নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাঙ্গিকতা ও রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনা

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাঙ্গিকতা ও রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনা

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছোট নদী’ কবিতাটি পড়েনি মনে হয় এমন কেউ নেই। এ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের ছোট নদীর বর্ণনাটি ছিল মূলত বৈশাখের খরতাপেও হাঁটু পরিমান জল থাকে নদীতে। এতে কবিগুরু মানুষের সামগ্রিক জীবনের সাথে নদীর প্রবহমানতা যে একই সূত্রে গাঁথা তারই একটি সুন্দর অনুষঙ্গ তুলে ধরেছেন। সময়ের বাস্তবতায় ছোট কিংবা বড় নদীতে এখন বৈশাখ মাসে হাঁটু পরিমান জলের প্রবাহ খুঁজে পাওয়া কল্পনাতীত। প্রসঙ্গটা টানার মূল লক্ষ্য কিন্তু সেকালের নদী কিংবা এখানকার বৈশাখের নদীর অবস্থার তুলনা করা নয়। বরং রবি ঠাকুরের জীবনমূখী ভাবনা যে সামান্য অনুষঙ্গে ব্যাপক হয়ে উঠতে পারে। রবীন্দ্র জীবনমূখী দর্শনে নদীর সাথে প্রকৃতি ও মানুষের জীবনের প্রবহমানতা তাঁর সাহিত্যে ব্যাপকভাবে ফুটে উঠেছে।
প্রসঙ্গটি টানলাম এ জন্যই যে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কিংবা অর্জিত শিক্ষা জীবনমূখী কি না বোঝাতে। সেই ব্রিটিশ থেকে পাকিস্থান পেরিয়ে বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশের ৪০ বছরের বেশি সময় বয়ে গেছে। এখনই আমাদের প্রজন্মকে পরিপক্ক মননশীল অর্থাৎ জীবনমূখী শিক্ষা ব্যবস্থায় আনা সম্ভব হয়নি। আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় রয়েছে হরেক রকম শিক্ষা কারিকুলাম। সরকারী বেসরকারী নানামূখী শিক্ষার ফলে আমাদের প্রজন্ম জ্ঞান অর্জনের পথে খেই হারিয়ে ফেলছে। এক সময়ে টেক্সট বই না পড়ে শিক্ষার্থীরা মূলত বাজারের নোট বই কিংবা গাইড কোম্পানীর সহায়ক বই মুখস্থ করে পরীক্ষার সফলতার চিন্তা করতো। এসব নোট বইয়ের মুখস্থ শিক্ষা কতটুকু জ্ঞানমূখী ও বাস্তবসম্মত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মুখস্থ ও নকল প্রবণতার পরিবর্তন আনতে হলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যোগ হয়েছে সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা। বলা হচ্ছে, বাস্তবে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি একটি আধুনিক মননশীল শিক্ষার পদ্ধতি।
সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রতিটি বিষয়ে ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় ৬০ নম্বর থাকবে সৃজনশীল প্রশ্ন। জ্ঞান, অনুধাবন, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা চারটি প্রশ্নের মোট ১০ নম্বরের প্রশ্নের উত্তর লিখতে শিক্ষার্থীকে অবশ্যই টেক্সট বইয়ের নির্ধারিত বিষয়টি ভালোভাবে পড়া থাকতে হবে। শিক্ষার্থীরা এ সব প্রশ্নের উত্তর সাজাতে পরিপূর্ণ যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারবে তখনই, যখন শিক্ষার্থী টেক্সট বইয়ের নির্ধারিত ভালোভাবে আত্মস্থ করতে পারবে। মুখস্থ বিদ্যা কিংবা নোট বইয়ের অনুকরনে পড়ার পরিবর্তন আনতে সৃজনশীল এ পদ্ধতির শিক্ষা কারিকুলামে বলা আছে, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়নে কোন অবস্থাতেই নোট বইয়ের অনুকরণ কিংবা অনুসরণ করা যাবে না। প্রাসঙ্গিক উদ্দীপক তৈরি করে উল্লেখিত ৪ টি প্রশ্নের ১০ নম্বরে শিক্ষার্থীকে লব্ধ জ্ঞানের সৃজনশীলতা প্রকাশ ঘটাতে সুযোগ দিতে হবে। অন্যদিকে ৪০ নম্বরের বহুনির্বাচনী প্রশ্নের প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষার্থীর জ্ঞানের পরিশীলিত অবস্থার যাচাই সম্ভব হবে যদি সে টেক্সট বইটি পড়ে। এতে শিক্ষার্থী মুখস্থ বিদ্যার বাইরে এসে স্বকীয় ভাবনায় নিজেকে সৃজনশীল করে তুলতে পারবে।
রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিক্ষা ভাবনা সম্পর্কে বলেছেন, মুখস্থ শিক্ষা অর্থাৎ অবিকল শিক্ষা এক ধরনের নকলেরই পরিপূরক। আমাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলামে সৃজনশীল ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে শিক্ষার্থীর মনোগত শিক্ষায় প্রবেশ করাতে সম্ভব। তবে জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণী এ শিক্ষা পদ্ধতিকে আরও সুদূরপ্রসারী বাস্তবতায় নিয়ে যেতে যে ধরণের আগাম প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন ছিল তার বাস্তবে নেই। যাঁদের হাত দিয়ে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতিটি শিক্ষার্থীর মনোগত শিক্ষায় প্রবেশের কর্মটি বাস্তবায়ন করানো হবে তারা অর্থাৎ শিক্ষকরা এখনও এ বিষয়ে পরিপক্ক নন। তাঁদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়নি। বলা যায়, মাধ্যমিক ও কলেজ শিক্ষকদের নামমাত্র ৩ দিনের ট্রেনিং দিয়েই সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তাও অনেক শিক্ষক এখনও সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি বিষয়ে কোন ধারণাও পায়নি। অন্যদিকে প্রাথমিক শিক্ষকদের এ বিষয়ে কোন প্রকার স্বল্প কিংবা দীর্ঘ মেয়াদী প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা হয়নি। শিক্ষকদের এ বিষয়ে ধারণা না দিয়েই সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চালু কতটুকু সুদূরপ্রসারী হতে পারে? বাস্তবে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। তবে এটা ঠিক অল্প সময়ে পরিবর্তিত এ পদ্ধতি সম্পর্কে ফলপ্রদ আলোচনা বা পরিপূর্ণ মন্তব্য করার সময় এখনও যথাযথ সময় আসেনি।
কিন্তু এরইমধ্যে যা স্পষ্ট হচ্ছে, তা অপরিপক্কতার কারণেই এ সৃজনশীল পদ্ধতি এখন গাইড কোম্পানীদের হাতে শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রের বিস্তার ঘটাচ্ছে। আগের মতোই সৃজনশীল পদ্ধতি মুখস্থনির্ভর হয়ে উঠছে। গাইড বিক্রেতাদের দৌরাত্মে সৃজনশীল শিক্ষা বাস্তব ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বাজারে বিভিন্ন গাইড কোম্পানীর সহায়ক বই শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বইয়ের মধ্যে প্রবেশে বাধা তৈরি করছে। দেখা যাচ্ছে, গাইড কোম্পানীর শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণের কাছে হার মানছে শিক্ষকরাও। ভালো ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের নামের তালিকায় সাজিয়ে তাঁদের দিয়ে স্কুল কলেজে বই বিক্রির ক্ষেত্র তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রে গাইড কোম্পানীর কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে শিক্ষকরা তাদের নির্ধারিত সহায়ক (নোটবই) শিক্ষার্থীদের কিনতে বাধ্য করাচ্ছেন। এতে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় নির্ধারিত বই থেকে প্রশ্ন করায় ছাত্র ছাত্রীরা আবার সেই পুরানো মুখস্ত বিদ্যার দিকে ধাবিত হচ্ছে। ফলে সৃজনশীল পদ্ধতির সুফল শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না।
