নীড় পাতা » পাহাড়ের সংবাদ » আওয়ামী লীগ বলছে এক,পুলিশ আরেক

আওয়ামী লীগ বলছে এক,পুলিশ আরেক

AL flag coverবরাবরই এদেশে ক্ষমতাসীন দলের সাথে পুলিশের সখ্যতার দৃশ্যই চিরায়ত। বিরোধী দলই পুলিশকে দরকারি দলের লাঠিয়াল আর যাবতীয় নির্যাতনের অভিযোগ করে থাকে। পার্বত্য জেলা শহর রাঙামাটিও এর ব্যতিক্রম ছিলোনা । কিন্তু হঠাৎ করেই যেনো বদলে গেলো দৃশ্যপট। সাম্প্রতিক সময়ে রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে আলোচনায় পুলিশের স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের সাথে সম্পর্ক অবনতির উত্তাপ টের পাওয়া যাচ্ছিলো,তবে ততটা দৃশ্যমান ছিলোনা এর তাপ। কিন্তু গত বুধবার একই দিনে সংঘটিত তিনটা ঘটনা সব হিসেব নিকেষ পাল্টে পুলিশ আর ক্ষমতাসীন দলকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে পরস্পরের মুখোমুখি। যদিও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বিরোধটি পুলিশ বিভাগের সাথে নয়,পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। রাঙামাটির পুলিশ সুপার আমেনা বেগম,কোতয়ালি থানার ওসি সোহেল ইমতিয়াজ এবং এএসআই মোঃ ইদ্রিছ এর অপসারণ দাবিতে মিছিল সমাবেশও করেছে দলটি।

যেসব অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে !
ঘটনা-০১ : গত ৫ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১ টায় শহরের পুলিশ লাইন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোড়ে পুলিশের একটি পিকআপ এর সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে মারা যায় যুবলীগ কর্মী সুজন মল্লিক,আহত হয় রেজাউল হক নামের আরেকজন। ওই ঘটনায় ক্ষুদ্ধ সুজনের বন্ধু ও স্বজনরা পুলিশকে দায়ী করে হাসপাতালে উত্তেজিত হয়ে বিক্ষোভের চেষ্টা করলেও পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসে বিচারের আশ্বাস ও ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই পরিস্থিতি আপাত নিয়ন্ত্রন করেন।

ঘটনা-০২ : ওইদিন রাতে শহরের তবলছড়ি বাজার থেকে ভাই ও ভগ্নিপতিসহ আসামবস্তির শান্তিনগরে নিজ বাসায় ফিরছিলেন বরকল উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক জিয়াউল হক কমল। পথে কোতয়ালি থানার সামনে পুলিশের এএসআই ইদ্রিছ তাকে আটক করে একটি মামলার ওয়ারেন্টভূক্ত আসামী হিসেবে চ্যালেজ্ঞ করলে সে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশও তাকে ধাওয়া করে। ধাওয়া খেয়ে বাজারের পাশে অবসিস্থত মিনিস্ট্রিয়াল ক্লাবের পাশ দিয়ে কাপ্তাই হ্রদে ঝাঁপ দেয় কমল। পুলিশও তাকে ধরতে পানিতে নামে। কিন্তু ততক্ষণে পানিতে তলিয়ে যায় কমল। প্রায় চারঘন্টা পর তার লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহতের পরিবার ও দলীয় সহকর্মীরা এই ঘটনার জন্য পুলিশকে দায়ী করছে।

ঘটনা-০৩ : সোহেল ইমতিয়াজ। ২০০২ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত রাঙামাটির কোতয়ালি থানায় এসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেময় বিরোধী দলে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপর ব্যাপক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ করে থাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সম্প্রতি ওই এসআই পদোন্নতি পেয়ে কোতয়ালি থানায় ওসি(তদন্ত) হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু রাঙামাটির কোতয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল আলম চৌধুরী গত কয়েকদিন আগে বদলী হয়ে গেলে তার স্থলে ওসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ইমতিয়াজকে। এনিয়ে ক্ষুদ্ধ আওয়ামী লীগ। তাদের বিরোধীতা ও আপত্তির মুখে ইমতিয়াজকে ওসি হিসেবে নিয়োগ দেয়ায় এসপি আমেনা বেগমের উপরও ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে তারা। তারউপর ইমতিয়াজ নিয়োগ পাওয়ার দিনই পৃথক দুটি ঘটনায় দলীয় কর্মী মারা যাওয়ায় আরো বেশি বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে তারা।

আওয়ামী লীগের অভিযোগ বিস্তর : আওয়ামী লীগ নেতারা অভিযোগ করছেন,বর্তমান পুলিশ সুপার ও পুলিশ প্রশাসন দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। ক্ষমতাসীন দল হয়েও পুলিশের কোন সহযোগিতা পান না অভিযোগ করে আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন,বর্তমান রাঙামাটি পুলিশ প্রশাসন বিএনপি – জামাতের অনুসারি। তারা বলেন,এরা নানাভাবে জামাতকে সহযোগিতা দিয়ে রাঙামাটিতে হরতাল পালনে সহযোগিতা করছে,শহরের চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের সাথেও  নতুন ওসির রয়েছে বিশেষ সখ্যতা,ওসি ইমতিয়াজ পুলিশ নয়,জামাত-বিএনপির ক্যাডারের মতো আমাদের উপর দমনপীড়ন চালিয়েছিলো,তাকে আমরা কোনভাবেই মেনে নিতে পারিনা। এবারো সে দায়িত্ব নিতে না নিতেই আমাদের কর্মী হত্যা শুরু করেছে।

রাঙামাটি জেলা যুবলীগের সভাপতি আকবর হোসেন চৌধুরী বলেন,কমল তক্ষক পাচারের একটি মামলায় আদালতে হাজির না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে,এটা এমন কোন মামলা নয় যে,পুলিশ তাকে ধাওয়া করে পানিতে ফেলে গ্রেফতার করতে হবে,তাকে আদালতে হাজির হওয়ার সুযোগ দেয়া যেতো। গভীর রাতে পানিতে ফেলে তাকে এইভাবে মেরে ফেলার কারণ কি ? আমরা এর দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি এবং বর্তমান এসপি ও ওসি ইমতিয়াজ রাঙামাটি থাকলে এখানে আরো অনাকাংখিত ঘটনা ঘটবে,যা আমরা চাইনা।

রাঙামাটি পৌর আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক মনসুর আলী বলেন, আমরা অবশ্যই এসপি ও কোতয়ালির ওসির অপসারণ চাই,তারা আমাদের দুই কর্মী হত্যার ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না। এর সাথে অন্যকোন বিষয় জড়িত নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ মুছা মাতব্বর বলেন,এই পুলিশ সুপার ও তার প্রশাসন দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। তাকে ও বিতর্কিত ওসি ইমতিয়াজকে অবশ্যই অপসারণ করতে হবে। আমাদের নিরপরাধ কর্মী হত্যার বিচারও চাই আমরা।

নেপথ্যে বহুবিরোধ : আপাতত একই দিন সংঘটিত তিনটি ঘটনা আওয়ামী লীগ ও পুলিশের বিরোধের কারণ বলে মনে হলেও অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরো অনেক তথ্য। আওয়ামী লীগ ও পুলিশের বিভিন্ন স্তরে কথা বলে জানা গেছে,বেশ কিছু কারণে সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের বর্তমান দায়িত্বশীলদের সাথে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সম্পর্কে অবনতি হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাদের ছোটখাটো কোন তদবিরই সাম্প্রতিক সময়ে রাখেননি পুলিশ সুপার আমেনা বেগম,এমন অভিযোগ আওয়ামী লীগ নেতাদের। এমনকি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কয়েকটি উপজেলায় বেশ কিছু কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ এজেন্টদের কাজ করতে না দেয়ার বিষয়টি এসপিকে জানানো হলেও তিনি কোন পদক্ষেপ নেননি বলেও দাবি তাদের। এরই মধ্যে কোতয়ালি থানার ওসি সাইফুল বদলী হয়ে গেলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নিজেদের পছন্দের একজনকে ওসি পদে আনার চেষ্টা করা হয়,তদবিরও করা হয় ওই ওসির জন্য। কিন্তু পুলিশ সুপার তা প্রত্যাখ্যান করে আওয়ামী লীগের অনাস্থায় থাকা সোহেল ইমতিয়াজকে ওসি হিসেবে নিয়োগ দেয়ায় ক্ষুদ্ধ হয় দলটি। একই সাথে সম্প্রতি রাঙামাটি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা নিখিল কুমার চাকমার বাসা থেকে নিরাপত্তায় নিয়োজিত অতিরিক্ত পুলিশ প্রত্যাহার করেন পুলিশ সুপার,অথচ বাকী দুই পার্বত্য জেলা বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের পুলিশ এখনো এই নিরাপত্তা সুবিধা বহাল রেখেছে,এনিয়েও ক্ষুদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারা। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে,মূলতঃ পছন্দের ব্যক্তিকে ওসি হিসেবে নিয়োগ দিতে না পারা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের অনায্য সুপারিশ না মানায় তারা ক্ষুদ্ধ ।

