নীড় পাতা » আলোকিত পাহাড় » একটি অসাধারণ উদ্যোগ !

একটি অসাধারণ উদ্যোগ !

schooldressকোন আগাম পরিকল্পনা ছিলোনা। একদিন রাঙামাটি প্রতিবন্ধী স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে দেখলেন সেখানে অধ্যয়নরত প্রতিবন্ধী শিশুগুলো জীর্নশীর্ণ পোষাক পড়ে স্কুলে এসেছে,দেখেই খারাপ লাগলো খুব,তাই সেখানেই ঘোষণা দিয়ে এলেন স্কুলের সবগুলো শিশুকে পোষাক তৈরি করে দেয়ার,ঘোষণা বাস্তবে রূপ নিতে সময় লাগেনি। অল্প কদিনেই প্রতিবন্ধী স্কুলের সকল শিশুরা পেলো স্কুলড্রেস। স্কুল ড্রেস পড়া শিশুদের দেখে মন ভরে গেলো তার। একটি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভালোলাগা এসে ভর করলো মনে প্রাণে। অসাধারন এই কাজটি করেই পরম তৃপ্তি পেলেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোঃ মোস্তফা কামাল।

এর কিছুদিন পরেই রাজস্থলীর দুর্গম শফিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে গেলেন জেলা প্রশাসক হিসেবে। সেখানকার দরিদ্র শিশু শিক্ষার্থীদের ড্রেসহীন ময়লা ছেঁড়া পোষাক দেখে মন কেঁদে উঠলো। ভাবলেন কিছু একটা করা দরকার। সেই স্কুলের ১৯৭ জন শিশুকেই বানিয়ে দিলেন স্কুল ইউনিফর্ম,পাশের ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২০৮ জন শিশুকে বানিয়ে দিলেন ড্রেস। এক এক করে প্রত্যেক শিশুর শরীরের মাপ নিয়ে তৈরি করা হলো সঠিক মাপের পোশাক। শুরু হলো তার নতুন এক যুদ্ধ। প্রাথমিকভাবে জেলার প্রতিটি উপজেলার ২ টি করে পিছিয়ে পড়া স্কুল বাছাই করলেন,কোথাও কোথাও তিনটিও। প্রথম পর্যায়ে জেলার ২৫ টি স্কুলের আড়াইহাজার শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বানিয়ে দেয়ার কাজ শুরু করলেন। পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার,চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহসহ রাঙামাটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও জনপ্রতিনিধিরাও জেলা প্রশাসকের অতিথি হয়ে এই মহতী উদ্যোগে গিয়েছেন কোন না কোন স্কুলে ইউনিফর্ম বিতরণ অনুষ্ঠানে। স্কুল ড্রেস পেয়ে তুমুল উচ্ছাস আর হাসিমুখ শিক্ষার্থীদের দেখে মুগ্ধ অতিথিরাও জেলা প্রশাসক মোস্তফা কামালের এই ব্যতিক্রমী প্রয়াসকে অভিনন্দিত করেছেন।

রাঙামাটির বালুখালির সাপমারা পাহাড় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ড্রেস বিতরণ করে যাওয়ার পর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন,-‘বিনামূল্যে স্কুলড্রেস প্রাপ্তির পর কোমলমতি শিশুদের মধ্যে কী যে আনন্দ আমি দেখেছি তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয় ।’ স্কুল ডেস বিতরণ ও ফ্রি ওয়াইফাই জোন চালুর জন্য রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মোঃ মোস্তফা কামালকে ধন্যবাদ জানিয়ে একই স্ট্যাটাসে বিভাগীয় কমিশনার লিখেন,-‘এই পদক্ষেপ সকল জেলা প্রশাসক কর্তৃক গ্রহণ করা হলে বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা যায়।’

‘বিনামূল্যে স্কুলড্রেস প্রাপ্তির পর কোমলমতি শিশুদের মধ্যে কী যে আনন্দ আমি দেখেছি তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয় ।’…..বিভাগীয় কমিশনার,চট্টগ্রাম

