নীড় পাতা » বিশেষ আয়োজন » অরণ্যের আলোক শিখা – প্রভাংশু ত্রিপুরা

অরণ্যের আলোক শিখা – প্রভাংশু ত্রিপুরা

Prabhangshu-tripura‘নিতান্ত কৌতুহলের বসে একদিন চট্টগ্রামের এনায়েত বাজারের গোয়াল পাড়াস্থ একটি বাড়ীতে হাজির হলাম। পরিত্যক্ত দোতালা বাড়ী। সিঁড়ি বেয়ে দোতালায় উঠলাম। ডানপাশে একটি ঘরে প্রবেশ করলাম। দুটি মাঝারি আকারের কক্ষ, একটি বড় বারান্দা এবং একটি শৌচালয়। একটি রুমের মাঝ বরাবর পাটি বিছানো কাঠের একটি চৌকি, তিনটি প্রায় ভাঙ্গা চেয়ার, একটি পুরোনো টেবিল, কিছু হাড়ি-পাতিল, একটি কেরোচিনের চুল্লি, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু বই আর সামান্য কিছু গৃহস্থালী সামগ্রী। প্রায় অগোছালোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কাপড়-চোপড়। এই ঘরে একজনের বসবাস। তিনি আমাকে সাদরে গ্রহণ করে চেয়ারে বসতে দিয়েই হাতে একটি বাঁশ নিলেন। আমি আতংকিত হইনি মোটেও, কারণ লোকটি বড় ভালো মানুষ। জানতে পারলাম ওই বাঁশটি আর কিছুই নয়। এটি হল পাহাড়ি হুকো। হুকো ধরিয়ে গুড়– গুড়– করে টান দিতে দিতে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। চারিদিকে বড় বড় অট্টালিকার মাঝখানে আলো বিহীন একটি ঘর। এই ঘরেই তিনি দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে অবস্থান করছেন। সপ্তাহের ছুটিতে বাড়ী যান। এবার কিন্তু সত্যি সত্যিই আশ্চর্য হলাম।
হঠাৎ একদিন জানতে পারলাম, মানুষটি গবেষণায় সামগ্রিক অবদানের জন্য একাডেমী সাহিত্য পুরষ্কার ২০১৩, এ ভূষিত হয়েছেন। হবারই কথা তিনিতো ঋষি। ধ্যানমগ্ন হয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করেন। চলেন সুন্দর, বলেন সুন্দর, লিখেন সুন্দর, মানুষটিও সুন্দর, তিনি প্রভাংশু ত্রিপুরা। বাংলাদেশ বেতার, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের মুখ্য প্রযোজক। পিতা: ঋষি সন্দ মোহন ত্রিপুরা, মাতা: শ্রীমতি কুমুদিনি ত্রিপুরা’র ঘরে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি থানাধিন কার্বারী গ্রামে জন্ম। স্ত্রী: শ্রীমতি শঙ্খলতা ত্রিপুরা। দুই সন্তানের জনক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ২৪টি। যেমন- কক বরক আদি শিক্ষা, ত্রিপুরা জাতি ও সংস্কৃতি, ত্রিপুরা লোককাহিনী, ত্রিপুরা জাতির মাণিক্য উপন্যাস, ত্রিপুরা জাতির মানব সম্পদ, ত্রিপুরা জাতির লোক সংগীত, ত্রিপুরা আয়ুর্বেদ ও বৈদ্যশাস্ত্র, ত্রিপুরা তন্ত্রসার, পার্বত্যাঞ্চলের ত্রিপুরা লোকালয় পরিচিতি, ত্রিপুরা লোকাচার ও গার্হস্থ্যবিধি, ভাগ্য বিড়ম্বনা (গল্প সংকলন), ঈশারা (ধর্মীয় নাটক), প্রবন্ধ বিচিত্রা, কক বরক গীতি সংকলন, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার ইতিহাস, ত্রিপুরা লোককাহিনী, ত্রিপুরা জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি প্রভৃতি।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমীর যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৪ সালে। প্রতিষ্ঠানটি এদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ভাষা, কৃষ্টি, গবেষনা প্রভৃতি বিষয়ে গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে আমাদের জানার পরিধিকে ব্যাপকতা এনে দিয়েছে। ১৯৬০ সাল থেকে বাংলা একাডেমী সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয়ে অবদানের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ’বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরষ্কার’ প্রবর্তন করে। দীর্ঘ ৫৪ বছরে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর মধ্যে একমাত্র প্রভাংশু ত্রিপুরাই এই বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন। প্রভাংশু ত্রিপুরা যেন কুপি বাতির আলোতে এক উজ্জল নক্ষত্র। অরণ্যের আলোক শিখা। একদিন চা খেতে খেতে তাঁর সাথে আলাপ হচ্ছিল।

কোহেল: আপনি কেন লেখক হলেন?

