‘আরাকান আর্মি’ কী চায়?

AAপ্রধানত রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও ইয়াবা পাচার এবং ওই দুই ইস্যুর সাদা-কালো মেঘে আচ্ছাদিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের আকাশে ‘আরাকান আর্মি’ অনেকটা হঠাৎ আলোর ঝলকানি হয়ে এসেছে। বলা বাহুল্য, নেতিবাচক অর্থে। যে কারণে ঢাকাই সংবাদমাধ্যমে বান্দরবানের থানচি উপজেলার মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বড়মোদক এলাকায় বুধবার বিজিবির একটি টহল দলের ওপর বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীটির কয়েকজনের অতর্কিতে হামলা নিয়ে খবরাখবরে তাদের নাম ছাড়া বিশেষ আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। যে কারণে সাধারণ নাগরিকের মধ্যে এই বিভ্রান্তি নিশ্চিত ছিল যে, এরা কি হালের রাখাইন বা প্রাচীন আরাকান ও চীন স্টেটে মোতায়েন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কোনো অংশ? মিয়ানমার তাদের বিভিন্ন রাজ্যের আন্তর্জাতিক সীমান্তে আলাদা নামে আলাদা সীমান্তরক্ষী মোতায়েন করে থাকে। যেমন মিয়ানমারের রাখাইন ও চীন রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তে মোতায়েন বাহিনীর নাম ‘বর্ডার গার্ড পুলিশ’ বা বিজিপি হলেও কারেন রাজ্য ও থাইল্যান্ড সীমান্তে মোতায়েন বাহিনীর নাম ‘বর্ডার গার্ড ফোর্স’ বা বিজিএফ। এরাও কি তেমন কোনো বাহিনী? আবার কোনো কোনো স্বায়ত্তশাসিত রাজ্যে প্যারামিলিটারি ফোর্স রয়েছে; আরাকান আর্মিও কি তেমন? নাকি ‘আরাকান আর্মি’ মধ্যযুগের আরাকান রাজ্যের ঐতিহ্য ধারণ করে গঠিত রোহিঙ্গাদের ‘আরাকান’ আর্মি?

