নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » আদিবাসীদের বিজু ও সাংস্কৃতিক সংকট

আদিবাসীদের বিজু ও সাংস্কৃতিক সংকট

হাটি হাটি পা পা করে গুহাবাসী মানব আজ কম্পিউটার যুগে প্রবেশ করেছে। পরাধীন জাতি স্বাধীনতা অর্জন করে স্বাধীন —সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করেছে। পুরোনো দিনের প্রকৃতি নির্ভর জীবন ছেড়ে বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ জীবন—যাপন শুরু করেছে। এমনি এক সময়ে শিল্প—সংস্কৃতি সচেতন মানুষ নানা আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সভ্যতার গোড়াপত্তন করেছে। যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত সংস্কৃতিবান হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। মানব সভ্যতার বিকাশের এই পথ ধরে ভারত উপমহাদেশে বাংলা ও অন্যান্য সংস্কৃতির পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জাতি গোষ্ঠীর সংস্কৃতিও এগিয়ে চলেছে। বাংলার “বারো মাসে তেরো পার্বন” হচ্ছে সেই বিকশিত সংস্কৃতির মূর্ত রূপ। বাংলার তেরো পার্বনের মধ্যে বছরের শেষ ও নতুন বছরের শুরুতে পালিত হয় চৈত্র সংক্রান্তি। তেমনি বিজুও হচ্ছে তেরো পার্বনের অনুুুুুরূপ আদিবাসী জুম্মদের একটি ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও জাতীয় উৎসব। যে উৎসবের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের পূর্ব পুরুষদের জীবনযাত্রা, সাহিত্য সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতিফলন ঘটে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনপদে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসুক, বিসু ও বিহু নামে এই উৎসব উদ্যাপিত হয়। বাংলা পুরনো বছরে, চৈত্র মাসের শেষ দু’দিন আর নববর্ষের প্রথম দিন, পহেলা বৈশাখ এই তিন দিন ব্যাপী চলতে থাকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের বিজু আয়োজন। কালের বিবর্তন এবং পুরাতন নতুনের সন্ধিক্ষণে বিজুর মাধ্যমে পুরোনো বছরকে বিদায় আর নতুন বছরকে সাদর সম্ভাষণ জানায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা। ফূল বিজু, মূল বিজু ও গজ্যেইপজ্যা দিন— এই তিন পর্বে পালিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের বিজু।
ফুল বিজু দিনে আদিবাসীদের ছোট্টরা পাখী ডাকা ভোরে পাখীদের সাথে জেগে উঠে। জুড়ে দেয় কলরব। সবার আগে কে প্রথম প্রভাতের ফুলটাকে তুলে আনতে পারবে সেরকম প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে। ফুল গাছের তলে তাদের কোলাহল আর বিজু পাখীর কলকাকলী মিশে গিয়ে একাকার হয়ে যায়। কাঙ্খিত ফুল সংগ্রহ শেষ হয়ে গেলে এই ছোট্টরা ফুল ভাসানোর জন্য যার যার ঘাটের দিকে চলে যায়। ঘাটে পৌঁছে সবুজ কলা পাতার উপর জোড়া জোড়া ফুল সাজিয়ে হাত জোড় করে একাগ্রচিত্তে মা জলদেবীর কাছে যার যার মতো প্রার্থনা করে জলে ফুল ভাসায়। এটাই বিজুর প্রথম প্রহরে প্রথম পর্বের অনুষ্ঠান। এই ফুল ভাসানো কর্মসূচীর মাধ্যমেই বিজুর শুভ সূচনা হয়ে যায়।
শৈশবে আমিও ছোট্টদের মতো করতাম। প্রার্থনা করতাম আমরাও যেন ফুলের মতো সুন্দর জীবন গঠন করতে পারি। ভোরে স্নান করার পর নূতন বছর যাতে সব দিক থেকে ভালো খবর নিয়ে আসে সেরকম বুক ভরা প্রত্যাশা নিয়ে বাবা—মা ও গুরুজনদের প্রণাম করি। আজ বিভিন্ন বয়সী ও পেশাজীবি মানুষের কাছে বিজুর এই অনুভূতি কিছুটা ভিন্নতর হয়েছে। গ্রামাঞ্চল আর শহরাঞ্চলের বিজু আয়োজনের মধ্যে কতেক ভিন্নতা এসেছে। বিত্তবান মানুষ এবং বিত্তহীন সানুষের মধ্যে আর্থিক অবস্থা অনুসারে বিজু আয়োজন ও উপভোগের মধ্যে কিছুটা তফাৎ দেখা দিয়েছে। তা সত্বেও বিজু অনুভূতি সবার কাছে সমান। বিজু হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের জীবন দর্শন। বিজু আদিবাসীদের পিছনে ফেলে আসা অতীতকে নাড়া দেয়। আদিবাসীদের তরুণ প্রজন্ম তাদের পূর্ব পুরুষদের জীবন সংগ্রামের চিত্র থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে। যা আগামী দিনে চলার পথ দেখায়।
