নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » আয়ুর হাত ছেড়েছে যে বন্ধুটি

আয়ুর হাত ছেড়েছে যে বন্ধুটি

Sudirga-pic-pahar১২ মার্চ ২০১৩। প্রতিদিনকার মতো সকাল ১০টায় অফিসে এসে হাজির হয়েছি। অফিসে এসে প্রথমেই পিসি অন করে অনলাইন সংবাদপত্রগুলো পড়ে ফেলার অভ্যাস। তারপর কাজ শুরু হয়। তো সেদিন মাত্র কম্পিউটার খুলেছি। হঠাৎ বেজে উঠলো ফোন। সাধন বিকাশ চাকমা, আমাদের বাঘাইছড়ি প্রতিনিধির ফোন। আমি ফোন ধরে ওর গলা শুনে অভ্যাস বসে বললাম, আজ কি পাঠালেন? কোনো নতুন নিউজ। ইতস্তত করছিল সাধন। বললো, না দাদা। একটা খবর আছে। আপনার বন্ধু সুদীর্ঘ দা….
এর পরের কথাগুলো আমি আর শুনতে পেলাম না। কতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম আর হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠেছিলাম নিজেই বলতে পারবো না। আমার গল্পের সুবাধে অফিসের সহকর্মীরা কম বেশি চিনতেন সুদীর্ঘকে। সবাই স্তব্ধ।

২০০১ সালের কথা। আমি সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বেরিয়ে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিকেলসে যোগ দিয়েছি। খুঁজে পেতে পোস্টিং নিলাম রাঙামাটি। অনেকটা জোর করে। অফিসের সবাই বললো পাগল। হ্যা, তাই তো আমি। আমার যে পাহাড় ভালো লাগে! তো একদিন বাকশো পেটরা নিয়ে হাজির হলাম রাঙামাটি। হোটেল শাপলায় আমার অস্থায়ী আবাস। এখানে আসার আগে জেনেছিলাম রাঙামাটিতে আমাদের এক কমরেড আছে নাম সুদীর্ঘ। আমি বাসদের সঙ্গে তখন হালকা-পাতলা জড়িত ছিলাম। তাই একদিন হোটেল থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম বনরূপায়। সেখানে পিসিপির ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন একদল তরুণ। আমার পরিপাটি পোশাক, ছোট চুল দেখে সবাই কেমন সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছিল। তো রাস্তায় বসে থাকা ছেলেদের একজনকে বেশ ভারি গলায় শুধালাম এখানে সুদীর্ঘ চাকমা আছে? সে চমকে গিয়ে বললো, না নেই। দৃষ্টিতে সন্দেহ। বললাম তাকে পেলে বলবেন, বাসদের মুনির খোঁজ করেছে। সঙ্গে সঙ্গে উঠে ছেলেটি জড়িয়ে ধরলো আমাকে। সেই ছিল সুদীর্ঘ। আর এরপর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমরা ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলাম। পাহাড় থেকে চলে আসার পর সব সময় ওর জন্য দুশ্চিন্তা করেছি। শেষবার ২০১২ সালে বিজুতে ওর বাসায় যখন গিয়েছি তখনো চুকচুক’কে(ওর ছেলে) দেখিয়ে বললাম- আপনি না থাকলে ওর কী হবে? প্লিজ, নিজেকে নিয়ে একটু ভাবুন। হায়, কে জানতো আমার আশঙ্কা এভাবে সত্যি হবে।
সেদিনকার ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ১৭ মার্চ ২০১৩ তারিখে ছাপা হয় আলোকিত চট্টগ্রামে। কখনো ভাবিনি এই প্রতিবেদন আমাকে লিখতে হবে। বার বার কম্পিউটারের মনিটর ঝাপসা হয়ে আসছিল। সিট থেকে উঠে ওয়াশ রুমে গিয়ে চোখে পানি দিতে হয়েছে। আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে বুঝিয়েছি, এটা চাকরি। আমাকে লিখতেই হবে। সেই প্রতিবেদনটি তুলে দিলাম এখানে।

