উলু বনে মুক্তা ছড়ানো

বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি উদার গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে পরিচিত। পৃথিবীর বুকে যেসব রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক পন্থায় পরিচালিত হয়, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। ‘বৈরতা নয়, সকলের সাথে বন্ধুত্ব’ দেশের এই বৈদেশিক নীতির সুস্পষ্ট প্রতিফলন অভ্যন্তরীণ পরিমন্ডলেও লক্ষণীয়। সু-দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর সহাবস্থানের আদর্শ দৃষ্টান্ত শান্তিপ্রিয় মানুষের এ বাংলাদেশেই মেলে। এ দেশের সেই ঐতিহ্যগত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ধারা অব্যাহত রাখার মানসে, অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীর সার্বিক কল্যাণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদন করেন, নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি এ পার্বত্য চট্টগ্রাম, উঁচু-নিচু সবুজ পাহাড় নদী আর হ্রদের সমন্বয়ে এখানে তৈরি হয়েছে নীল সবুজের সমন্বয়ে এখ অপুর্ব পরিবেশ, দেশের দক্ষিণ-পুর্ব কোণায় অবস্থিত বাংলার এক-দশমাংশ আয়তন নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা তিন জেলার ভূ-খন্ড নির্ধারিত। মহান ¯্রষ্টা তার মনের মাধুরী দিয়ে বর্ণাঢ্য রং-এ বৈচিত্রময় এক স্বর্গীয় পরিবেশে সাজিয়েছে এ পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বেও অর্ন্তভূক্ত একটি স্বল্পোন্নত দেশ হিসাবে পরিগণিত। তাই জননেত্রী শেখ হাসিনা পার্বত্য চট্টগ্রামসহ এ দেশটিকে একটি উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করার লক্ষে দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে চলেছেন, উন্নত বিশ্বের অন্যান্য দেশের সারিতে নিয়ে যেতে চান এ বাংলাদেশকে, এ লক্ষে সরকার ২০২১ সাল-২০৪১ সাল পর্যন্ত নানা মুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং তা বাস্তবায়নপূর্বক সারা দেশে এক কর্মচাঞ্চল্য এনে দিয়েছেন, দেশে অভ্যন্তরীণ অসংখ্য সমস্যা রয়েছে, কৃষি প্রধান এ দেশটি আজও শিল্পে তেমন একটা অগ্রসর হতে পারেনি ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও আশানুরূপ হয়নি, জনসংখার ঘনত্বের বিচারে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থান দখলকারী এ দেশের জনসংখার বৃহদাংশ দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে, প্রকৃতির দুর্যোগ যেখানে নিত্যসঙ্গী, সেখানে জনসংখার একটি উল্লেখযোগ্যে অংশ প্রতিবছর বাস্তুহীন হয়ে পড়ে, এমতাবস্থায় প্রতিনিয়ত বেড়ে চলছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ, প্রকৃতির এমন রূঢ় আচরণের পাশাপাশি রয়েছে মানবসৃষ্ঠ বহুমুখী-বহুবিধ সমস্যা, আমাদের দুর্ভাগ্যে যে এ পার্বত্য চট্টগ্রামে আজ মানবসৃষ্ট সমস্যাটি-ই-সরকারের অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজারো সমস্যায় জর্জরিত, সীমিত সম্পদেও এ দেশে তবুও জননেত্রী শেখ হসিনা এ পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্বপ্নের রাজকন্যা বানাতে এগিয়ে চলেছেন, এর চেয়ে বড় পাওয়া, বড় সু-ভাগ্যে আর পার্বত্যবাসীর কি হতে পারে। পার্বত্যবাসীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে অভাবনীয় পরিবর্তন চান তিনি। এখানকার সকল মানুষের একটি সোনালী গতিশীল আধুনিক ভবিষ্যতের স্বপ্ন বিনির্মাণে আওয়ামীলীগের বিকল্প নেই। অতীতে পাহাড়ি জীবন ছিল অত্যন্ত সঙ্কটময় ও অনিশ্চিত। কিন্তু, আজ পাহাড়ের এমন কোনও স্থান নাই যে সমৃদ্ধির ছোঁয়া লাগেনি, উন্নয়নের জোয়ার আসেনি, আজ পার্বত্য চুক্তির পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনগ্রসর পাহাড়িরা কতটুকু অগ্রসর হয়েছে তা আজ দেশবাসীসহ বিশ্ববাসী অবগত আছে। আপোষ, আলোচনা আর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে যখন সহজ সমাধান ও অগ্রগতি ঘটেছে এবং পাহাড়িদের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণের প্রতিফলন হচ্ছে ঠিক তখন হুংকার ছেড়ে নিজের পায়ে কুড়াল মেরে লাভ কি? সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তীরে এসে স্ব-ইচ্ছায় নাও ডুবিয়ে মরতে যাবেন কেন? অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার আহবানে সাড়া দিয়ে প্রগতির যে ক্রমধারা সূচনা করেছেন, তা ধ্বংস করলে ক্ষতি কার? এ চুক্তি সম্পাদনের সময় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের ত্যাগের কথা কি একটুও মনে নেই, সাদা পতাকা-কালো পতাকার লড়াইয়ের কথা একবার ভেবে দেখুন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জননেতা আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ পার্বত্য শান্তি চুক্তির রূপকার জননেতা দীপংকর তালুকদারকে নিয়ে চুক্তিকালীন সময়ের স্মৃতির দর্পণে নিজেকে দেখুন। শত্রু-মিত্র না চেনার কারণেই আজ পার্বত্য অঞ্চলের এ অবস্থা। হঠকারিতা পরিহার করে আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান হয়ে এগিয়ে চলুন।