এই প্রসঙ্গে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোঃ মোস্তফা কামাল জানালেন,আগাম কিছু ভেবে কাজটা শুরু করিনি। হঠাৎই শুরু করা। শুরু করতে গিয়েই দেখলাম এর অন্তর্নিহিত গুরুত্ব,ছোট্ট একটি কাজ কিভাবে বিশাল একটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে তা দেখলাম আমি এই কাজটি করে। ২৫ টি স্কুল দিয়ে শুরু করলাম,ধারাবাহিকভাবে আমি এই কাজ চালিয়ে যাবো। দরিদ্র কোমলমতি স্কুল শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে স্কুলড্রেস পেয়ে কী যে খুশি হয় তা কল্পনাতীত। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত অর্থ এবং সরকারি বরাদ্দকে কাজে লাগিয়েই আমি এ কাজটি করছি।
সর্বশেষ জেলা প্রশাসক সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল শিক্ষার্থীদের ফ্রি স্কুল ড্রেস প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছেন জানিয়ে জেলা প্রশাসক মোঃ মোস্তফা কামাল আরো বলেন,সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবৈতনিক শিক্ষা চালু করেছে,বিনামূল্যে বই দিচ্ছে,যদি বিনামূল্যে স্কুল ড্রেসও দেয় তাহলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝড়ে পড়ার হার কমবে, দেশে শিক্ষার হার বাড়বে । তিনি তার এই উদ্যোগটি সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার স্বপ্নের কথাও জানালেন।

সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবৈতনিক শিক্ষা চালু করেছে,বিনামূল্যে বই দিচ্ছে,যদি বিনামূল্যে স্কুল ড্রেসও দেয় তাহলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝড়ে পড়ার হার কমবে, দেশে শিক্ষার হার বাড়বে………জেলা প্রশাসক,রাঙামাটি

কেবল স্কুলড্রেসই নয়, জেলা প্রশাসক মোঃ মোস্তফা কামাল ইতোমধ্যে রাঙামাটির দুইটি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষার্থীদের ফ্রি স্কুল ড্রেসের পাশাপাশি স্কুল ব্যাগও দিয়েছেন। সম্প্রতি শহরতলির ঝগড়াবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বিলাইছড়ি পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে স্কুলব্যাগ বিতরণ করা হয়। আবার সাপমারা পাহাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলড্রেসের পাশাপাশি দিয়েছেন একটি করে ছাতাও। এই প্রসঙ্গে তিনি জানালেন,প্রতিটি স্কুলের জন্য আমরা একটি বাজেট করি,দেখা যায় স্কুলড্রেস বানিয়ে দেয়ার পরও কিছু টাকা থেকে যায়,এই টাকা দিয়েই আমরা ব্যাগ বা ছাতা দিচ্ছি। bag

জেলা প্রশাসক মোঃ মোস্তফা কামালের এই উদ্যোগ ইতোমধ্যেই সাড়া ফেলেছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে। জেলার অনেক বিশিষ্টজনও এখন এগিয়ে আসছেন এই কাজে সহযোগিতা করতে। তবে জেলা প্রশাসক আপাতত কারো সহায়তা নিতে রাজি নন। তিনি বলেন,আগে আমরা যতটা পারি করে যাবো,এরপর প্রয়োজন হলে সবার সহযোগিতাও নেবো।

প্রতিবছর জেলা পর্যায়ে কোটি কোটি টাকা উন্নয়ন বরাদ্দ করে সরকার। এই বরাদ্দ কখনো কাজে আসে,কখনো আসেনা। উন্নয়নের জোয়ার কখনো খুব বেশি দৃশ্যমান আবার কখনো চোখেই পড়েনা। এনিয়ে নানা রাজনৈতিক তর্ক হয়,আলোচনা হয়,ঝড় উঠে চায়ের কাপেও। কিন্তু এই উন্নয়ন বরাদ্দের সামান্য কিছু টাকা ব্যবহার করেও কী অসাধারন কাজ করা যেতে পারে তারই নজির স্থাপন করেছেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোঃ মোস্তফা কামাল। এখন এই উদ্যোগ স্পর্শ করুক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও,ছড়িয়ে পড়ুক সারাদেশেই,এ প্রত্যাশা সবার।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কাপ্তাই হ্রদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সচিবের অনুপস্থিতে ক্ষেপেছেন ডিসি !

রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে অবস্থিত কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক ও কাপ্তাই হ্রদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব এটিএম …

Leave a Reply

%d bloggers like this: