নীড় পাতা » বিশেষ আয়োজন » একজন সংসপ্তক প্রভাংশু ত্রিপুরা

একজন সংসপ্তক প্রভাংশু ত্রিপুরা

Prabhangshu-tripuraযেদিন “নেইল আর্মড-স্ট্রং” সর্বপ্রথম চাঁদের মাটিতে পা রেখেছিলেন সেদিন হয়তো বা পৃথিবীর তাবৎ মানবকুলের কেউ জানতেন না যে ঘটনাটি ঘটেছে, জানতেন শুধু মাত্র “নাসার” গবেষকরা, জানতেন সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা। অজানাকে জানার যে আগ্রহ বা চেষ্টা সেটিই গবেষণা। আজকের যে ডিজিটাল বিশ্ব বা আধুনিক পৃথিবী তা একদিনে আসেনি। যুগ কিংবা যুগান্তর ভেদে তা মানুষের গবেষণার ই ফসল। অজানাকে জানার যে আগ্রহ এটি একটি মানবীয় গুণ। কিন্তু ক’জন মানুষ এই কাজটি করে থাকে। যারা করেন তারা ক্ষণজন্মা, এরা সৃষ্টিকর্তার বিশেষ আর্শীবাদপুষ্ট “বিশেষ মানুষ”। এই বিশেষ মানুষগুলোর আকার আকৃতি কিংবা শারীরিক গঠন অন্য সব মানুষের মত হলেও, বিবেক বুদ্ধি আর চিন্তার দিক থেকে তারা বিশেষ শ্রেনীর মানুষ। এদের ভাবনার জগৎ এতই বিস্তৃত যে- সাধারণ মানুষের ভাবনার পরিধি আর এই বিশেষ দর্শন সম্পন্ন মানুষগুলোর ভাবনার পরিধি বাস্তবে যোজন যোজন দূরে অবস্থিত। একটি বিশেষ ক্ষণ বা সময় অবধি কখনও বা শতাব্দির পর শতাব্দি কোন জনপদকে অপেক্ষা করতে হয় এই বিশেষ মানুষটির জন্য। এই বিশেষ মানুষটি নিজের মেধা, শ্রম, মনণ, ভাবনা আর গবেষণার মধ্য দিয়ে কখনও সমাজ কিংবা মানুষের জন্যে বয়ে আনেন নতুন কিছু, রেখে যান সুখকর কিছু অবদান, হয়ে উঠেন বিশেষ মানুষ, পরিনত হন “অতিমানবে”। আসলে যে বিশেষ মানুষটির কথা এখানে আমি বলতে চাচ্ছি তিনি আমাদের “প্রভাংশু ত্রিপুরা”।
এই মূহুর্তে এই পার্বত্য জনপদে “প্রভাংশু ত্রিপুরা একটি বিশেষ গবেষকের  নাম। যার  হাত ধরে পার্বত্য জনগোষ্ঠি অর্জন করেছে দূর্লভ সম্মান ও স্বীকৃতি “বাংলা একাডেমী পুরস্কার-২০১৩”। আমি মনে করি, এই অর্জন শুধু পাহাড়ে বসবাসরত শুধুমাত্র একটি জনগোষ্ঠীর নয়। এই অর্জন আর গৌরব পুরো পার্বত্য জনপদের। এ অর্জন একদিনে আসেনি, আর আসেও না। কতো কষ্ট, শ্রম, ত্যাগ, মেধা, আর ভাবনা রয়েছে এর পেছনে, কতো রাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন “প্রভাংশু বাবু”, জীবনের কতো সময় নদীর ¯্রােতের মতো বয়ে গেছে তার গবেষণার কাজে তার হিসেব হয়ত আমরা জানি না। তবে এইটুকু বুঝতে পারছি যে, কোন প্রচেষ্টা বা সাধনা কখনোই বৃথা যায় না। “প্রভাংশু ত্রিপুরার” জীবন থেকে অন্তত এ শিক্ষাটি আমরা গ্রহণ করতে পারি। আমার বিবেচনায় “প্রভাংশু ত্রিপুরা” একজন “সংসপ্তক সাহিত্য গবেষক”। অপরুপ সৌন্দর্য্য মন্ডিত পাহাড়, গীরি আর উপত্যকায় ছড়িয়ে থাকা সুপ্ত ও অনাবিস্কৃত-নৃ-তাত্ত্বিক আদিবাসী জুমিয়া-সভ্যতা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে তিনি জীবনভর যেমন করে লালন করেছেন গবেষণার চোখ দিয়ে দেখেছেন সাহিত্য মনের দর্শন আর ভাবনার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন, সুপ্ত ও বিলুপ্ত প্রায় লোক-গাঁথা ও রুপকথা গুলোকে তুলে এনে সাহিত্যের মধ্য দিয়ে মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন, বর্তমান প্রজন্মের কাছে “ত্রিপুরা রাজন্য বর্গের” ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্ট করেছেন, তাতে আমি বিস্মিত। তিনি চেঙ্গী ও  মাইনী বিধৌত ভূমিসন্তান আর প্রকৃতির কথা এত সুন্দর ও সাবলীল ভাষায় তুলে এনেছেন, যা আমাকে মুগ্ধ করেছে। একজন আদিবাসী হয়েও বাংলা ভাষা ব্যবহারে তার এমন দক্ষতা দেখে আমি সত্যিই তার প্রতি অনেক আগেই অনুরক্ত ছিলাম। আর এই কারণেই তার বাংলা একাডেমী কর্তৃক পুরস্কারে ভূষিত হবার সংবাদটি আমাকে মোটেও বিস্মিত করেনি।
যাক সে কথা, এটি আমার ভাবনার বিষয় নয়, কারণ এটি তার প্রাপ্য ছিল। আমি এখানে যে কথাটি বলতে চাচ্ছি-তা হলো, একজন “সংসপ্তক প্রভাংশুর’ কথা। আমি প্রথমতঃ তার ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম  সেদিন, যেদিন প্রথম তার রচিত “কলাবতী কন্যা” ত্রিপুরা রুপকথার গল্পটি পড়ার সুভাগ্য হয়েছিলো। তখনও “প্রভাংশু ত্রিপুরার” সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় হয়ে উঠেনি। আমি একজন থিয়েটারকর্মী, নাটক তৈরী করা আমার কাজ, নতুন কোন থিয়েটার কিংবা লোক কাহিনীকে নাট্যরুপ দিয়ে মানুষের সামনে তুলে ধরাই আমার কাজ। একবার মনস্থির করলাম গতানুগতিকতার বাইরে এসে কোন আদিবাসী রুপকথার গল্পকে নাট্যরুপ দিয়ে মঞ্চে তুলে আনবো। এতে করে বিকশিত হবে চেঙ্গী-মাইনী বিধৌত পার্বত্য কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। অনেক খোঁজাখুজি করে প্রভাংশ ত্রিপুরা বিরচিত “ত্রিপুরা জাতির ইতিহাস’ গন্থে “কলাবতী কন্যা” রুপকথার গল্পটি আমার দৃষ্ঠি আকর্ষন করে। আমি এটিকে নিয়েই কাজ শুরু করি। এর মাস ছয় পরে “প্রভাংশু ত্রিপুরার” সঙ্গে আমার দেখা হয়- খাগড়াছড়ি জেলা সাহিত্য পরিষদের এক সাধারণ অধিবেশনে। এখানেই তার সঙ্গে আমার পরিচয়। প্রথম দর্শনেই তাকে আমার একজন সহজ সরল ও নিরহংকার মানুষ বলে মনে হয়েছে। কিন্তু তার জীবন চরিত, কিংবা জীবন যাপন যে কতটা সাদামাটা ও সাধারণ এর প্রকৃত পরিচয় আমি পেলাম দ্বিতীয় বার যথন তার সঙ্গে দেখা হয়-খাগড়াপুরে, তার বাড়ীর ধারে। পড়ন্ত বিকেল, “প্রভাংশু ত্রিপুরার” বাড়ীর পাশেই খাগড়াছড়ি জেলার কার্বারীদের একটি কার্যালয় রয়েছে। ছায়া ঘেরা প্রকৃতির নীবিড় উপত্যকায়-“ইয়ামুক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের” একটি মহড়া স্থল রয়েছে। সেখানে খাগড়াছড়ি থিয়েটারের একটি নাটকের মহড়া শেষ করে আমি বাড়ী ফিরছিলাম। আঁকাবাকা মেঠো পথ, পথের ধারে উপত্যকা ঘিরে ধান ফসলের আবাদি জমি। ফসলি জমির পরিচর্যা শেষে ক্লান্ত-অবসন্ন দেহে বাড়ী ফিরছেন একজন কৃষক, কাঁধে তার একখন্ড গাছের বল্লি, হাতে আছে দা । সামনে আসতেই আমাকে সম্মোধন করে বললেন-এখানে কি মনে করে পলাশ? আমি চোখ তুলে তাকালাম কৃষকের মূখের পানে, দেখলাম তিনি আর কেউ নন,  আমাদের প্রভাংশু দা। সেদিন আমি সত্যি বিস্মিত হলাম। আমি বার বার তার আপদমস্তক লক্ষ্য করছিলাম  আর ভাবছিলাম, এই আমাদের প্রভাংশ ত্রিপুরা ? কতো সহজ-সরল আর সাদা-মাটা জীবন যাপন তার। নীবিড় প্রকৃতির কতো কাছে যার পদাচারনা, যেখানে ধান ফসলের ডগায় সাপ আর ভ্রমরের প্রতিদিনের মিতালী। এই উর্বর জুমিয়া প্রকৃতিকে হৃদয়ের সবটুকু ভালাবাসা দিয়ে কতো সুন্দর করে বুকে জড়িয়ে রেখেছেন আমাদের প্রভাংশ দা ?  তিনিই তো সত্যিকারের ভূমিপুত্র, তিনি কখনও সাধারণ কেউ হতে পারেন না। তিনি সত্যিকার অর্থে একজন “বিশেষ মানুষ”। সেদিন থেকে প্রভাংশু ত্রিপুরা আমার হৃদয়ে একজন “বিশেষ মানুষ” হিসেবে আসন লাভ করে আছেন। আমি সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম, এই মাটি, এই প্রকৃতি প্রভাংশু ত্রিপুরাকে কখনও নিরাশ করবে না এবং  অবশেষে তা সত্যিই হলো।
এখানে মূলতঃ যে কখাটি আমি বলতে চাচ্ছি সেটি হলো-একজন “সংসপ্তক প্রভাংশু”র কথা। সংসপ্তক হলো সেই সৈনিক, যিনি পরাজয় নিশ্চিত জেনেও যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ চালিয়ে যান। আমি মনে করি প্রভাংশু ত্রিপুরা একজন “সংসপ্তক গবেষক”। জীবনের যে স্তরে তিনি তার সাহিত্য চর্চা কিংবা গবেষণা শুরু করেন তিনি কি তখন ভেবেছিলেন? এই অবহেলিত পার্বত্য জনপদে তার লিখনী ও গবেষণা “বাংলা একাডেমী পুরস্কার-২০১৩” এনে দেবে, মোটেও না। তিনি যা কিছু করে গেছেন তা তিনি করেছেন নিঃস্বার্থ ভাবে। তিনি তা করেছেন তার বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকে। তার নিরলস গবেষণা, চেষ্টা, শ্রম উজাড় করে ঢেলে দিয়েছেন পার্বত্য জুমিয়া কৃষ্টি, সভ্যতা আর এতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে। তিহি হয়তা বা কিছু সময় আগেও জানতেন না তিনি বিজয়ী হবেন, সে লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য ও হয়তো বা তার ছিল না। তিনি যুদ্ধ করেছেন পরাজিত হওয়ার লক্ষ্যেই, কিন্তু অবশেষে তিনি বিজয়ী হলেন। তিনি একজন সত্যিকারের বীর সেনানী, ধন্য হোক পার্বত্য জনপদ, ধন্য হোক পার্বত্য জুমিয়া সভ্যতা। ডঃ মোহাম্মদ শহীদুল্লার সেই অমর উক্তিটি এখন বারে বারে আমার কানে বাঁজে। তিনি বলেছিলেন-“যে সমাজে গুণীর কদর নেই, সেই সমাজে গুণীর জন্ম হয় না”। এবার কি তবে সেই উক্তিটির প্রতিফন ঘটবে আমাদের সমাজে? আমরা কি তবে সঠিক পরিচর্যা করবো আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে  থাকা আরো অনাগত গুণীদের? প্রভাংশু ত্রিপুরার মতো সবাই হয়তো বা “বাংলা একাডেমী” পুরস্কারে ভূষিত হবেন না, তা হবারও নয়। তবুও আমাদের সমাজে জন্ম নিক নতুন নতুন সংসপ্তক সৈনিক, দেশ-জাতি তথা পার্বত্য জনপদ আরো সমৃদ্ধ হোক ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিতে। অনাদর অবহেলায় আর কোন অনাগত সম্ভাবনা অকালে ঝরে না পড়–ক আমাদের সমাজ থেকে। অসংখ্য খাল-ছড়া, ঝর্ণা, আর গীরি-উপত্যকায় প্রভাংশু বাবুর দেখানো পথ ধরে আবারও এগিয়ে আসুক নতুন কোন “সংসপ্তক প্রভাংশু” ?

Micro Web Technology

আরো দেখুন

ভাষা শিক্ষায় আশার আলো

একটা সময় ছিলো যখন প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারকে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা মনে করতেন অনেকেই। …

Leave a Reply