ভাবতে অবাক লাগে, সৃজনশীল পদ্ধতির শিক্ষা একটি আধুনিক ও বাস্তবসম্মত হলেও যাঁরা এর রূপকার সেই শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের এখনও সেই বিষয়ে হাতে কলমে শিক্ষা প্রশিক্ষণ দিতে না পারলে প্রচলিত শিক্ষার আমূল পরিবর্তন আনা অসম্ভব। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাইয়িদ স্যার সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতিকে যুগোপযোগী হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের মানসিকতায় বিকাশ ঘটাতে মূলত পাঠ্য বইয়েই তাকে প্রবেশ করতে হবে। নোট বই কোন অবস্থায় পরিপূর্ণ সহায়ক বই হতে পারে না। তবে প্রশ্ন থাকে যে, দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা মুখস্ত বিদ্যার দৌরাত্ম গোছাতে সৃজনশীল পদ্ধতিকে বাস্তবে রূপ দিতে কিছু আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
যুগে যুগে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কর্মের জন্য অর্থাৎ সার্টিফিকেট প্রাপ্তির লক্ষ্যেই শিক্ষা লাভ মূল লক্ষ্য হয়ে আসছে। নির্ধারিত সময় সিলেবাস শেষে পরীক্ষা অন্তে একটি সার্টিফিকেটই তার কর্ম যুদ্ধে ঝাঁপ দেয়ার যাত্রাপথকে সুপ্রশস্ত করে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে শিক্ষার যে বিশাল আয়তন অর্থাৎ শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষার্থীর জীবনকে আনন্দ বেদনার সাথে প্রাপ্তির আত্মপ্রকাশ ও আত্মপ্রসাদের রূপ সৃষ্টির পথে এ শিক্ষা কোনো কাজে আসছে না।
শিক্ষা ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, শিক্ষা লাভের পথে যদি শৃঙ্খলা—সৌন্দর্য্য ও সুষমার সত্যিকারের সংযোগ স্থাপন করা না যায় তবে জীবন উপযোগী শিক্ষা লাভ অসম্ভব। এ জন্য শিক্ষা সব সময়ই আর্দশ ও রসসমৃদ্ধ হতে হবে। শিক্ষক শিক্ষার্থীকে যা শেখাচ্ছেন তার মধ্যে শিক্ষার্থী যদি নতুন রস আস্বাদন করতে না পারেন তবে, সেই শিক্ষা জীবনমূখী শিক্ষার আওতায় আসতে পারে না। এ জন্য রবীন্দ্রনাথ বার বার মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের প্রতি বেশি জোর দিয়েছেন। শিক্ষকদের রসের ভাবময়তায় শিক্ষার্থীর মননশীল চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে পারে। যে শিক্ষার মধ্যে আনন্দ নেই, যে শিক্ষা রসের ঐকতান সৃষ্টি করতে পারে না, সে শিক্ষা চিন্তাশক্তির সমাবেশস্থল হতে পারে না। টেনেটুনে পরীক্ষায় পাস করা অথবা ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে বিদ্যালয়ের মাঠ পাড়ি দিয়ে সার্বজনীন জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। শিক্ষাগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, শিক্ষার্থীর শিক্ষা গ্রহণের সাথে অন্তর—বাহির, নানান বর্ণ ও গন্ধ, পৃথিবীর বিচিত্র গতি ও গীতির মনোযোগ স্থাপন জরুরী। তিনি মনে করতেন, শিক্ষা হবে মানুষের জীবনের আশ্রয়স্থল। কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষার গতি প্রকৃতিতে যেন রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনার সামঞ্জস্যতা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লংগদুতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিএনপি’র প্রচারপত্র বিতরণ

রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতামূক প্রচারণা ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার …

Leave a Reply