ঢাকাই সংবাদমাধ্যমে এসব জিজ্ঞাসার নিশ্চিত জবাব তো ছিলই না; বরং কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম ভ্রান্তিবশত জানিয়েছিল যে, এরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সংশ্লিষ্ট চরমপন্থি গোষ্ঠী। একটি প্রতিবেদনে চোখে পড়ল, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সশস্ত্র গ্রুপ ‘আরএসও’ এবং আরাকান আর্মির মধ্যে ‘সমঝোতা’ রয়েছে। আদতে বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। আরাকান বা রাখাইন স্টেটে মুসলিম রোহিঙ্গা গোষ্ঠী নিয়মিতভাবে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, নিপীড়ন ও সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে জাতিগত বিদ্বেষের পাশাপাশি প্রায়শই আরাকান আর্মির নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। গত ডিসেম্বরেও আরাকান আর্মি ৩২ জন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মংডু টাউনশিপের কাছে আলেথান ক্যে গ্রাম থেকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। অপহৃতদের একজন কোনো রকমে পালিয়ে এসে জানিয়েছে, আটকদের থাইল্যান্ড নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিক্রি করে দেওয়ার জন্য।
বস্তুত রাখাইন রাজ্যে সংঘাতের পক্ষ যে সরলরৈখিকভাবে মুসলিম বনাম বৌদ্ধ নয়; রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বনাম মিয়ানমার সরকার নয়; নিরীহ রোহিঙ্গারা কেবলই মার খাচ্ছে_ এমন নয়। গত জুন মাসে অনলাইন ম্যাগাজিন ‘ইরাবতী’ আরাকান আর্মির ‘কমান্ডার-ইন-চিফ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল’ তুন মিয়াত নাইংয়ের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। সেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় অভিযোগ করেন যে, তার ভাষায় ‘বাঙালি’ জনগোষ্ঠী আরাকানি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কাজ করছে। মিয়ানমার আর্মি এসে রোহিঙ্গা গ্রামের খাদ্য ও আশ্রয় গ্রহণ করে। এও বলেন যে, তার কাছে নির্ভরযোগ্য খবর রয়েছে, মিয়ানমার আর্মি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য। তার কাছে যখন সুনির্দিষ্টভাবে রাখাইন রাজ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠী তথা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি প্রথমে বলেছেন, ‘আমরা এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে বাধ্য।’ কিন্তু তারপরই বলেছেন, ‘তবে সমাধান খুঁজতে গিয়ে আবেগের সঙ্গে দেখলে হবে না; প্রয়োজন হলে তাদের চরম পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হতে পারে।’ আর তারা কোনো অবস্থাতেই ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ’ লঙ্ঘিত হতে দেবে না। সাক্ষাৎকার গ্রহীতাকে এও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ‘এই সমস্যা’ (পড়ূন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বা মুসলিম) কেবল আরাকানের নয়; বঙ্গোপসাগর থেকে মালাক্কা প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে সমাধান খুঁজতে হবে ‘সর্বোচ্চ সতর্কতা’র সঙ্গে। যাতে করে কোনোভাবে ‘জাতীয় স্বার্থ’ ক্ষুণ্ন না হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, আরাকান আর্মির ‘জাতীয় স্বার্থ’ কী? মিয়ানমারের জাতীয় স্বার্থ? বিষয়টি ব্যাখ্যাযোগ্য। উইকিপিডিয়ার মতো অনলাইন উৎসে গেলে দেখা যাবে, আরাকান আর্মি গঠিত হয়েছে মাত্র সেদিন, ২০০৯ সালের এপ্রিলে। মাত্র ২৬ জন গেরিলা নিয়ে। তারা সবাই আরাকান আর্মি গঠনের আগে কাচিন ও কোকাং গেরিলা বাহিনীতে ছিল এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদী লড়াই করেছে। আরাকান আর্মির পক্ষে দাপ্তরিকভাবে দাবি করা হয় যে, বেসামরিক লোকজনসহ তাদের বাহিনীতে এখন দশ হাজারের বেশি লোক রয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি আরও দুই হাজারের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। মিয়ানমার সরকার অবশ্য আরাকান আর্মিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী নয়, বিচ্ছিন্ন একটি ছোট্ট দল হিসেবে দেখাতে চায়, যাদের গেরিলা ও সমর্থক সংখ্যা দুই থেকে চারশ’র বেশি নয়। যদিও স্বতন্ত্র সূত্রগুলো বলছে, আরাকান আর্মির গেরিলা যোদ্ধার সংখ্যা কমবেশি এক হাজার। এই গোষ্ঠীর লক্ষ্য হচ্ছে, রাখাইন বা আরাকান জনগোষ্ঠী নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্তা হবে। অন্য কথায় স্বাধীনতা। তারা মনে করে, আরাকানিরা স্বতন্ত্র জাতি। ব্রিটিশ শাসনামলে তাদের একদিক থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং অন্যদিক থেকে বার্মিজ জনগোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ফলে তাদের ‘জাতীয় স্বার্থ’ হচ্ছে বার্মিজ ও রোহিঙ্গামুক্ত আরাকানের স্বার্থ। আরাকান আর্মির কমান্ডার-ইন-চিফ মনে করেন, আরাকানের জনসাধারণও এই ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ। তিনি স্পষ্টতই বলেন_ ‘বার্মা থেকে কেউ এসে’ আরাকান শাসন করতে পারবে না। যদি অং সান সু চিও আরাকানে নির্বাচনে দাঁড়ান, তিনি হেরে যাবেন।
আরাকান আর্মির প্রধান যদিও স্বভাবতই জাতীয়তাবাদী আবেগের বশে এসব কথা বলছেন; আরাকানের স্বাতন্ত্র্যের বিষয়টি নিছক আবেগের বিষয় নয়। আরাকান আর্মি যদিও ২০০৯ সালে গঠিত হয়েছে; স্বাধীন আরাকানের স্বপ্ন মাত্র কয়েক বছর, এমনকি কয়েক দশকেরও নয়; অনেক প্রাচীন। ব্রিটিশদের দখলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত মিয়ানমারের বৃহদাংশ ও আরাকান আলাদা দেশ ছিল। আরাকানের স্বতন্ত্র সাহিত্য-সংস্কৃতি তো বটেই, মুদ্রা, এমনকি রাষ্ট্র ব্যবস্থাও আলাদা ছিল। মধ্যযুগে তো বটেই, খ্রিস্টপূর্ব আড়াই হাজার বছর আগেও আরাকান রাজ্য মিয়ানমারের রাজাদের বাইরে ভিন্ন রাজার অধীনে শাসিত হতো। বস্তুত এই অঞ্চল থেকে চলে যাওয়ার সময় ১৯৪৮ সালে প্রথমবারের মতো আরাকান তৎকালীন বার্মার সঙ্গে এক রাষ্ট্রভুক্ত হয়।
আরাকানে বাকি বার্মা থেকে স্বতন্ত্র রাষ্ট্রব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক আবহ ও নৃতাত্তি্বক ভিন্নতা গড়ে ওঠার মূল কারণ ভৌগোলিক। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে শুরু করে উত্তরে ভারতের মণিপুর পর্যন্ত পুরো এলাকাকে বাকি মিয়ানমার থেকে বিচ্ছিন্ন করে প্রাকৃতিক প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে আরাকান পর্বতমালা। এর দৈর্ঘ্য কমবেশি এক হাজার কিলোমিটার, সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ব্রিটিশ আমলের মাউন্ট ভিক্টোরিয়া বা হালের নাত মা টংয়ের উচ্চতা ১০ হাজার ফুটের বেশি। এই পর্বতমালার কারণেই আরাকান সমুদ্র উপকূলও মিয়ানমারের বাকি তটরেখা থেকে বিচ্ছিন্ন। আরাকান পর্বতমালার কারণেই চীনা-বার্মিজ যোদ্ধা ও রাজারা কখনও আরাকানে আগ্রাসন চালাতে পারেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও চীন ও মিয়ানমারসহ গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জাপানের জয়রথ আরাকান পর্বতমালায় এসে থমকে গিয়েছিল।
এসব এখন অতীত। বর্তমান হচ্ছে, আরাকান আর্মি সেই স্বাতন্ত্র্য পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছে। যদিও সেই আরাকানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে মুসলিম জনগোষ্ঠী। সুলতানি ও মোগল আমল থেকেই তারা দফায় দফায় সেখানে বসতি স্থাপন করেছে। তারও আগে আরব বণিকদের সঙ্গেও আরাকানে গিয়েছে মুসলিম জনগোষ্ঠী। কিন্তু আরাকান আর্মি সেটা স্বীকার করতে চায় না। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে তাদের বিরোধ থাকলেও একটি বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে; তা হচ্ছে রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশকারী। বস্তুত মিয়ানমার সরকার ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আরাকান আর্মি উভয়ই ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি স্বীকার করতে নারাজ। তাদের সাফ কথা_ এরা ‘বাঙালি’। বাংলাদেশ থেকে এসেছে।
রোহিঙ্গাদের বাঙালি আখ্যা দিলেও আরাকান আর্মি এখনই ঠিক বাংলাদেশকে চটাতে চায় না। প্রত্যক্ষ প্রতিপক্ষ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে পশ্চাদভাগ নিরাপদ রাখতে চায়। যে কারণে বিজিবি টহল দলের ওপর প্রথমে হামলা চালালেও পরে নির্বিবাদে পিছু হটেছে। কেবল পিছু হটেনি, ইরাবতী ম্যাগাজিনের কাছে আরাকান আর্মির ডেপুটি কমান্ডার-ইন-চিফ বলেছেন, ভুল বোঝাবুঝির কারণে এই সংঘাত হয়েছে। দ্রুত ভুল বুঝতে পেরে তারা সরে গিয়েছে। এমনকি এজন্য দুঃখ প্রকাশ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠিও দিতে চান তারা। তারা বলছেন, বিজিবি বা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করলে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হবে।
বাংলাদেশ কী করবে? আরাকান আর্মির এই মনোভাব সম্পর্কে যোগাযোগ করা হলে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ সমকালকে বলেন, আরাকান আর্মির সঙ্গে আলোচনার প্রশ্নই ওঠে না। আলোচনা হলে তা হবে বুলেটের মাধ্যমে। সীমান্তে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। (সমকাল, ৩০ আগস্ট, ২০১৫)। এটাই যে সঠিক অবস্থান, সন্দেহ নেই। আরাকানের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক যত প্রাচীন ও ঘনিষ্ঠই হোক না কেন; সেখানকার অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে যত দূরে থাকা যায়, ততই মঙ্গল। সর্বার্থেই।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক

(দৈনিক সমকালে প্রকাশিত লেখাটি পত্রিকাটির প্রতি কৃতজ্ঞতাসহ পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম এর পাঠকদের জন্য পুন:প্রকাশ করা হলো। )

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কারাতে ফেডারেশনের ব্ল্যাক বেল্ট প্রাপ্তদের সংবর্ধনা

বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশন হতে ২০২১ সালে ব্ল্যাক বেল্ট বিজয়ী রাঙামাটির কারাতে খেলোয়াড়দের সংবধর্না দিয়েছে রাঙামাটি …

Leave a Reply