদর্শ স্ত্রী হিসেবে তার অনেক দায়িত্ব। শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া এ পাংখোয়া জাতিকে কীভাবে শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে নেওয়া যায়- তার সাথে পাংখোয়াদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দিনকে দিন সময় আলাপ করেছি। জেনেছি তার কাছ থেকে অনেক কিছূ- বিশেষত পাংখোয়া ভাষার উচ্চারণের সুক্ষ দিকগুলো। দীর্ঘ বছর তাকে সময়ে অসময়ে অনেক জ্বালাতন করেছি। কখনও বিন্দুমাত্র বিরক্ত বোধ করেননি। আমাকে নিজের ভাইয়ের মতই দেখভাল করতেন। উদভ্রান্তের মত আমার চলাফেরা। যখন যা পাই তখন তা খেয়ে সন্তষ্ট থাকার প্রবণতা দেখে রাঙ্গা বৌদি বলতেন, “আমি অনেক বাঙ্গালী দেখেছি, তবে আপনার মত এমন অদ্ভূদ মানুষ আর দেখিনি। হয়ত আর দেখাও পাব না। আপনি যা পারেন তা অনেক পাংখোয়ারাও পারেনা।” আমি বৌদি’র সাথে দুষ্টুমি করে বলতাম যে আমার পূর্ব পুরুষ গহীন অরণ্যের এক গুহায় বাস করত। ক্ষিদে পেলে পাথরের হাতিয়ার দিয়ে বন্য পশু শিকার করে তার পোড়া মাংস খেত। আমি আমার পূর্ব পুরুষের সেই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস পুনরুদ্ধার করতে এসেছি।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জেসমিন সুরভী’র কবিতাগুচ্ছ

গন্তব্যের পথিক হাস্যরসাত্মক এই পৃথিবীর বুকে, পথিক চিন্তায় মগ্ন থাকে প্রতিটি ক্ষণে! কখনো ঘুরে দাঁড়ানোর …

Leave a Reply