নীড় পাতা » আলোকিত পাহাড় » একজন বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধা : ফিলিপ বিজয় ত্রিপুরা

একজন বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধা : ফিলিপ বিজয় ত্রিপুরা

filip-tri-(1)তখনও ঠিক কিছু বুঝে উঠা যায়নি। সবখানেই কেমন যেন একটা অস্থিরতা,ঘরে ঘরে অভাব। সংকটে মানুষ দিশেহারা,দেশের পরিস্থিতি কী হবে তাও অনুমান করা যাচ্ছিল না,স্থিতিশীলতা ছিলনা বললেই চলে। সেসময় রাঙামাটির শাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন ফিলিপ বিজয় ত্রিপুরা। কিন্তু পিতা-মাতাকে অকালে হারিয়ে ৪ ভাইবোনের সংসারে বেশ অভাবেই কাটছিল তার দিনকাল। এই অবস্থায় আপন জেঠা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশের হাবিলদার যোগেষ চন্দ্র ত্রিপুরার কাছে চলে যান। খাগড়াছড়ি জেলার সীমান্তবর্তী রামগড়ে পারিবারিক সূত্রেই মোটামুটি স্বচ্ছল ছিলেন তার জেঠা।

খুব শীত পড়ছিল। সম্ভবত ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে হতে পারে। ১৯৭০ সালের কথা বলছি। দেশের হালচাল ভালো না দেখে জেঠা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ হাবিলদার পরিবারের সাথে ফিলিপ ত্রিপুরাও সীমান্ত ফাঁড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। ফেনী নদীতে পানি থইথই করছিল। তবুও রাতের অন্ধকারে হাড়কাঁপানো শীত নিয়েই দেশান্তর হতে হয়েছিল। তখনকার ভারতের সাব্রুম মহাকুমার হরিণাতে আশ্রিত হন তারা।

ঘুরতে ঘুরতে প্রায় ৩ মাস কেটে যায় সেখানে। জন্মভূমির টানে প্রায়ই সীমান্তে এসে দেশের মাটিতে চোখ রাখতেন ফিলিপ ত্রিপুরা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের খবরটি ভারতেও তখন বেশ আলোড়ন তোলে। যারা এরই মধ্যে সেখানে চলে গেছেন, তারাও বঙ্গবন্ধুর ভাষন শুনেছেন মুখে মুখে। হরিণাতে স্থানীয় রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষনের খবরটি প্রচার হয় বলে শুনেছেন। নিজ দেশ হতে যাওয়া কারো কারো কাছ থেকে ভাষনের কথাগুলো শুনতে পেয়ে নিজেও অনুপ্রাণিত হয়ে উঠেন। মনে মনে স্বাধীনতার ইচ্ছা জাগে। কিন্তু কিছুই ভাবতে পারছিলেন না এই বয়সে কী করা সম্ভব।

মাত্র ১৮ বছর। বয়সে টগবগে তারুণ্য। একদিন ফেনী নদীর কুলে এসে দেখেন পাকবাহিনীর সদস্যরা একেবারে কম বয়সি নারীদের দলে দলে ¯œান করাতে নিয়ে এসেছেন। বিষয়টি একদিন সিনিয়র ভাই সুবোধ বিকাশ ত্রিপুরার নজরে আসলে তিনি তাকে বললেন, এটা পাকবাহিনীর শয়তানি। এ দৃশ্য দেখলে চলবেনা। প্রিয় দেশকে মুক্ত করতে হবে। শত্রুদের হটিয়ে এসব নিরীহ মা-বোনদের সম্ভ্রম রক্ষা করতে হবে। তাঁর কথা শুনে পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের প্রতি ঘৃনা জন্ম নেয় ফিলিপ ত্রিপুরার।

