আওয়ামীলীগ-বিএনপি-জেএসএস’র ‘বিরল সমঝোতা’

tender‘পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতি,সববিষয়েই তাদের মধ্যে মতদ্বৈততা দেখা যায়,স্থানীয় উন্নয়ন বা অন্যান্য ইস্যুতেও একদল একপক্ষে হলে,আরেকদল অন্যপক্ষে, কিন্তু এবার আমরা দেখলাম নিজেদের স্বার্থের বেলায় কিভাবে বাঘে মহিষে একঘাটে জল খায়।’

পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে দুর্যোগ ও ত্রান মন্ত্রনালয়ের অধীনে জেলা ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া প্রায় ২৫ কোটি টাকার ছোট ছোট ব্রীজ নির্মাণ কাজের রাঙামাটি সদর উপজেলার দরপত্র নিয়ন্ত্রনে আওয়ামীলীগ-বিএনপি আর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ‘বিরল সমঝোতা’ প্রসঙ্গে উপরের মন্তব্যটি করেছেন রাঙামাটি জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি হারুন মাতব্বর। একই সাথে সরকারের অংশ হয়েও এই সমঝোতা প্রক্রিয়ায় তাদের রাখা হয়নি,এমনকি কোন কথাও বলেনি তাদের সাথে এমন অভিযোগও জানালেন তিনি।

শুধু হারুন মাতব্বরই নয়, তিন দলের সমঝোতার বিষয়টি এখন পাহাড়ী জেলা রাঙামাটির ‘টক অব দ্য ডিস্ট্রিক্ট !’ যেখানে রাজনৈতিক বা সামাজিক কোন ইসু্যুতে নিজেরা এক হতে পারেনা তিনটি দল,সেখানে তাদের মধ্যকার এই বিরল সমঝোতাকে ‘রাজনৈতিক স্খলন’ এবং ‘ধান্ধাবাজদের সিন্ডিকেট’ বলেও মন্তব্য বিশিষ্ট জনদের। মজার ব্যাপার হলো, ওইদিন টেন্ডার বাক্সও পাহারা দিতে দেখা গেছে রাঙামাটির যুবলীগ,ছাত্রলীগ,যুবদল,ছাত্রদল এবং জনসংহতি সমিতির নেতাকর্মীদের। টেন্ডারবাজ ও সমঝোতা কারিদের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, আওয়ামীলীগ ৩ টি,জনসংহতি সমিতি ২ টি, বিএনপি ১ টি এবং পাহাড়ী ও বাঙালী দুই ঠিকাদার সমিতেকে ১ টি কাজ সমঝোতার মাধ্যমে ভাগ করে দেয়া হয়েছে এবং সেই মোতাবেকই শিডিউল জমা দেয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে,ত্রান ও দুযোর্গ মন্ত্রনালয়ের অধীনে সারাদেশের মতো পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতেও ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ছোটছোট (১২ মি: দৈর্ঘ্য পর্যন্ত)সেতু কালভার্ট নির্মাণ (২য় পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় দশটি উপজেলায় মোট ৭৯ টি সেতু নির্মাণের টেন্ডার জমা দেয়ার শেষ তারিখ ছিলো গত বুধবার। কিন্তু টেন্ডার প্রক্রিয়ার আগেই নিজেদের মধ্যে সমঝোতা সেরে নেয় দলগুলো এবং টেন্ডার জমা দেয়ার দিন কাউকেই দরপত্র জমা দিতে দেয়নি তিন দলের সমঝোতাকারিদের নেতৃত্বে গঠিত যৌথ কর্মী বাহিনী। রাঙামাটির দশটি উপজেলার মধ্যে নয়টি উপজেলাতেই বিপুল সংখ্যক শিডিউল বিক্রি ও জমা হলেও রাঙামাটি সদরে যৌথি সিন্ডিকেটের কারণে নামমাত্র শিডিউল বিক্রি ও জমা হয়। এর ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব বঞ্চিত হয়। তবে প্রায় প্রতিটি উপজেলাতেই একটি আঞ্চলিক সংগঠনকে একাধিক কাজ ছাড় দিতে হয়েছে এবং সেই কাজে অন্য কেউ শিডিউলও জমা দিতে পারেনি।