১৮এপ্রিল ২০১৫ইং তারিখ পার্বত্য বান্দরবানে সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, ‘কোন ডেড লাইনের প্রয়োজন নেই, চুক্তি বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ সরকার অঙ্গীঁকারবদ্ধ। সরকার যে অঙ্গীঁকার করেছে তা অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করবে’। এ মন্ত্রী যা বলেন, সততা এবং নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব নিয়ে বলেন। অতএব ৩০ এপ্রিলের ডেড লাইন পরিহার করুন, সর্বস্তরের পার্বত্যবাসীকে নিয়ে একটি সংঘাতমুক্ত সুন্দর উন্নতর সোনালী ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে অগ্রসর হোন, এ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল মানুষ আজ সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে শান্তিতে বসবাস করতে চাই, তাই বর্তমান সরকার উন্নয়ন ও শান্তির ধারাকে সমুন্নত রাখতে প্রতিনিয়ত নিরলস ভাবে কাজ করে যচ্ছে।

প্রবাদ আছে ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড’। পিছিয়ে পড়া এ জনগোষ্ঠীগুলোকে উন্নত বিশ্বের প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে এ প্রবাদের যথার্থ মূল্যায়ন করেছে সরকার। ইতিমধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের সার্বিক কল্যাণের নিমিত্তে দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে এবং কর্মক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হারে কোটা প্রথা চালু করে এ অঞ্চলের পাহাড়িদের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। যা এখানকার জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত সুফল বয়ে এনেছে। এ ব্যাপারে গত সপ্তাহের লেখাতে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি।

২৪ এপ্রিল ২০১৫ইং তারিখ এ পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে আরো একটি ঐতিহাসিক দিন নিরবেই পেরিয়ে গেলো। ঐদিন রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়। কিন্তু আমাদের অত্যন্ত দুর্ভাগ্য যে, তা এখানে নয়; ঢাকাতেই ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ উচ্চতর বিদ্যাপীঠের ঠিকানা শহরের ভেদভেদী এলাকায়। ভেদভেদী মানে বিশাল একটা এলাকা। নির্ধারিত কোনও স্থানের নাম উল্লেখ নেই। যেন ঠিকানাবিহীন একটি খাম। কেন এই লুকোচুরি খেলা। কাদের আলোকিত করতে সরকারের এই মহান উদ্যোগ? তাদের কি বোধ শক্তি নেই। তা কি জানে না, আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতিই তো তত বেশি উন্নত। জননেত্রী শেখ হাসিনা পার্বত্যবাসীর উন্নয়নের স্বার্থে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তা বাস্তবায়নের জন্য সবার আগে এখানকার আঞ্চলিক নেতাদের অবশ্যই ধৈর্যশীল থেকে এগিয়ে আসতে হবে। স্থায়ী শান্তির জন্য সরকারের প্রতিটি কাজে আঞ্চলিক নেতাদের হীনস্বার্থ পরিত্যাগ কওে পূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্ত সহায়তা প্রদান ছাড়া বিকল্প নাই। অন্যথায় প্রকৃত শান্তি ফিরিয়ে আনা বা বাস্তবায়ন করা কখনও সম্ভবপর নয়। বরং পাহাড়ে আজীবন অশান্তি বিরাজ করবে এবং উন্নতির কোনো সম্ভাবনা থাকবে না। আমরা চাই সরকারের সকল উদ্যোগকে পাহাড়ের সকলেই স্বাগত জানাবে। রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোসহ সকল কার্যক্রম অতি দ্রুত রাঙামাটিতেই পরিচালিত হবে নির্ধারিত স্থানে আমজনতা সে আশাই করে। তবে-ই হবে এখানকার জনগোষ্ঠীর কল্যাণ। জানি না-আমার এ লিখনীর কথাগুলো ‘উলুবনে মুক্তা ছড়ানো’ কিনা কে জানে। (লেখার সকল মন্তব্য লেখকের নিজস্ব )

লেখক: সাবেক কাউন্সিলর, রাঙামাটি পৌরসভা ও আহ্বায়ক, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, রাঙামাটি জেলা।

siraj-bhai

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কারাতে ফেডারেশনের ব্ল্যাক বেল্ট প্রাপ্তদের সংবর্ধনা

বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশন হতে ২০২১ সালে ব্ল্যাক বেল্ট বিজয়ী রাঙামাটির কারাতে খেলোয়াড়দের সংবধর্না দিয়েছে রাঙামাটি …

Leave a Reply

%d bloggers like this: