নীড় পাতা » পাহাড়ে নির্বাচনের হাওয়া » ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে কি ?

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে কি ?

AAA-cover-2১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। পার্বত্যবাসির জন্য ঐতিহাসিক এক দিন। এদিন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর সারাদেশে আওয়ামী লীগের ব্যাপক বিজয়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সারাদেশে যে ৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছিলেন তাদের মধ্যে ২ জনই নির্বাচিত হন পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালিন দুটি আসন থেকে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম-০১ আসন থেকে তৎকালিনক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থি সমিত রায়কে প্রায় ৪২ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে বিজয়ী হন স্বতন্ত্র প্রার্থী মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা। তার প্রাপ্ত ভোট ছিলো ৬০,৭০১। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমিত রায় ১৮,৭৩৪ ভোট, ন্যাপ(মোজাফফর) প্রার্থী শামশুল হুদা ৪৩১৩, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের তিলক চন্দ্র চাকমা ১৭০৩ ভোট পান।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম-০২ আসনে আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী চাই থোয়াই রোয়াজাও ২৬,৯৮৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন প্রায় চার হাজার ভোটের ব্যবধানে। সেই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মংশুই প্রু চৌধুরী ২২,১৩৮ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। অন্য তিন প্রার্থী ন্যাপ-ভাসানী’র আতিকুর রহমান ৩,৪১২, ন্যাপ-মোজাফফর এর জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা ৩,২২২ এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল উপেন্দ্র লাল চাকমা ২৫৬২ ভোট পান।

M-N-Larma-1
মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা, ১ম জাতীয় সংসদে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য

সেই শুরু সেই শেষ। এরপর আর কোন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত হতে পারেননি কোন স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের কোন প্রার্থী। প্রেসিডেন্ট জিয়া কিংবা এরশাদের শাসনামলে বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়েছেন। আর ১৯৯১ সালে গনতান্ত্রিক সংসদীয় রাজনীতি শুরু হলেও দাপট শুরু হয় আওয়ামী লীগেল মাঝে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন এবং ২০০১ সালে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি আসনে বিএনপি’র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।

এছাড়া গত দুইযুগ ধরেই পাহাড়ের ভোটের রাজনীতির পুরোটাই আওয়ামীময়। আবার এটাও বাস্তবতা যে আঞ্চলিক দলগুলোও জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়নি দীর্ঘ সময়,স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও মাঠে আসেনি তাদের শক্তিশালী কোন প্রার্থী। কিন্তু ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পর ভোটের মাঠে আসে নবগঠিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক ইউপিডিএফ। সেবার জনসংহতি নির্বাচন বর্জন করলেও ইউপিডিএফ এর প্রার্থীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভোটও পায়। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেয় জনসংহতি সমিতিও। তারা রাঙামাটি আসনে বেশ ভালো ভোট পেলেও বিজয়ী হতে ব্যর্থ হয়। সেই ব্যর্থতার পর এবারই প্রথমবারের মতো তিন পার্বত্য আসনেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে পাহাড়ের তিন আঞ্চলিক দল জনসংহতি সমিতি,ইউপিডিএফ এবং জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)। কিন্তু তিনটি দলই নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দল না হওয়ায় তাদের প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী পরিচয়েই।

শুধু অংশগ্রহণই নয়,এবার নির্বাচনের মাঠে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি না থাকায়,আঞ্চলিক দলগুলোর পোয়াবারো। ইতোমধ্যেই ভোটারদের মধ্যেও বেশ প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাদের। রাঙামাটি আসনে তিনবারের বিজয়ী আওয়ামী লীগের প্রার্থী দীপংকর তালুকদারকে বেশ শক্তভাবেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন আঞ্চলিক দলের দুই প্রার্থী উষাতন তালুকদার ও সুধাসিন্ধু খীসা। খাগড়াছড়িতেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরাকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছেন ইউপিডিএফ প্রার্থী প্রসিত বিকাশ খীসা। আর বান্দরবানে টানা চারবারের সংসদ সদস্য বীর বাহাদুরকে আঞ্চলিক দল জনসংহতি সমিতির সমর্থন নিয়ে বিপাকে ফেলে দিয়েছেন তার দলেরই বহিষ্কৃত সভাপতি,স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা।

ফলে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির সুযোগ পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর সামনে। সেবার সারাদেশে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুজ বিজয়ের বিপরীতে পার্বত্য আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী পরিচয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন জনসংহতি সমিতিরই প্রতিষ্ঠাতা মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা ও চাই থোয়াই রোয়াজা। এবারো ৪০ বছর পর,আরো মাঝের আরো আটটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যখন সারাদেশে প্রায় ১৫৭ জন আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিনাপ্রতিদ্বন্ধিতায় ইতোমধ্যেই বিজয়ী হয়ে গেছেন,বাকীওরা প্রায় সবাই একচেটিয়া বিজয়ের পথে সেই সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি আসনেই বিজয়ী হতে গিয়ে বেশ চ্যালেঞ্জেই পড়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। আর সুযোগ নিতে মরিয়া আঞ্চলিক দলগুলোর স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও। এমএনলারমা আর চাইথোয়াই রোয়াজা উত্তরসূরি হওয়ার লড়াইয়ে তাই ময়দান দাপিয়ে বেড়িয়েছেন উষাতন তালুকদার,সুধাসিন্ধু খীসা,প্রসিত বিকাশ খীসা,মৃণাল কান্তি ত্রিপুরা,ছোটন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা আর প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা’রা।

অনেকেই বলছেন, ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে আবারো পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিজয়ের মাধ্যমে। আবার কেউ কেউ বলছেন,ইতিহাসে ঘটনার পুনরাবৃত্তি সবসময় একই রকম হয়না,এবারও সেই সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। পাহাড়ে আওয়ামী লীগের গত দুই দশকে তৈরি হওয়া শক্তিশালী দূর্গ ভাঙ্গা সহজ নয়। শেষাবধি কি ঘটতে যাচ্ছে পাহাড়ে তা সবচে ভালো জানেন ভোটাররাই। তবে ৫ জানুয়ারি ভোটের ফলাফল ঘোষণার পরই নিশ্চিত হবে,আসলেই কি ৪০ বছর পর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিই ঘটেছে নাকি অব্যাহত আছে বীর বাহাদুর-দীপংকরের জয়যাত্রা।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লংগদুতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিএনপি’র প্রচারপত্র বিতরণ

রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতামূক প্রচারণা ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার …

Leave a Reply