ফিলিস ত্রিপুরা সেইদিনগুলোর বর্ণনা করে জানালেন, পরবর্তীতে তখনকার রামগড় ও খাগড়াছড়িসহ এ অঞ্চলের একমাত্র সাংবাদিক সুবোধ বিকাশ ত্রিপুরার পরামর্শে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে ইয়ুথ ক্যাম্পে যোগ দেন। নাম তালিকাভূক্ত করেন। পরে রিক্রুট ক্যাম্পে চলে যান। এসব প্রক্রিয়াগুলো হরিণাতেই হয়েছে। এই জায়গায় বেশ ক‘টি শরনার্থী ক্যাম্পও ছিল। বাংলাদেশ হতে যাওয়া মানুষজন সেখানে উঠতেন।

filip
ছবি : তৌসিফ মান্নান

তিনি জানান, রিক্রুট ক্যাম্পে মূলত: বাছাই করা হত, কে কোথায় যাবে। কার কী কাজ হবে। ওই সময় ৫৬ জনের সাথে তিনিও ছিলেন একজন। বাছাইয়ে তিনি নেভির সাথে কাজ পছন্দ করেন। প্রশিক্ষনের জন্যে পাঠানো হয় আগরতলায়। সেখান থেকে হাওড়াতে ট্রানজিট ক্যাম্পে গিয়ে একরাত থাকা হয়। তারপর একরাত কাটে পশ্চিমবঙ্গের আ¤্রকানন পলাশির প্রান্তর। সেখান থেকে ভগরতি নদীর পাড়ে গিয়ে ১৫ দিনের প্রশিক্ষন নেন তারা। বেশি শারিরীক কষ্টের কারনে এই প্রশিক্ষনে শেষ পর্যন্ত ৫৬ জন থেকে কমে ৩৮ জন টিকেন। প্রশিক্ষন ক্যাম্প যখন শেষ হয় মে মাসের শেষদিকে। এরপর বিশেষ প্রশিক্ষন গ্রহনের জন্যে বিহার রাজ্যের চাকুলিয়ায় যেতে হয়। সেখানে ফ্রনটিয়ার ফাইটার (এফএফ) নামের বিশেষায়িত ট্রেনিং হয় তিনদিনের। এখান থেকে কৃঞ্চনগর হয়ে আগরতলায় নামিয়ে দেয়া সবাইকে। আগরতলায় সম্ভবত ২/৩দিন অবসর নিয়ে পুনরায় হরিণা ক্যাম্পে চলে আসেন তারা।
ঠিক আগষ্টে রামগড় ও মাটিরাঙ্গার অযোধ্যা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ডুকে পড়েন ফিলিপ ত্রিপুরার প্রশিক্ষিত ফাইটার বাহিনী। পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের পরাজিত করে স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহনই মনেপ্রাণে কাজ করছিল। কল্পনা জুড়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ। শুরু হলো ফিলিপ বিজয় ত্রিপুরার নতুন পথচলা। নতুন গল্পগাথা। নতুন অঙ্গীকার। একটাই লক্ষ্য দেশকে স্বাধীন করা। পরাধীনতার গ্লানি হতে মুক্ত করা আর স্বাধীন পতাকা উত্তোলন করা।