মেসার্স হক ব্রদার্সা এন্ড কোং এর পক্ষে ওমর আব্দুল্লাহ মাহমুদ নামের একজন ঠিকাদার বিলাইছড়ি উপজেলার দুইটি কাজের দরপত্র জমা দেয়ার জন্য গেলে তাদের কাছ থেকে জোর পূর্বক শিডিউল কেড়ে নেয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি। অভিযোগটি লিখিতভাবে জেলা প্রশাসককে জানানোর পাশাপাশি তিনি রাঙামাটির কোতয়ালি থানায়ও সাধারন ডায়রি আকারে অবহিত করেছেন।

ঠিকাদার মাহমুদ অভিযোগ করেন, ওই দিন দরপত্র জমা দেয়ার জন্য জেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অফিসে গেলে সেখানে বিভিন্ন দলের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী অবস্থান দেখতে পাই। এক পর্যায়ে পৌর যুবলীগের সভাপতি আবুল খায়ের ও বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক সাইদুল আমার কাছ থেকে জোরপূর্বক শিডিউল কেড়ে নেয়। আমি তাৎক্ষনিকভাবে বিষয়টি জেলা প্রশাসক এবং থানাকেও লিখিতভাবে অবহিত করেছি। আমি ওই কাজগুলোর টেন্ডার বন্ধ রাখার দাবি জানাচ্ছি।
জেলা ত্রান ও পুনর্বাসন অফিস সূত্র জানিয়েছে,দশটি উপজেলায় ৭৯ টি কাজের বিপরীতে মোট ৩ হাজার ৫৮৯ টি শিডিউল বিক্রি হয় এবং জমা পড়ে ৩ হাজার ৪৭২ টি। এর মধ্যে সবচে বেশি শিডিউল বিক্রি হয় কাপ্তাই উপজেলায় ৬০৯ এবং সেখানে জমাও পড়ে ৬০৫ টি। অন্যান্য সবগুলো উপজেলাতেও শত শত শিডিউল বিক্রি এবং জমা পড়ে। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে সবচে বেশি শিডিউল বিক্রি হওয়ার কথা যে উপজেলা,সেই রাঙামাটি সদর উপজেলায় ৭ টি কাজের বিপরীতে শিডিউল বিক্রি হয়েছে মাত্র ৬৫ টি এবং জমা পড়েছে প্রতিটি কাজের বিপরীতে ৩ টি করে ২২ টি মাত্র ! যা অবিশ্বাস্য এবং সাজানো বলেই মানছেন খোদ ত্রান ও দূর্যোগ বিভাগের কর্মকর্তারাও। সমঝোতা প্রক্রিয়ার কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের।

সমঝোতা প্রক্রিয়া সম্পর্কে রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মোঃ মুছা মাতব্বর মৃদু হেসে বলেন,আমিও আপনার মতোই শুনেছি। আমাদের দলের কিছু ছেলে বিএনপি ও জেএসএস এর সাথে সমঝোতা করে কাজ ভাগাভাগি করেছে। বিষয়টি ঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অভিযোগ স্বীকার করে নিয়ে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক মো: শাহ আলম বলেন, বিএনপি সাংগঠনিকভাবে এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত ছিলোনা। শুনেছি আমাদের কিছু নেতাকর্মী আওয়ামীলীগ ও জেএসএসসহ মিলে একাজ করেছে।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানিনা। আমাদের সংগঠনও এর সাথে জড়িত নয়।

রাঙামাটি জেলা ত্রান ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বিশ্বনাথ মজুমদার বলেন, আমরাও শুনেছি সদর উপজেলায় কাউকে কাউকে শিডিউল ক্রয় ও জমাদানে বাধা দেয়া হয়েছে। এই কারণে অন্যান্য উপজেলায় অনেক শিডিউল বিক্রি ও জমা হলেও সদরে সবচে কম বিক্রি ও জমা পড়েছে। এই কারণে আমরা রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছি। এছাড়া একজন ঠিকাদার লিখিতভাবেও অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানিয়েছেন বলে জানান তিনি।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কারাতে ফেডারেশনের ব্ল্যাক বেল্ট প্রাপ্তদের সংবর্ধনা

বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশন হতে ২০২১ সালে ব্ল্যাক বেল্ট বিজয়ী রাঙামাটির কারাতে খেলোয়াড়দের সংবধর্না দিয়েছে রাঙামাটি …

Leave a Reply