পুলিশ যা বলছে :
যাকে নিয়েই সবচে বেশি আলোচনা সেই ওসি সোহেল ইমতিয়াজ জানালেন, আওয়ামী লীগ নেতারা কেনো আমার উপর ক্ষুদ্ধ আমি জানিনা। আমি ১৯৯৮ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আমলেই পুলিশে যোগ দিয়েছি এবং ২০১০ সালে এই প্রধানমন্ত্রীই আমাকে পিপিএম পদক দিয়েছে। আর ২০০২ সাল থেকে ২০০৫ সাল রাঙামাটির কোতয়ালি থানায় আমি দায়িত্ব পালন করেছি সততার সাথেই,সেই কারণে সেই সময়কার সরকার আমাকে আওয়ামী লীগ সমর্থক অপবাদ দিয়ে বদলীয় করে দেয়। আর আমি যদি জামাতকেই সহযোগিতা করবো তাহলে বৃহস্পতিবার কেনো শিবিরের জেলা সাধারন সম্পাদককে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠিয়েছি,এগুলো ভিত্তিহীন অভিযোগ। মাদকব্যবসায়ীদের সাথে সম্পর্কে ব্যাপারে তিনি বলেন,পুলিশের চাকুরি ও দায়িত্বের কারণে অনেকের সাথে সম্পর্ক রাখতে হয় আমাদের,এটাতো অপরাধ হতে পারেনা। বুধবারের সড়ক দূর্ঘটনা কিংবা পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনার সাথেতো আমার কোন সম্পর্কই নেই। তারা কেনো আমাকে পছন্দ করছেনা আমি জানিনা।

আর পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত এএসআই মোঃ ইদ্রিছ বলেন, আমি আমার দায়িত্বের অংশ হিসেবেই তাকে গ্রেফতার করার জন্য চেষ্টা করতেই সে দৌড় দেয়,স্বাভাবিক কারণেই আমরাও তাকে দৌড়ে ধরার চেষ্টা করি। সে পানিতে ঝাঁপ দিলে আমরা তাকে ওঠে আসার জন্য বারবার অনুরোধও করি,পরে একজন সিপাহী ও আরেকজন পাবলিককে পানিতে নামাই। তারা তার কাছে যাওয়ার আগেই সে পানিতে তলিয়ে যায়। সাথে সাথেই আমরা ফায়ারসার্ভিসে ডুবুরির জন্য যোগাযোগ করি,সেখানে ডুবুরি না থাকায় সস্থানীয়দের সহায়তায় জাল ফেলে তাকে উদ্ধার করি,ততক্ষণে সে মারা যায়। এর সাথে আমার দোষটা কোথায় ? তার সাথে তো আমার ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিলোনা। আসামী তো আসামীই। এর জন্য আমাকে দায়ী করা দুঃখজনক।Rangamati-Pic-06

রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) হাবিবুর রহমান বলেন, তাদের অভিযোগ যদি সুনির্দিষ্ট হয় তাহলে আমরা পদক্ষেপ নিতে পারতাম,কিন্তু তারা যদি ঢালাওভাবে আমাদের সবার অপসারণ দাবি করে তাহলে আমাদের কিইবা করার আছে।

রাঙামাটির পুলিশ সুপার আমেনা বেগম বলেন,তারা আমার বিরুদ্ধে কি অভিযোগ বা কোন বিষয়ে তাদের আপত্তি তাতো কোনদিন বলেনি। আমিতো জানিইনা আমার বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ কি। আর সড়ক দূর্ঘটনা ও আসামী ধরতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনার জন্য তো আমাকে দায়ী করা যৌক্তিক না। দুটি ঘটনাতেই সংশ্লিষ্টদের আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছি এবং এখনো তা অব্যাহত আছে,পাশাপাশি পুলিশের পক্ষ থেকেও যদি কোন অবহেলা থেকে থাকে অবশ্যই আমরা ব্যবস্থা নিবো। কিন্তু পুলিশের বিরুদ্ধে মিছিল সমাবেশ করে কি সমস্যার সমাধান হবে ?

দীপংকরের নির্দেশে কর্মসূচী স্থগিত করেছে আওয়ামী লীগ !
এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকে ঢাকায় অবস্থান কার সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারের নির্দেশে রাঙামাটির পুলিশ সুপার আমেনা বেগম,ওসি সোহেল ইমতিয়াজ ও এএসআই ইদ্রিছের অপসারন দাবিতে রবিবারের বিক্ষোভ মিছিল,সমাবেশ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচী স্থগিত করছে রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগি সংগঠনগুলো।
রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক মোঃ মুছা মাতব্বর ও জেলা যুবলীগের সভাপতি আকবর হোসেন চৌধুরী শনিবার বিকেল পাঁচটায় জানিয়েছেন, এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ও দাদা(দীপংকর তালুকদার) আপাততঃ কর্মসূচী পালন না করার জন্য বলায় রবিবারের কর্মসূচী পালিত হবেনা। তবে আমরা আমাদের দাবি থেকে সরিনি,আমরা এখনো তাদের অপসারন দাবি করছি।
আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানিয়েছে,ক্ষমতাসীনের দলের পুলিশ বিরোধী আন্দোলনে সরকার বিব্রত হতে পারে,এই শংকায় কর্মসূচী স্থগিত করা হয়েছে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

রাঙামাটিতে করোনায় আরও এক নারীর মৃত্যু

রাঙামাটি শহরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার ভোররাতে শহরের চম্পকনগর আইসোলেশন …

Leave a Reply