ফিলিপ ত্রিপুরা জানান, হেমদা রঞ্জন ত্রিপুরার নেতৃত্বে ৪৬ জনকে নিয়ে তারা দেশের মাটিতে প্রবেশ করেন। একই সময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা রণ বিক্রম ত্রিপুরাও ভারত থেকে চলে আসেন। অবশ্য তার আগেই রণ বিক্রম ত্রিপুরা ভারতে যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছিলেন। সম্ভবত বগাপাহাড়ে। রাঙ্গুনিয়ায় প্রতিরোধ বাহিনীর সদস্য হিসেবে যুদ্ধ করেন রণ বিক্রম ত্রিপুরা। কিন্তু টিকতে না পেরে ফের ভারতে উঠেছিলেন তিনি। পুনরায় দেশে ফিরে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সহায়তায় রপ্ত করা যুদ্ধ কৌশল দেশে পাকবাহিনী ও মিত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিলেন রণ বিক্রম। সফল হন ভালোভাবে। রাঙ্গামাটি, চট্টগ্রামের রাউজার, পটিয়াসহ আশপাশ এলাকায় তিনি মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্ব দেন।
ফিলিপ ত্রিপুরা যুদ্ধ শুরুর কাহিনী বর্ণনা করে বলেন, দেশে ঢুকতে কোন বাধার মুখে পড়েননি তারা। কারণ প্রথমেই রেকি পার্টি পাঠিয়ে দেখা হয় শত্রুপক্ষ কেউ আছে কিনা। কেবল ফেনী নদীতেই দুটি এম্বুস বসানো হয়। তবে শত্রু নয়; বেশ প্রতিকুল আবহাওয়ার মধ্যেই সেদিন বাংলাদেশে আসতে হয়। ফোটাফোটা বৃষ্টিতে শীতও লাগছিল খুব। কৃষ্ণপক্ষ ছিল। খুব অন্ধকার। রাত আনুমানিক ১০টার দিকে অস্ত্র হাতে ফেনীনদীতে নামতে তাই গা ঝিমঝিম করছিল।
বাংলাদেশে ঢুকেই অযোধ্যায় এক মারমা নৃ-গোষ্ঠির বাড়িতে উঠেন নতুন মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা। ওই বাড়িটির চারদিকেই সেন্ট্রিপোষ্ট বসানো হয়। যাতে শত্রু পক্ষ হামলা করতে না পারে। ঘন্টা দুয়েক রেষ্ট করেই মূল যুদ্ধের জন্যে নেমে পড়েন তারা। এত রাতেও ঘুম চোখে নিয়েই মাটিরাঙ্গা হয়ে মানিকছড়ির গাড়িটানার দিকে রওনা হন। ভোর নাগাদ গাড়িটানার আগে মানিকছড়িতে পূর্ব পরিকল্পনামত ৪ ভাগে বিভক্ত হয়ে যান। নিজেই একটি গ্রুপের প্রধান নির্বাচিত হন। ফিলিস ত্রিপুরার গ্রুপের প্রধানতম কাজই ছিল পেট্রোলিং। মানুষ কে কি অবস্থায় আছে। শত্রুরা কোথায় থাকতে পারে; সেটা পর্যক্ষেন করা। কারো কোন অভিযোগ অনুযোগ শুনে প্রয়োজনে মুক্তিবাহিনীর নেতাদের কাছে তার রিপোটিং করার কাজও এই গ্রুপের দায়িত্ব ছিল।

সময়টি ঠিক মনে না পড়লেও বলা যায় অক্টোবরের শেষ বা নভেম্বরের প্রথম দিককার কথা। তখনও পাকবাহিনীর শক্তি সামর্থ তেমনটা ছিলনা। পাহাড়ের অনেক এলাকাতেই তারা পৌছাতে পারেনি। যদিও স্থানীয় কিছু রাজাকার ধরনের মানুষ ঠিকই তাদের পক্ষে কাজ করতো। খবর টবর দিত তাদের। বিশেষত মিজোরা বেশ সক্রিয় এবং শক্তিশালী ছিল। ওই সময়েই মিজোরা মানিকছড়ির রাজবাড়ি দখলে নিয়ে নেয়। মং সার্কেলের রাজা মংপ্রুসাইন পালিয়ে যান।
ফিলিপ ত্রিপুরা বলেন, এই মং রাজার মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা ছিল অপরিসীম। যারাই মুক্তিযুদ্ধে যেতেন রাজা মংপ্রুসাইন রুপাইছড়িতে সবাই জায়গা দিতেন। খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। এমনকি খেলার জন্যে ফুটবল পর্যন্ত কিনে দিতেন বলে শুনেছি। রাজা বলতেন ‘তোমরা খেল, খাও। সময়মত গিয়ে ইয়ুথ ক্যাম্পে নাম লিখাও। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন কর এবং দেশকে স্বাধীন কর।’

অস্ত্র ও শত্রু প্রতিরোধ প্রশিক্ষন গ্রহন করে দেশে ফিরে নানা ঘটনা প্রবাহের কথাই মনে পড়ছে মুক্তিযোদ্ধা ফিলিপ বিজয় ত্রিপুরার। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি সম্মুখ যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।