শান্তির জন্য লড়াই করে জীবন দিলেন সুদীর্ঘ

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে চলতে থাকা ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের বিরুদ্ধে বরাবরই উচ্চকণ্ঠ ছিলেন সুদীর্ঘ চাকমা (৩৮)। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে গত ২১ ফেব্রুয়ারি তাঁর সর্বশেষ স্ট্যাটাসটিও ছিল এই বিষয়ে লেখা। শান্তিবাদী মানুষটির এভাবে খুন হওয়া মানতে পারছে না পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দারা।
১২ মার্চ মঙ্গলবার লংগদুর দোজরপাড়া গ্রামে ঘাতকের গুলিতে নিহত হন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) রাঙামাটি জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক সুদীর্ঘ চাকমাসহ সংগঠনের চার নেতা-কর্মী। পার্বত্য চট্টগ্রামে চলতে থাকা সংঘাত-সহিংসতা বন্ধ করতে তৃণমূল পর্যায়ে জনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশ নিতে গিয়েছিলেন তাঁরা। অথচ সহিংসতার বলি হতে হলো তাঁদেরই। সুদীর্ঘ চাকমার স্ত্রী ও স্বজনেরা জানিয়েছেন এই তথ্য।
সুদীর্ঘ চাকমার শ্যালক অরুণদর্শী চাকমা মুঠোফোনে জানান, সম্প্রতি রাঙামাটি থেকে অপহরণের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে লংগদু গিয়েছিলেন সুদীর্ঘ। এমন দুর্গম জায়গায় যাওয়া তাঁর জন্য নিরাপদ নয় বলে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে সাবধান করেছিলেন। তবে তিনি ভাবতেন, শান্তির পক্ষে কাজ করছেন বলে তাঁকে কেউ আক্রমণ করবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার জন্য বহুদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন তিনি। অথচ তাঁকেই এভাবে মরতে হলো।
অরুণদর্শী চাকমা আরও জানান, গত বুধবার রাঙামাটিতে এসে পৌঁছায় সুদীর্ঘ চাকমার মরদেহ। এরপর লাশ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা চলে যান রাঙামাটির বন্দুকভাঙা গ্রামে। সেখানে ধর্মীয় রীতি অনুসরণে শেষকৃত্য হয় সুদীর্ঘ চাকমার। শোকে পাথর বনে যাওয়া সুদীর্ঘর মা বুদ্ধমালা চাকমা (৫৫) ও বাবা প্রভাতকুমার চাকমা (৫৭) প্রিয় সন্তানকে শেষ বিদায় জানান।
সুদীর্ঘর আট বছর বয়সী ছেলে ঐতিহ্য চাকমা গত মঙ্গলবারের পর থেকেই কোনো কথা বলছে না। কেবল বাবার ছবি দেখলেই ডুকরে কেঁদে উঠছে। সুদীর্ঘর স্ত্রী অরুমিতা চাকমা (৩৩) ঘটনার পর থেকে একাধিকবার জ্ঞান হারিয়েছেন। এমন ঘটনা ঘটবে তা আশঙ্কা করেছিলেন কি? গত শুক্রবার মুঠোফোনে এই প্রশ্ন করলে অরুমিতা বলেন, ‘হ্যাঁ। আশঙ্কা করেছি। ওকে অনেকবার নিষেধও করেছি রাজনীতি করতে। কিন্তু সে শোনেনি।’ তিনি বলতেন, ‘আমি মানুষের জন্য লড়ছি। শান্তির পক্ষের মানুষ আমি। আমার কোনো ক্ষতি কেউ করবে না।’
মৃত্যুর আধঘণ্টা আগে শেষবার ফোনে স্বামীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন অরুমিতা। সেদিনের কথা মনে করতে গিয়ে বললেন, ‘আমি চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। তাই ওকে ফোন করে বলেছি তাড়াতাড়ি চলে আসতে। আমার জন্য বেগুন ও তরমুজসহ নানা সবজি আনবে বলেছিল। এ মাসের ২৭ তারিখ ছেলের জš§দিনে নিজের হাতে বিরিয়ানি রান্না করবে এটাও জানাল। অথচ মানুষটাই ফিরল লাশ হয়ে।’
সুদীর্ঘ চাকমার মৃত্যুতে রাঙামাটির পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ শোকাহত। জনপ্রিয় এই তরুণ রাজনীতিবিদ ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যের চেতনায় বিশ্বাসী। এমনটা জানান কলেজ জীবনে তাকে কাছ থেকে দেখা একই কলেজের ছাত্র,সেই সময়কার ছাত্র ইউনিয়ন নেতা,সাংবাদিক ফজলে এলাহী। তিনি জানান, ২০০৭ সালে জনসংহতি সমিতি (সন্তু লারমা) থেকে বেরিয়ে এসে নবগঠিত জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা) দলে যোগ দেন সুদীর্ঘ। সেই থেকে নিজ শহর রাঙামাটি ছেড়ে খাগড়াছড়ি বসবাস করছেন তিনি। কবিতা লিখতেন সুদীর্ঘ। ভালো বক্তাও ছিলেন তিনি। এমন মেধাবী একজন মানুষের মৃত্যুতে জনসংহতির উভয় পক্ষের সমর্থকেরা শোকাহত হয়েছেন।
স্বামীকে হারিয়েছেন অরুমিতা চাকমা। তবে আর কেউ এভাবে খুন হোক তা চান না তিনি। অরুমিতা বলেন, ‘আমার স্বামী পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের অধিকার নিয়ে লড়তে গিয়ে জীবন দিয়েছে। আদিবাসীদের অধিকার আদায় না হলে তার এই আত্মত্যাগ বৃথা যাবে। পাশাপাশি মানুষটি সব সময় চেয়েছে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধ হোক। অন্তত তার রক্তের বিনিময়ে হলেও এই সংঘাত এখন বন্ধ করা উচিত।’

লেখক : সহসম্পাদক,দৈনিক প্রথম আলো ও সুদীর্ঘ’র বন্ধু

Micro Web Technology

আরো দেখুন

মৌলিক সুবিধাবঞ্চিত রামগড়ের গারোরা

পাহাড়ে গারোদের কষ্টের জীবন। খাগড়াছড়ির রামগড়ে দীর্ঘ বছর ধরে বসবাস করলেও নেই তাদের মৌলিক কোন …

Leave a Reply