নীড় পাতা » পাহাড়ের রাজনীতি » ‘ আমার দরজা পাহাড়ী বাঙালি সবার জন্য সবসময় খোলা ’

‘ আমার দরজা পাহাড়ী বাঙালি সবার জন্য সবসময় খোলা ’

usataon-cover-interviewদশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে আওয়ামী লীগ ও তার শরিক দলগুলোর নিরংকুশ বিজয়ের মধ্যেও যে একটিমাত্র আসনে দলটি পরাজিত হয়েছে আঞ্চলিক দল সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে সেই আসনটিই হলো পার্বত্য রাঙামাটি। জাতীয় সংসদের ২৯৯ নং সংসদীয় এই আসনটিতে নির্বাচনীকালিন সরকারের পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী দীপংকর তালুকদারকে ১৮ হাজার ৮৫২ ভোটে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছেন সাবেক গেরিলা নেতা উষাতন তালুকদার। সম্প্রতি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ শেষে রাঙামাটি ফিরেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাঙামাটি শহরে তার আঞ্চলিক পরিষদ রেস্ট হাউজের বাসায় বসে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম এর পাঠকদের কাছে তুলে ধরেছেন সমসাময়িক নানা বাস্তবতা সম্পর্কে নিজের অবস্থান ও পরিকল্পনা।

সাক্ষাৎকারের শুরুতে নিজের বিজয়ের পরবর্তী অনুভূতি জানাতে গিয়ে উষাতন তালুকদার বলেন,-‘বিজয়ী হয়ে ভালোই লাগছে,যেভাবে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাকে গ্রহন করেছে,এতে আমি ভীষণ অনুপ্রাণিত হচ্ছি,আবার এটাও ভাবছি জনগণের প্রত্যাশার গুরুদায়িত্ব আমার কাঁধে এসে পড়েছে,এটাও ভাবনার বিষয়। জনগণের এই অনুভূতি মনে রেখে আমি যেনো সততার সাথে জনগণের সেবা করতে পারি,সেটাই আমার সবসময় মনে থাকবে এবং আমি জনগণের কাছে দোয়া ও আশীর্বাদ চাইছি যেনো ভালোভাবে জনগণের সেবা করতে পারি।’

জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে কি বক্তব্য রাখবেন এমন প্রশ্নের জবাবে উষাতন তালুকদার বলেন,প্রথম অধিবেশনে বক্তব্য রাখার সুযোগ পেলে নতুন হিসেবে,এখানকার আইনশৃংখলা ও উন্নয়নের বিষয় এবং এখানে যাতে সম্প্রীতি বজায় থাকে,যাতে এখানে স্থিতিশীলতা থাকে,তার উপর ভিত্তি করেই আমি সংসদে আমার বক্তব্য উপস্থাপন করব।’

স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে জনগণের জন্য কি করতে পারবেন বলে মনে করেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জনগণের সেবা করা কিংবা অর্পিত গুরু দায়িত্ব পালন করা খুব কঠিন বিষয়। তা সত্বেও আমার বিশ্বাস,সংসদে অন্যান্য যে সদস্যরা থাকবেন,তারা এবং সরকারের আন্তরিক সহযোগিতা পাবো এবং ওনাদের সহযোগিতা নিয়েই এলাকার মানুষের সেবা করতে পারবো বলে আমি বিশ্বাস রাখি।’usatan-talukder-02

নিজের ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে উষাতন তালুকদার বলেন,‘আমার একটা আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে যে,নির্বাচনকালে আমি যেসব কর্মসূচী তুলে ধরেছি,জনগণ তা গ্রহণ করেছে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে বাতাবরণ তৈরি হয়েছে,আমি মনে করি জনগণের আমার উপর আস্থা ও বিশ্বাস আছে এবং আমি জনগণের প্রতি আহ্বান রাখবো,আমার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রেখে আমাকে সহযোগিতা করুন, আমি কাজের মাধ্যমে বাস্তবে প্রমাণ দিয়ে দেখাবো আমি একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে,সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করেই আমি এখানে উন্নয়ন করতে চাই এবং আমি এটা করতে পারবো বলেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’

উষাতন তালুকদার বলেন, ‘আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী,যদিও জেএসএস সমর্থিত। আমি কোন দলের নই,স্বতন্ত্র। আমি অসাম্প্রদায়িক,গনতান্ত্রিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়েই তো এগোচ্ছি। সরকারের সাথে তেমন দুরত্ব থাকবে বলে আমি মনে করিনা। সরকারের সাথে সহযোগিতা রেখেই কাজ করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। আমি আশা রাখবো, সরকার আমার প্রতি,আমার এলাকার প্রতি সহৃদয় থাকবে,এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজিত সমস্যার স্থায়ী সমাধানের ক্ষেত্রে সরকার এগিয়ে আসবে।’ustan-talukder-03

তিন পার্বত্য জেলা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে উষাতন তালুকদার বলেন,আমরা ধারণা হয়েছে,যারা এবার বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি থেকে নির্বাচিত হয়েছে,ওনারা পারস্পরিক সহযোগিতা রেখেই কাজ চালাবেন এবং এক্ষেত্রে তিন এমপির মধ্যে সমন্বয় রেখেই কাজ হবে বলে আমি আশাবাদী। আর বিশেষ করে জেলা পরিষদ যদি পুনর্গঠন করা হয় কিংবা পার্বত্য এলাকার যেকোন কাজের ক্ষেত্রে আমি একজন স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে,সর্বক্ষেত্রে আমারও মতামত নেয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি এবং তা নেয়া হবে বলেও আমি বিশ্বাস রাখতে চাই।

নতুন প্রতিমন্ত্রীর সাথে কথাবার্তা হয়েছে জানিয়ে উষাতন তালুকদার বলেন, ওনাকে বেশ ইতিবাচক বলেই আমার মনে হয়েছে। সরাসরি আলাপ হয়েছে,ফোনেও আলাপ হয়েছে,শপথগ্রহণের সময়ও আলাপ হয়েছে,বঙ্গভবনে মন্ত্রীসভার শপথের সময়ও দেখা হয়েছে। আমি আশাবাদি,আমরা মিলেমিশে কাজ করতে পারবো। লেট আজ হোপ ফর দ্য বেস্ট…

পাহাড়ের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িকতার অবসান হবে কিংবা সাম্প্রদায়িকতার কবর রচনা হবে,এটা আমিও চাই,কিন্তু বিষয়টা তো খুউব জটিল। তবে আমি মনে করি,সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ার ক্ষেত্রে আমাকে ভরসা করে জনগণ আশাবাদী হয়েছে,জনগণের এই আস্থাকে সাথে নিয়ে আমি কাজ করলে অনেক ক্ষেত্রেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উন্নতি সাধন করা সম্ভব হবে। ’

পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে নিজের অবস্থান সম্পর্কে নবনির্বাচিত এই সংসদ সদস্য বলেনম,‘চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি আমি সংসদে তুলে ধরব,সরকারের যারা পলিসি মেকার,তাদের আমি বোঝানোর চেষ্টা করবো,পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা অবশ্যই সমাধান করা উচিত,রাষ্ট্রীয় স্বার্থে,দেশের স্বার্থে,জনগণের স্বার্থে। যথাযথভাবে এটাকে চিহ্নিত করা ও উপলদ্ধি করা দরকার। তাই সংসদে বক্তব্য তুলে ধরা,রাজপথে আন্দোলনের পাশাপাশি নীতি নির্ধারনি মহলে আমি বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করবো,যাতে সবার সহযোগিতা পাওয়া যায়।’

তার নির্বাচিত হওয়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিরা চলে যেতে হবে,এমন প্রচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন,‘যদি কেউ এভাবে অপপ্রচার করে থাকেন,এটা ডাহা মিথ্যা। আমি রাঙামাটির জনগণকে আহ্বান রাখবো,আপনারা শান্ত থাকবেন,আমার উপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখবেন। যেকোন সময় কোন সমস্যা দেখা দিলে আমার সাথে, প্রশাসনের সাথে জরুরী ভিত্তিতে আলাপ করে নিবেন,কোন অবস্থাতেই কোন সাম্প্রদায়িক উস্কানি বরদাশত করা হবেনা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য আমি প্রশাসনকে সাথে নিয়ে বিহিত ব্যবস্থা করব। আমার দরজা পাহাড়ী বাঙালি সবার জন্যই সবসময় খোলা থাকবে।

পাহাড়ে এখনো শান্তি ফিরে আসে নাই মন্তব্য করে উষাতন তালুকদার বলেন, সরকারের দৃষ্টিভঙ্গী এমন হওয়া উচিত,বিষয়টিকে মানবিকভাবে দেখা,বাস্তবতা উপলদ্ধি করা।

নির্বাচন ও জনপ্রত্যাশা সম্পর্কে তিনি বলেন, সারাদেশে,সমতলে কেমন নির্বাচন হয়েছে আমি জানিনা,কিন্তু পাহাড়ে নির্বাচনী আমেজ ছিলো,জনগণের বিপুল অংশগ্রহন ছিলো, এবং গণ জননত মানুষ দিয়েছে। ভোটের মাধ্যমে জনগণ ওনাদের মতের প্রতিফলন ঘটিয়েছে,আশা করি সরকার সেই জনগণের প্রতি সম্মান রেখে,মতকে মূল্যায়ন করে সেইভাবে এগোবেন।

সবশেষে উষাতন তালুকদার বলেন,‘আমি মনে করি এবং বিশ্বাস করি,আমাদের প্রধানমন্ত্রী,বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা,সর্বতোভাবে একজন সত্যিকারের জননেত্রী। ওনি যোগ্যতা,দক্ষতার সাথে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, ভবিষ্যতেও তিনি সেভাবে এগোবেন বলে আমার বিশ্বাস।’

…..সাক্ষাতকার নিয়েছেন পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম এর সম্পাদক ফজলে এলাহী,সাথে ছিলেন পাহাড় টীমের সদস্য ইয়াছিন রানা সোহেল,শংকর হোড়,সৈয়দ হেফাজত উল বারি সবুজ। ছবি তুলেছেন শংকর হোড়

Micro Web Technology

আরো দেখুন

বেইলি সেতু ভেঙে রাঙামাটি-বান্দরবান সড়ক যোগাযোগ বন্ধ

রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলায় রাঙামাটি-বান্দরবান প্রধান সড়কের সিনামা হল এলাকার বেইলি সেতু ভেঙে পাথর বোঝাই ট্রাক …

Leave a Reply