নীড় পাতা » পাহাড়ের রাজনীতি » ইউপিডিএফ-জেএসএস বিরোধের উত্তাপ এবার ফটিকছড়িতে

ইউপিডিএফ-জেএসএস বিরোধের উত্তাপ এবার ফটিকছড়িতে

yousuf-family
ইউছুফের স্ত্রী ও এতিম তিন শিশু সন্তান
younus-trajedy
নিহত ইউছুপ

           পাহাড়ী ও বাঙ্গালীর এক শান্তির জনপদ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি। পার্বত্য খাগড়াছড়ির লক্ষীছড়ি, পার্বত্য রাঙামাটির কাউখালী উপজেলা এক সবুজ নির্মল মিলন মেলার স্থান এ উপজেলা। ৪৩ বছরের ইতিহাসে এই জনপদে পাহাড়ী-বাঙ্গালী কোন সংঘর্ষ হয়নি। একে অপরের বন্ধু, পাড়া-প্রতিবেশী, ব্যবসায়ীক যোদ্ধা হিসেবে সহ-অবস্থান ছিল। কিন্তু সোমবার বাঙ্গালী ব্যবসায়ী ইউছুপ (৩৫) কে ফটিকছড়ির খিরাম এলাকায় ব্রাশফায়ারে হত্যার মাধ্যমে এই জনপদে অশান্তির আগুন ছড়ালো পাহাড়ী জঙ্গী সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে শত শত মানুষ। কেউ মুখ খুলছেনা। সেখানে এক অজানা আতংক। অনেকে এলাকায় থাকলেও রাতে ঘরে থাকেনা। হাট-বাজার, স্কুলে নেই কোন উপজাতি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা। ইউপিডিএফ’র শক্তি প্রদর্শনের খেলায় হত্যার তালিকায় আছে এই এলাকার ২১০জন। বৃহস্পতিবার এলাকা ঘুরে জানা যায় এসব খবর। ভূক্তভোগীরা পাহাড়ী দুই জঙ্গী সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)’র শক্তির খেলা বন্ধ করতে আইন-শৃংখরা বাহিনীর সরব উপস্থিতি ও কার্যকর পদক্ষেপ চাইছেন।

DSC00211
ইউছুপের বাড়ী
DSC00215
এই স্থানেই হত্যা করা হয় ইউছুপকে

প্রত্যক্ষদর্শীরা নাম প্রকাশ না করে জানান, সোমবার সকালে খিরাম টিলা পাড়ার শ্রমজীবি মানুষ কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এসময় স্থানীয় সোলাইমানের ঘরে প্রবেশ করে সেনা বাহিনীর মতো পোশাক পরা দুই ইউপিডিএফ সন্ত্রাসী। তাকে বেদম পিটুনি দিয়ে ইউছুপের ঘর দেখিয়ে দিতে বলে। তাকে বন্দুক ধরে পাশ্ববর্তী টিলায় ইউছুপের ঘরের উঠানে আসে। তখন ইউছুপের ভাই গিয়াস ও তৌহিদকে ধরে রাইফেলের বাট দিয়ে বেদম পিটুনি দেয়। ইউছুপ কোথায় ? জানতে চায়। ইউছুপের মা ও ছোট বাচ্চার বুকে বন্ধুক ধরে। তারা বলে, তোরা আমাদের অনেক ক্ষতি করেছিস। সেনাবাহিনী ও জেএসএস কে সহায়তা করেছিস। তোদের বাঁচার অধিকার নেই। এমন সময় ঘরের পিছন দিকে পালিয়ে দৌড় দেয় ইউছুপ। ছড়িয়ে থাকা অস্ত্রধারীরা গুলি ছুড়ে। থেমে থেমে দুই বার গুলির শব্দ শুনা যায়। এমন সময় এক অস্ত্রধারীর মুঠোফোন বেজে উঠে। অপর প্রান্ত থেকে কিছু বলে উঠতেই সবাই উত্তর দিকে দৌড়ে চলে যায়। ইউছুপের একটি চিৎকার শুনতে পাওয়া যায়। আর কিছু শোনা যায়নি।
ইউছুপের বাড়ি থেকে ৩শ গজ দূরে হত্যার স্থান দেখিয়ে প্রতিবেশীরা বলেন, পালাতে অনেক চেষ্টা করে সে। কিন্তু ইউপিডিএফ এর অস্ত্রধারীরা পুরো টিলাটি ঘিরে রেখেছিল। তাই সে পালাতে পারেনি। তারা আরো বলেন, ইউপিডিএফ ও জেএসএস এর যাঁতাকলে আমাদের জীবন। আমরা এই অবস্থার উত্তরণ চাই।
একটি সূত্র জানায়, ইউপিডিএফ অধ্যুষিত এই এলাকাটি জেএসএস দখল নিতে মরিয়া দীর্ঘ দিন যাবৎ। কিছু দিন জেএসএস এই এলাকায় অবস্থান করছিল। তখন ইউছুপ তাদেরকে সহযোগিতার অভিযোগ তোলে ইউপিডিএফ। আর খিরাম সেনা বাহিনী ক্যাম্পের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন কাজে সহায়তা করতো ইউছুপ। তাই ইউপিডিএফ’র বার্মাছড়ি এলাকার সামরিক প্রধান সমীর মারমার সেকেন্ড ইন কমান্ড পর, চাকমার নেতৃত্বে এই হত্যাকান্ড ঘটানো হয়।