জীবনের প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ: একদিনের ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, একদিন খবর এলো যে একজন ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে একদল পাক সেনা রাজবাড়ির দিকে আসছে। ওইদিন অন্যসব কাজ ফেলে দলবল নিয়ে গুইমারার কোন এক স্থানে রাতেই এম্বুস নেই। রাত আনুমানিক ১১টার দিকে এবরোথেবরো সড়কের পাশে কিছুটা আড়ালে অবস্থান গ্রহন করি। তারা রামগড় হতে আসছিল। অপেক্ষার পর গভীর রাত ১টা নাগাদ গাড়ির শব্দ শুনতেই সড়কের দু‘ধারে এবং পাহাড় চুড়ায় এম্বুস নিই। কাছে আসতেই উপর্যপরি গুলি চালালে তারা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। গাড়ি থেকে নেমে তারাও গুলি চালায়। প্রায় আধাঘন্টার বেশি সময় ধরে গোলাগুলি চলে। তাতে পাকবাহিনীর অন্তত ৩জন সেনা নিহত হয়েছে বলে শোনা যায়। এই সম্মুখ যুদ্ধে এক মারমা মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন বলে জানান। যদিও নাম ঠিকানা সুনির্দিষ্ট মনে করতে পারছেন না তিনি। এই যুদ্ধের মধ্যদিয়েই ফিলিপ বিজয় ত্রিপুরার সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রথম অভিজ্ঞতা মিলে। নিজেকে সত্যিই দেশের জন্যে মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর সৈনিক বলে মনে হয়। তখন থেকে আরো উৎসাহ ও প্রেরণা বেড়ে যায়।

এ ঘটনার পরদিন থেকে গুইমারার ওইসব এলাকার মানুষের দূ:খ-দূর্দশা বেড়ে যায়। পাকবাহিনীর বদ নজরে আসে। স্থানীয় কিছু পাহাড়ি রাজাকারকে সাথে নিয়ে এসে কয়েকজন পাক সেনা মারমা গ্রামে আগুন লাগিয়ে দিল। বহু মানুষ নি:স্ব হয়ে পড়েন। এমনতেই খুব শীত পড়ছিল; আগুনে তাদের শীতের কাপড়গুলোও রক্ষা করা যায়নি। রাতে আগুন দেয়ায় ক্ষয়ক্ষতি বেশি ঘটে। মানুষের কষ্টের সীমা ছিলনা। তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গান পাউডার দিয়ে আগুন দিত। এমনকি ফসলি জমি, পাকা ধান খেতেও আগুন দিয়েছে তারা। মানিকছড়ির যোগ্যাছোলা, গাড়িটানা এলাকায় এমন অনেক জমিতে আগুন লাগিয়ে ক্ষতি করেছে।

এসব নানা কারনে মুক্তিযুদ্ধের শেষ কয়েক মাসে ব্যাপকভাবে অভাব দেখা দিয়েছিল। অপেক্ষাকৃত গরীবদের দু‘বেলা খাবারও কষ্ট হত। সেজন্য মুক্তিযোদ্ধারা স্থানীয় হেডম্যান-কার্বারী; যারা কিছুটা হলেও স্বচ্ছল, তাদের কাছে খাদ্যের ডিমান্ড পাঠাতেন। চাল, মুরগি, ছাগল ইত্যাদি এনে নিজেরা খেয়ে বাকিটা অভাবিদের মাঝে বিতরণ করার ব্যবস্থা করা হয়।

মুক্তিযোদ্ধা ফিলিপ ত্রিপুরা বললেন, ‘ওই ঘটনার পর থেকে এবার রাজাকার খুঁজতে শুরু করলাম। যারা পেটের দায়ে পাকবাহিনীকে সহায়তা করতো তাদেরকে মারতাম না। সামর্থবান রাজাকারদেরকে মুক্তিবাহিনীর বাহক ও শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগাতে লাগলাম। মিজোরা ছাড়াও কিছু চাকমা রাজাকারও পাকবাহিনীকে সহযোগিতা দিত।

মিজোদের সাথে গাড়িটানা যুদ্ধ
এটি একেবারে মুখোমুখি না হলেও হতাহত কম হয়নি। অনেকক্ষন ধরে গুলিবিনিময় হয়। কিছুটা নিরাপদ স্থান হতেই মুক্তিযোদ্ধারা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। তারা ধান খেতের আইল দিয়ে দলে দলে যাচ্ছিল। তখন সকাল। সম্ভবত নভেম্বর মাস হতে পারে। ২৫/৩০ জনের মিজো বাহিনী অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হাটছিল। মুক্তিযোদ্ধারা পাহাড়ের ওপর। মুক্তিযোদ্ধারা প্রথমে গুলি ছুড়লে তারাও পাল্টা গুলি ওপেন করে। এই যুদ্ধে অনেকটাই সুবিধাজনক স্থানে ছিলো মুক্তিযোদ্ধারা। এই যুদ্ধে বেশ কয়েকজন মিজো হতাহত হয়। নিহত অন্তত ২জনকে তারা তুলে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। ওদের হাতে চাইনিজ রাইফেল ছিল। ফিলিপ ত্রিপুরা জানান, তাদের কাছে ছিল এসএলআর, এলএমজি, এসএমজি প্রভৃতি অস্ত্র। এ ঘটনায় জমিতে থাকা একটি ছাগল মারা গিয়েছিল। তিনি বলেন, মিজোদের মুলত: অস্ত্রশস্ত্র ও সহযোগিতা দিত পাকিস্থানীরা।
সর্বশেষ গাড়িটানা যুদ্ধের পর তেমন আর কোন প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়নি। ৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে রামগড়ের দিকে ফিরছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। পথিমধ্যে গুইমারায় কাঠের ব্রিজ ভেঙ্গে পিকআপ দূর্ঘটনা কবলিত হলে বেশ ক‘জন আহত হন। অনেক কষ্টে সেদিন গাড়িটি টেনে তুলতে হয়। এরপর পুনরায় ওই গাড়ি নিয়ে রামগড়ের দিকে আসতে আসতে মন খুব খারাপ হয়ে যায়। কারণ, অনেকাংশ ঘরবাড়ি খালি আর পোড়া। গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে ছাই। মুক্তিযোদ্ধা ফিলিপ বিজয় ত্রিপুরা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের শেষদিনগুলোতে পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা সব বাড়িঘরে আগুন দিয়ে যায়। রামগড় বাজারের চিহ্ন খুজে পাওয়া দুস্কর ছিল। ছাই আর ছাই। আর মানুষের অভাব এতটাই তীব্র ছিল যে, আমরাও খাবার পাচ্ছিলাম না।’
তিনি জানান, ৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনী রামগড়ে ধংসযজ্ঞ চালিয়ে পালিয়ে যাবার পর তারা রামগড়ে প্রবেশ করেন। ৮ ডিসেম্বর প্রথম তখনকার মহকুমা শহর রামগড়ে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয়। রামগড় মুক্ত হবার পর ১৪ তারিখে খাগড়াছড়ির দিকে আসার পথে মাটিরাঙ্গায় পিকআপটি কাঠের ব্রিজসহ ধলিয়া খালে ভেঙ্গে পড়ে। এতে অংপ্রু মারমা নামে একজন নিহত হন। যদিও মুক্তিযোদ্ধা ফিলিপ ত্রিপুরা বিষয়টির পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তুলে ধরতে পারেনি। তখন খাগড়াছড়ি হতে ২টি পিকআপ গিয়ে এসব মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আসেন। যাদের মধ্যে ১৪/১৫ জনই আহত হয়। তাদেরকে খাগড়াছড়ি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৫ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি মুক্ত ঘোষনার পর স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হলেও চিকিৎসাধীন থাকায় তাতে অংশ নেয়া সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ স্বাধীন করেই মুক্তিযোদ্ধারা দায়িত্ব শেষ করেননি। খবর পাওয়া মাত্রই বীর মুক্তিযোদ্ধা রণ বিক্রম ত্রিপুরার নেতৃত্বে রাঙ্গামাটিতে লুটপাট ও উচ্ছৃংখলতা বন্ধে সেখানে চলে যান। অনেকে অভাবে আবার অনেকে প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালানো শুরু করে। ফিলিপ ত্রিপুরা বলেন, ‘আমরা তাদেরকে বাধা দিই। লুণ্ঠিত সম্পদ অনেককে ফিরিয়ে দিই। বোঝানোর চেষ্টা করি। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে রাঙ্গামাটিতে অবস্থান নিয়ে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেছিলাম। সেটিও এক রকম যুদ্ধ বলা চলে।’
মুক্তিযোদ্ধা ফিলিপ বিজয় ত্রিপুরার একটাই প্রত্যাশা- যেন মুক্তিযুদ্ধে অশগ্রহনকারী, সহায়তাকারী এবং মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার জন্যে শাহাদাত বরণকারীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়। বিনিময় চাইনা।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা হলেন দীপংকর তালুকদার

বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদ রাঙামাটি জেলা শাখার প্রধান উপদেষ্টা হয়েছেন খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী …

Leave a Reply