বিজু আদিবাসী জুম্মদের ঐক্য, সংহতি ও সংস্কৃতির প্রতীক। বিজু দিনে দুঃখময় অতীতকে ভুলে অনাগত দিনে সুখ সমৃদ্ধি কামনায় কুশলাদি বিনিময় হয়। কনিষ্ঠরা গুরুজনদের প্রণাম জানায় আর গুরুজনরা দিলখোলা আশীর্বাদ করে। নদী থেকে পবিত্র জল তুলে এনে আদিবাসী তরুণী ও মহিলারা পূণ্যার্জনের জন্য বটবৃক্ষের গোড়ায় জল ঢালে। আর বয়স্ক গুরুজনদের গোসল করায়। স্নানের জলে সিক্ত দেহমন যেভাবে জুড়িয়ে যায় অনাগত দিনেও সেই তরুণী ও মহিলাদের জীবনে যাতে অনাবিল সুখ—শান্তি বিরাজ করে, গুরুজনরা সেই আশীর্বাদ করেন। প্রসঙ্গত বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের যে সমস্ত গ্রাম পাহাড় চূড়ায় কিংবা জলের উৎস থেকে দূরে সেখানে ঘাটে নেমে নেমে নিয়মিত গোসল করা বয়স্ক ও বুড়োদের পক্ষে খুবই কষ্টকর। তাই বিজু দিনে বয়স্কদের গোসল করানোটা একটা পূণ্য কার্য হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। বিজু দিনে ছায়া সুনিবিড় বিশাল বটতলা, আমতলা, কিংবা সদ্য ফসল উঠে যাওয়া ধান ক্ষেতের খোলা মাঠে আদিবাসীদের পুরোনো দিনের ঘিলা—খেলা, নাদেং—খেলা, বলি খেলা, জল—খেলা ইত্যাদি ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উপভোগ্য হয়ে উঠে; পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জুম্মদের বিজুর সাধারণ উৎসব। বিজু উপলক্ষে বিভিন্ন অঞ্চলে খেলাধুলা ও বর্ণাঢ্য নানা অনুষ্ঠান আদিবাসী জাতি গোষ্ঠীসমূহ যার যার সুবিধামতো দিন—ক্ষণ ঠিক করে সাজায়।
মূল বিজু দিনে পাঁচন তরকারী এবং আদিবাসী পিঠা ও অন্যান্য খানা—পিনা পরিবেশন সহকারে লবিয়ত, আদর—আপ্যায়ন হচ্ছে বিজুর প্রধান আকর্ষণ। মূল বিজু দিনে বেলা বাড়ার সাথে সাথে বিজু আপ্যায়ন পর্ব শুরু হয়ে মধ্য রাত পর্যন্ত চলতে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সমাজ পিতৃপ্রধান পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হলেও রক্ষণশীল নয়। বিজু দিনে ঘরে ঘরে বিজু অতিথিদের আদর আপ্যায়ন কাজের অধিকাংশ দায়িত্ব আদিবাসী নারীরাই পালন করে থাকে। ফুল বিজুর দিনে সকালে নদীতে ফুল ভাসানো, সন্ধ্যায় বাড়ীতে, ঢেঁকিশালে, গো—শালায়, মন্দিরে বিজুর মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো হয়। বিজু দিনে বৌদ্ধ মন্দিরে একক কিংবা যৌথভাবে বুদ্ধ পূজা আয়োজন এবং ভিক্ষু সংঘকে পিণ্ডদান ইত্যাদি আনুষ্ঠানিক মাঙ্গলিক কার্যাদিও আদিবাসী নারীরাই সম্পন্ন করে থাকে।
বিজু দিনে আপ্যায়নের জন্য খাবারের সমস্ত আইটেম গৃহকর্ত্রী বিজুর পূর্বাহ্নেই সাজিয়ে রাখে। এ সব উপকরণ সংগ্রহে তাকে সহযোগিতা দিয়ে থাকে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। কোন কোন সময় বিজুর পাঁচন তরকারী প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী আদিবাসী মহিলারা যার যার ঘর থেকে একটা জায়গায় পাঁচন তরকারী জড়ো করে। সেখানে বিচারকমন্ডলী নিযুক্ত করা হয়। জড়ো করা প্রত্যেকের পাঁচন তরকারী ঐ বিচারক মন্ডলীর সদস্যদের পরিবেশন করা হয়। সব পাঁচন খাওয়া শেষ হলে পর কার রান্না বেশী মুখরোচক হয়েছে তা যাচাইপূর্বক বিচারক মন্ডলী রায় দেয়। প্রতিযোগীদের যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। অন্যান্যদের দেয়া হয় আন্তরিক ধন্যবাদ ও বিজু শুভেচ্ছা।
পুরস্কার শেষে সবাই মিলে বিজু নাচ—গান উপভোগ করে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয় আদিবাসীদের পুরোনো দিনের চাষাবাদ, পোষাক পরিচ্ছদ, সামাজিক রীতিনীতি, প্রেম—প্রীতি, বিরহ—বেদনা, প্রকৃতির বিভিন্ন পরিবেশে আদিবাসী তরুণ—তরুণীদর মনের অভিব্যক্তি ইত্যাদিসহ আদিবাসীদের জীবনের সকল দিক। যাকে এক কথায় বলা যায় সংস্কৃতি। প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নেচে—গেয়ে আদিবাসী মহিলারা বর্ধিত আঙ্গিকে বিজু আনন্দ উপভোগ করে থাকে। দিনের বেলায় বেশীরভাগ মহিলা বিজু অতিথি আপ্যায়ন ব্যস্ততার মধ্যে থাকে। দিনভাগে সব মহিলার পক্ষে প্রতিবেশীদের এঘর—ওঘর ঘুরে বেড়ানোর সময় হয় না।তাই ক্ষেত্রবিশেষে রাতের দিকে আদিবাসী মহিলারা দল বেঁধে ঘরে ঘরে বেড়ায়। পাঁচন তরকারী, কাঞ্জি, যগড়া ইত্যাদি বিজু পানীয় ও খাদ্য যার যা আছে তা রংঢং করে খায়। মূল বিজুর আনন্দ উৎসবে মেতে উঠে। রাত যত গভীর হয় তত বেশী জমে উঠে বিজু উৎসবের আমেজ। পরদিন পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রভাত কখন রোদ্রজ্জ্বল দুপুর হয়ে গেছে, বিজু ক্লান্ত ঘুমের ঘোরে তা কেউ জানতে পারে না। যখন ঘুম ভাঙে নববর্ষের পহেলা বৈশাখের সূর্য্য তখন মধ্য গগনে। আদিবাসীরা এই দিনকে গজ্যেইপজ্যা দিন হিসেবে আখ্যায়িত করেছ্।ে এই দিন বিজুর কলরব থেমে যায়। পরদিন থেকে আদিবাসীরা নূতন বছরে নূতনভাবে জীবন সংগ্রামে যাত্রা শুরু করে।
আগের দিনে বিজু ছিল নিছক আনন্দ—উৎসব উপভোগ করা। কিন্তু আজকের বিজু আর সে পর্যায়ে নেই। আদিবাসীদের সংস্কৃতি আজ বিপন্ন প্রায়। বিপন্ন অস্তিত্ব সংরক্ষণের দাবী নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিজু উৎসব পরিণত হতে চলেছে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিলে। আদিবাসীদের আত্মপরিচয় দানে বিজুর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর প্রত্যেক জাতির ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ঐতিহ্য ও ইতিহাস যেমনি সে জাতির জাতীয় উৎসবের মধ্য দিয়ে প্রস্ফূটিত হয়;অনুরূপভাবে আদিবাসীদের বিজু উপলক্ষেও তাই হবার কথা। আদিবাসীদের এই সংস্কৃতি আজ রাজনৈতিক সংকটের বেড়াজালে আটকা পড়ে রয়েছে। আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্মরা অতীতে ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধ করেছিল। যদিও নিষ্ঠুর বাস্তবতার কারণে সে যুদ্ধের ফলাফল তাদের বিপক্ষে চলে গিয়েছিল। সহজ সরল আদিবাসী জুম্ম জাতি ব্রিটিশের সাথে যুদ্ধে হেরে যাবার পর থেকে তার বিশ্বাসযোগ্য এবং সংস্কৃতি বিকাশের অনুকূল রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার সন্ধানে ব্যাপৃত ছিল। তাই সেদিন ব্রিটিশ ভারত ছেড়ে চলে যাবার পর দেশ বিভাগের সময় আদিবাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতে অর্ন্তভূক্তির কথা ভেবেছিল। দীর্ঘ ২৪ বছর পর ১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যূদয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের যুগাবসান ঘটে। স্বাধীনতা উত্তরকালে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্মরা তাদের সংস্কৃতি রক্ষার জন্য সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের উপর নতুন উদ্যোগে বিশ্বাস স্থাপন শুরু করেছিল।
বাংলাদেশ বহুজাতি, বহু ভাষাভাষি ও বহু সংস্কৃতির দেশ। ঋতু বৈচিত্র্যের সাথে এদেশে বিভিন্ন জাতির সংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রয়েছে। এদেশে বাংলা সংস্কৃতির সাথে ভিন্ন ভাষাভাষী আদিবাসী জাতিসমূহের সংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে সেটাই ছিল আদিবাসী জুম্মদের প্রত্যাশা। দেশ স্বাধীন হবার পর বাংলা সংস্কৃতি যে ধারায় এগিয়ে গেছে তার পাশপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের সংস্কৃতিও সেভাবে এগিয়ে যাবার কথা। কিন্তু তা হতে পারেনি। এর কারণ একদিকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব অন্যদিকে আদিবাসীদের সুশীল সমাজের মধ্যে সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে উদাসীনতা। বাংলাদেশ স্বাধীন উত্তরকালে আদিবাসীদের তরুণ শিক্ষিত সমাজের কিছু তরুণ শিল্পীর উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু হয়। প্রাচীন ভারতের প্রবীণ বাংলা শিল্পীদের অনুকরণে পার্বত্য চট্টগ্রামের অতীতের সহজ—সরল চারণ কবি, লোক সাহিত্যিকদের রচিত গানকে আধুনিক সঙ্গীত জগতে নিয়ে আসা হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আদিবাসী সঙ্গীতকে আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এভাবে বাংলাদেশের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক সংগঠন “গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী” আত্মপ্রকাশ করে। দু’দশকের অধিক কাল ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে গিরিসুর’র অগ্রযাত্রা বিরতি ঘটে। পার্বত্য চুক্তির পরে আবার গিরিসুর’র পথ চলা শুরু হয়। কিন্তু পার্বত্য চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়ন না হবার কারণে আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক অঙ্গন আশানুরূপভাবে উজ্জ্বল হতে পারেনি। ইতোমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের মধ্যে যে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম তাতে করে আদিবাসীদের বাস্তব জীবনের আশানুরূপ প্রতিফলন ঘটতে পারেনি।
রাজনৈতিক অধিকার ছাড়া কোন জাতীয় সংস্কৃতির পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটতে পারে না। তা অস্বীকার করার কোন অবকাশ নেই।
ষড়ঋতু বৈচিত্র্য এদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকেও বৈচিত্র্যময় করেছে। এখানে ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন ফসল ফলে। বিভিন্ন ফসলের মৌসুমকে ঘিরে এদেশের গ্রাম বাংলার জীবন সমৃদ্ধি লাভ করে। বাঙালীর ঘরে ঘরে অনুষ্ঠিত হয় মৌসুমী পূজা—পার্বন। যাকে নিয়ে গড়ে উঠেছে জীবনের সুখ—দুঃখ, হাসি—কান্না বিজড়িত লোক সাহিত্য ও সঙ্গীত শিল্প। নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশের সমতলের মানুষের জীবন যাত্রা আর পাহাড়ের আদিবাসীদের জীবন যাত্রায় ভিন্নতা থাকলেও আদিবাসীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যম হচ্ছে বাংলা। বাংলা ভাষার মাধ্যমেই আদিবাসীরা অন্য সংস্কৃতির সাথে যোগাযোগ গড়ে তোলে। বাংলা সুর ছন্দকে ভিত্তি করে আদিবাসী নাচ—গানকে উন্নত সংস্করণে নিয়ে এসেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের জুম পাহাড়ের লালিত সংস্কৃতি স্মরণাতীতকালের পুরোনো। তাদের এই সংস্কৃতি রক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা আগে ছিল না। ব্রিটিশ, পাকিস্তান আমল পেরিয়ে আজ বাংলাদেশ আমলে পদার্পণ করেও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্মদের সম্ভাবনাময় সংস্কৃতি উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়নি। স্বাধীনতা উত্তরকালে এপার—ওপার বাংলার চিত্র জগৎ একাকার হয়ে যায়। প্রদর্শিত হয় এপার—ওপার বাংলার চিত্র তারকাদের যৌথ অভিনীত ছবি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে উর্দূ ভাষী পাঠানদের সাথে বাঙালীদের বিরোধ থাকলেও ভারতীয় বাংলা কিংবা হিন্দি ভাষী অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে বিরোধ ছিল না। বাংলার সংস্কৃত অঙ্গন ছিল সকল বিরোধের ঊর্ধ্বে। তাই এপার বাংলা ওপার বাংলার বর্ষ বিদায়—বরণ মর্মার্থ এক ও অভিন্ন। উভয় বাংলা একই সাংস্কৃতিক সেতু বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছে। ভারতের আদিবাসী সংস্কৃতির সাথে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সংস্কৃতির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সে সুবাদে ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের নিরবিচ্ছিন্ন যোগাােযাগ ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে ভারত ও বাংলাদেশ যৌথ সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড যুক্ত হতে পারতো, যদি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থাকতো।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জাতি গোষ্ঠীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যম হচ্ছে বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষা একটি সমৃদ্ধ ভাষা। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জাতি সমূহের মধ্যেকার আন্তঃ যোগাযোগ ও ভাব বিনিময়ের মাধ্যমও হচ্ছে বাংলা ভাষা। আদিবাসীরা সরকারী কাজকর্ম বাংলা ভাষায় সম্পাদন করে থাকে। দেশ বিভাগের সময় যেমনি ভারতকে আদিবাসীরা নিজেদের সংস্কৃতিবান্ধব রাষ্ট্র মনে করেছিল; তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে আদিবাসীবান্ধব মনে করেছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঊষালগ্ন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্ম জনগণ বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় নিজেদের অস্তিত্ব সংরক্ষন ও বিকাশের স্বপ্ন দেখে আসছিল। তাই ১৯৯৭ সালে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদন হয়েছিল। আদিবাসীদের সংস্কৃতি রক্ষার স্বার্থে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমি অধিকার সংরক্ষণ ইত্যাদি নিশ্চয়তা বিধানে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন অনস্বীকার্য।
অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান এসব হচ্ছে মানুষের মৌলিক চাহিদা। এসব মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য মানুষের একটা সুনির্দিষ্ট অবলম্বন থাকা চাই। এক্ষেত্রে বন ও ভূমির বিকল্প হিসেবে আদিবাসীদের দ্বিতীয় কোন অবলম্বন নেই। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের সংস্কৃতির কথা, জাতীয় অস্তিত্বের কথা, ভূমি অধিকারের কথা, সব কিছু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই খুঁজতে হবে। তখনই পার্বত্য চট্টগ্রামের বিজু যথাযথভাবে আনন্দ উৎসবের দিন হিসেবে মূল্যায়ণ করা সম্ভব। আর আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক সংকটও নিরসন সম্ভব। ঠিক তখনিই বাংলাদেশ হবে বহুজাতিক ও বহুসংস্কৃতির দেশ হিসেবে সমগ্র বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত একটি নাম।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

লংগদুতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিএনপি’র প্রচারপত্র বিতরণ

রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতামূক প্রচারণা ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার …

Leave a Reply