নাম প্রকাশে অনিশ্চুক একাধিক ব্যক্তি জানান, গত ডিসেম্বরে ইউপিডিএফ ব্যবসায়ী আহমদ ছাপাকে অপহরণ করে। তখন এই এলাকার বেশকিছু বাঙালীর একটি তালিকা করা হয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তখন হুমকি দেয়া হয়েছিলো যারা তালিকায় আছে তারা সবাই জেএসএস ও সেনাবাহিনীর হয়ে কাজ করে। ইউপিডিএফ’র বিরোধী কাজ করায় তাদের শাস্তি পেতে হবে। ২/১ দিনের মধ্যে মুঠোফোনে অনেককে হুমকী দেওয়া হচ্ছে। তাই তারা ঘর ছাড়া। দুইদ্যা খোলা, লম্বা টিলা এলাকায় এবং সুলতান নগর, বেত্তছড়ি, রক্তছড়ি এলাকায় শতাধিক অস্ত্রধারী ইউপিডিএফ ক্যাডার অবস্থান করছে বলে দাবি করছে স্থানীয় সূত্রগুলো।

নানুপুর ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ ওসমান গনি বাবু বলেন, ইউপিডিএফ ইউছুপকে হত্যার মাধ্যমে পাহাড়ী-বাঙ্গালীর সম্প্রীতি নষ্ট করলো। ঘটনার পর ক্ষুদ্ধ জনতা উপজাতি স্কুল ছাত্রদের আটক করলে আমি শান্তিপূর্ণ অবস্থানের জন্য ছেড়ে দিতে বলেছিলাম। আমরা ধারণা করেছিলাম তাকে অপহরণ করলেও মুক্তিপনের বিনিময়ে ছেড়ে বেবে। এভাবে হত্যা করবে ভাবিনী। ইউছুপের স্ত্রী জোসনা (৩০), বোরহান (১০), তাছমিয়া (৮), সিয়াম (২) নামে তিনটি অবুঝ সন্তান রয়েছে।

ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজান ভূইয়া সাংবাদিকদের বলেন, নিহত ইউছুপের ভাই তৌহিদ বাদি হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে। মামলায় চিহ্নিত ৭জন ও ১০-১৫ জন অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল সন্ধ্যায় তার বাড়িতে লাশ দাপন করা হয়েছে।

সেনা বাহিনীর খিরাম ক্যাম্পের সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার মো. দুলাল মিয়া বলেন, আমরা আছি পাহাড়ে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার কাজে। আমাদের কাজে পাহাড়ী-বাঙ্গালী অনেকে সহযোগিতা করে। তাই তাদের হত্যা করা হবে তা সমর্থন যোগ্য নয়। ইউছুপ হত্যাকান্ড জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত দুষ্কৃতিকারীদের আইনের আওতায় আনতে আমরা আন্তরিকতার সাথে কাজ করছি।

ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সব হত্যাকান্ড নিন্দনীয়। এই হত্যার ব্যাপারে বৃহস্পতিবার উপজেলা আইন-শৃংখলা সভায় নিন্দা জানানো হয়েছে এবং পুলিশকে কঠোর হস্তে দমনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি যাতে পাহাড়ী ও বাঙ্গালী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রুপ নিতে না পারে সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন সজাগ আছে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জনপ্রিয় হচ্ছে ‘তৈলাফাং’ ঝর্ণা

করোনার প্রভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল খাগড়াছড়ির পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্র। তবে টানা বন্ধের পর এখন খুলেছে …

Leave a Reply