নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » একজন সাংবাদিকের দূর্ঘটনা এবং কিছু অভিজ্ঞতা

একজন সাংবাদিকের দূর্ঘটনা এবং কিছু অভিজ্ঞতা

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথিতযশা সাংবাদিক ও দৈনিক প্রথম আলোর রাঙ্গামাটি জেলা প্রতিনিধি হরি কিশোর চাকমার দূর্ঘটনার এক সপ্তাহ পূর্ণ হতে চলেছে আজ। পুরো সপ্তাহ জুড়ে উৎকন্ঠা, সংশয়, অগণিত মানুষের প্রাণপণ সহয়োগিতার ছুঠোছুটি, ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে চিকিৎসার অর্থ সংগ্রহের প্রচেষ্টা, কিছু যুব’র নির্ঘুম সেবা আর শশ্রুষা, কর্তব্যরত চিকিৎসকদের বাড়তি যত্ন এসব মিলিয়ে দাদা এখনও বেঁচে আছে সবার ভালবাসা নিয়ে। এরই মধ্যে আইসিইউতে ও তাঁকে রাখতে হয়েছে কয়েকবার। গতো পরশু ববশেমুমে হাসপাতালে দেখতে গিয়েও আইসিইউতে থাকার কারণে দেখা হয়নি। হরিদার সাথে থাকা দীপেন ও তার সাথীদের সাথে কথা বলে জানা গেলো, তাঁর মাথার অপারেশনে নাকি তেমন অসুবিধা নেই তবে, বুকের পাঁজরের ছয়টি হাঁড় ভেঙ্গে যাওয়া এবং তারঁ কারণে ফুসফুসে প্রদাহের কারণে আইসিইউতে নিতে হয়েছে। দীপেন আরও জানালো যে কেবিনে রাখার ফি বাবত ১০০০০০ (এক লক্ষ) টাকা প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে দিয়ে ফেলেছে এবং সেখানে ৪০ দিন পযর্ন্ত রাখা যাবে। প্রথম আলো প্রতিনিধি হওয়ার সুবাদে ডাক্তারদেরও যত্ননিয়ে সেবা দিয়ে যাওয়ার কথা জানা গেলো। তাছাড়া প্রতিদিন নাকি প্রথম আলোর অফিস থেকে লোক এসে দাদার স্বাস্থ্যর অবস্থার খবরাখবর নিয়ে যায়। হরিদাকে বাঁচিয়ে রাখার এসব ইতিবাচক প্রচেষ্টা সত্যিই একটা স্বস্থির নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।

গত ২৭ তারিখে হরি দাকে আহত অবস্থায় যখন রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয় তখন হাসপাতালে গিয়ে তাঁর সাংবাদিক সহকর্মীদের আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং তাৎক্ষনিক সাড়া আমাকে আবিভুত করেছে। বাঙালী-অবাঙালী সংবাদ কর্মীদের স্ব-শরীরে হাসপাতালে এসে দাদাকে দেখতে যাওয়া এবং সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাওয়ার মধ্যে সাংবাদিক সম্প্রদায়ের অটুট ঐক্য ও দায়িত্বশীলতাকে তুলে এনেছে আমাদের সামনে। রাঙ্গামাটি প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দ এবং বয়োঃজৈষ্ঠ্য সুনীল দাদাকে ছুটে আসতে দেখলাম হাসপাতালে। সেই সাথে সাংবাদিকদের অন্য সংগঠনের নেতা কর্মীদেরও উপস্থিতি ছিল উৎসাহসম। রাঙ্গামাটির সাংবাদিকদের এমন ঐক্য চিরকাল বিরাজ করুক এটাই আমার প্রত্যাশা।

হরিদার চিকিৎসার জন্য রাঙ্গামাটিতে এনজিও কর্মীদের একটি অংশ অর্থসংগ্রহের জন্য সভা করেছে, নিজেরা টাকা দিয়েছে এবং অন্যকে সহযোগিতার হাতবাড়ানোর জন্য উৎসাহিত করছে বলে জানা গেছে। অন্য দিকে আমাদের অনেকের প্রিয়জন ও পরিচিত প্রসেনজিৎ চাকমা কাবিল দাদাও নাকি জরুরী প্রয়োজন মিটানোর জন্য তাঁর তরফ থেকে ১০০০০০ টাকা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। খাগড়াছড়ির সাংবাদিক প্রদীপ চৌধুরীও আমাকে ফোনে জানিয়েছিল যে অন্য কোন একজন হরিদার চিকিৎসার্থ ১০০০০ টাকা দিতে আগ্রহী। আমি তখন হরিদার সাথে থাকা দীপেন চাকমার বিকাশ নাম্বার দিয়ে ছিলাম। এছাড়া, আমেরিকা প্রবাসী সুনীতি বিকাশ চাকমাকেও দেখেছি হরিদার জন্য মারকিন মুলুকে বন্ধুদের কাছে সহায়তা চেয়ে ফেসবুকে পোষ্ট দিতে। এভাবে অসংখ্য মানুষ হরিদার সুস্থ্য হয়ে ফিরে আসার কামনায় সাধ্য মতো পাশে থাকছে, কাজ করে যাচ্ছে, প্রার্থনা করে যাচ্ছে এবং অন্যদের এগিয়ে আসার আকুতি জানিয়ে যাচ্ছে যার বদৌলতে হরি দার স্বাস্থ্য এখন উন্নতির দিকে।

তবে এতো কিছু শুভচেষ্টার মধ্যেও কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা আমাদের মনো পীড়ার কারন হয়েছে। যা সংশোধণে সবার সমবেত প্রচেষ্টার দাবি রাখে।যেমন-

১। ব্যক্তি হিসেবে হরি কিশোর চাকমা একজন অমায়িক, মিতভাষী এবং পরোপকারী মানুষ। ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া নিশান চাকমার চিকিৎসার্থ তহবিল সংগ্রহকারীদের অন্যতম সংগঠক। উনি প্রথম আলো পত্রিকার মতো একটি বহুল প্রচারিত পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি। তাঁর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ (সিভিল সার্জন মহোদয়ের উপস্থিতিতেই) চমেক হাসপাতালে রেফার করলে তাৎক্ষনিক প্রয়োজনে রাঙ্গামাটিতে একটাও এমবুলেন্স না পাওয়ার ঘটনাটা গোটা রাঙ্গামাটি জেলা বাসীর দুর্ভাগ্যর চিত্রটা ফুটে তুলেছে। অবশেষে একটা সাধারণ মাইক্রোবাসে করে তাকে চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়ার সেই চিত্র মনে হয় কখনও ভুলবার নয়। একজন অগ্রণী আদিবাসী সাংবাদিকের দুঃসময়ে এমবুলেন্স না জোটার ভাগ্য যাতে আগামীতে কারওর না হয় সে খেয়াল রাঙ্গামাটির কর্তৃপক্ষগুলো রাখবে কিনা এখনও নিশ্চিত হতে পারছিনা।

২। চট্টগ্রাম থেকে এয়ার এম্বুলেন্সে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার আগ মুহুর্তে নাকি মাথায় অপারেশনের সময় রক্তদাতার প্রয়োজন হবে ভেবে ও পজিটিভ গ্রুপের রক্তদাতা সংগ্রহ করা হয়েছিল ঢাকায়। আগে থেকে বলার কারণে অনেক সম্ভাব্য রক্তদাতা রাজি হয়েছিল হরি দাকে রক্ত দিতে যারা কিনা কোন এক ছাত্র সংগঠনের নেতা কর্মী ছিল। অবাক করার মতো বিষয়টা হলো যে, প্রয়োজনের সময় রক্তদানে সম্মত ঐসব সম্ভাব্য রক্তদাতাদের কাউকে হাসপাতালে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে জুবদার (জুন্ম ভলুন্টারী ব্লাড ডোনার এসোসিয়েশন) রক্ত দাতারাই এই প্রয়োজন মিটায় বলে জানা গেছে।

৩। রাঙ্গামাটিতে ফিরে এসে গতোকাল ঘটনা প্রসঙ্গে পৃথক দুটি আলোচনায় উঠে আসে দুটি অমূলক প্রচার। বলা হচ্ছে ক) হরি কিশোর চাকমার মোটর সাইকেলকে অমুক গাড়ি মেরে দিয়েছে খ)হরি কিশোর চাকমার মোটর সাইকেলকে তার তমুক আত্নীয় মেরে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। এগুলো শুণে তো আমি একদম হতবাক!বলে কি এরা! একজন রোগীর স্বাস্থ্যর অগ্রগতি এবং চিকিৎসার খরচের বন্দোবস্ত কিভাবে হচ্ছে তা আলোচনা না হয়ে কিছু মানুষ দূর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে মহাব্যস্ত যা রীতিমত পুলিশি কায়দার মধ্যে পড়ে। শুধু কী তাই! ফেসবুকে দেখেছি হরি দার শংকাজনক শারীরিক অবস্থায় যখন তাঁর অগণিত শুভকাংক্ষী সুস্থতা কামনায় ও অন্যদের জানাতে ফেসবুকে পোষ্ট দিয়ে যাচ্ছিলো সেই সময় কেউ কেউ প্রশ্ন করে বসে ‘মে আই নো হাউ দ্য এক্সিডেন্ট টুক প্লেস?’ এমন মন্তব্য দিয়ে। সত্যিই সেলুকাশ! তখন মনে হয়েছে আমাদের মানবিক বোধ কতোটুকু নীচে নেমে যাচ্ছে কতিপয় মানুষের কারণে।

যাই হোক আলো তো আলোই। অন্ধকার অন্ধকারই। অন্ধকার দিয়ে আলো তাড়ানোর প্রচেষ্টা আমরা করিনা কেননা এতো বোকা আমরা নই। আমরা সকলেই আলো দিয়ে অন্ধকার তাড়ানোর পক্ষে। আমাদের সকলের প্রচেষ্টায় হরিদার জীবনের দুঃসময় নামক এই অন্ধকার কেটে যাক সেই আরাধনায় হোক আমাদের সাথী। এভাবে জয়হোক মানবতার, সাহসী গান উচ্চারিত হোক মনুষত্বের। আমরা সবাই মানুষ হয়ে থাকি অন্তত একজন ভাল মানুষের জন্যই। হরি দা সুস্থ হয়ে ফিরে আসুক আগের জায়গায়; আগের মতো করে। হরিদাকে সুস্থ দেখতে চায়লে, হরিদার জন্য প্রার্থনা করুন। নিজে সাধ্য মতো অর্থ সহায়তা দিন, আপনার পাশের মানবতাবাদী মানুষকে উৎসাহিত করুন সাধ্য মতো অর্থ সহায়তা দিতে এই বিকাশ নাম্বারেঃ দীপেন চাকমা ০১৫১৫২২৩৩৬৮ (পারসোনাল)। দীপেন শুরু থেকেই এখনও আছে হরিদার সাথে সাথে।

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক

Micro Web Technology

আরো দেখুন

নানিয়ারচর সেতু : এক সেতুতেই দুর্গমতা ঘুচছে তিন উপজেলার

কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির ৬০ বছর পর এক নানিয়ারচর সেতুতেই স্বপ্ন বুনছে রাঙামাটি জেলার দুর্গম তিন …

Leave a Reply