প্রভাংশু ঃ খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল মদন কার্বারী গ্রামে আমার জন্ম। জুম ফসলের ভাত খেয়ে বড় হয়েছি। পাহাড়, পর্বত, বন- বনানীর ছায়াশীতল ছড়া ঝর্ণার জলে অবগাহন করে সিক্ত হয়েছি। প্রকৃতির কোলে বেড়ে উঠেছি। আমাদের এই বাংলাদেশের মাটি খুবই উর্বর। আপনারা দেখে থাকবেন, পার্বত্যঞ্চলের পাহাড় পর্বতে, আলুটিলা পর্বতে, চিম্বুক, ক্রিওক্রাডং, তাজিংডং কিম্বা পর্বতের গাত্রে সেচ বিনা, সার বিনা বুক সমান ফসল ফলে। ধান হয়, কার্পাস হয়, তিল হয়, শাক হয়, সবজি হয়। মানুষ খেয়েপরে বাঁচে। বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের এই নন্দিত সংস্কৃতি জানার আগ্রহে আমি লেখালেখি করি। লেখালেখি করা আমার বাড়তি নেশা। ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি প্রভৃতি বিষয়ে নিয়ে আমি লিখি। জীবন চলার পথে যা কিছু দেখেছি, জেনেছি কিম্বা শুনেছি সে সব বাস্তবধর্মী বিষয় নিয়ে গল্প উপন্যাস, নাটক লিখেছি। আমার সাহিত্য ও কবিতায় দ্রোহ আছে, প্রেম আছে, ক্ষোভ আছে, দুঃখ আছে কিন্তু বারুদের গন্ধ নেই, নেই রক্তের হোলি খেলা।

কোহেল : আপনার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ’কক বরক আদি শিক্ষা’। এই বইটি প্রকাশ করার কেন প্রয়োজন মনে করেছিলেন?

প্রভাংশু: ত্রিপুরাগণ যে ভাষায় কথা বলে তা ’কক বরক’ নামে অভিহিত। ভারত সরকার ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ জানুয়ারী ’কক বরক’ রাজ্যভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে এবং স্কুল কলেজে ’কক বরক’ ভাষায় পাঠদান কার্যক্রম শুরু করে। কক বরক ভাষার লেখ্যরূপ কি হবে এ নিয়ে তখন বিজ্ঞ মহলে নান প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিলো। দেব নাগরী ও রোমান লিপি নিয়ে বির্তক সৃষ্টি হয়েছিল। আমি বিষয়টি অনুধাবন করে দেব নাগরী ও রোমান লিপি দুটিকে নিয়ে কিভাবে লেখ্য রূপ দেয়া যায় তা গবেষণা করে ’কক বরক আদি শিক্ষা’ গ্রন্থটি প্রকাশ করে একটি সমাধানের পথ আবিষ্কার করি। এই গ্রন্থটি সেই সময়ে বিজ্ঞ মহলে সমাদৃত হয়েছিল।

কোহেল: আপনি গবেষনায় সামগ্রিক অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরষ্কারে ভুষিত হয়েছেন। মূলত কি বিষয় নিয়ে আপনি গবেষণা করেছেন?

প্রভাংশু : আমার এ পর্যন্ত ২৪টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আমার সব গ্রন্থই গবেষণার ফসল। ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি তো বটেই, এমন কি গল্প, উপন্যাস, লোক সাহিত্যেও গবেষণা লব্দ তথ্য উপাত্ত সন্নিহিত করার প্রয়াস পেয়েছি। বিশেষ করে বাক্য গঠনে ও শব্দ প্রয়োগে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করেছি। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার ইতিহাস, ত্রিপুরা জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি, লোক সংগীত, তন্ত্রমন্ত্র সার প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ।

কোহেল : গবেষণার উপাদান সংগ্রহ করতে গিয়ে কি কি প্রদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়েছে আপনার?

প্রভাংশু : ঐতিহাসিক উপাদানের জন্য স্থান, কাল, পাত্র ভেদে আমাকে বহু জায়গায় যেতে হয়েছিল। বহু লাইব্রেরীর সহযোগিতা নিতে হয়েছিল। প্রবীন ও বিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করতে হয়েছিল। পুরানো সরকারী নথিপত্র, দলিল দস্তাবেজ, মুদ্রা, তা¤্র শাসন, ইমারাত, পুকুর-দীঘি, রাস্তা-ঘাট, মঠ, মন্দির ইত্যাদি প্রাচীন নিদর্শনে সরেজমিনে গিয়ে তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করতে হয়েছিল। কুমিল্লার বীর চন্দ্র লাইব্রেরী, আগরতলা মিউজিয়াম, উজ্জ্বয়ন্ত রাজ প্রাসাদ, চট্টগ্রাম বিভাগীয় লাইব্রেরী, ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরী, এশিয়াটিক সোসাইটির প্রাচীন গ্রন্থ সামগ্রীসহ বহু লাইব্রেরির সহযোগিতা আমাকে নিতে হয়েছিল। এতে আমার যেমন কায়িক শ্রম হয়েছে, তেমনি অর্থ ব্যয় হয়েছে প্রচুর।

কোহেল : কথিত আছে যারা ইতিহাস গবেষণা করেন কিংবা গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ করেন, তাঁদের কারো কারো দ্বারা কোন কোন সময় ইতিহাস বিকৃতির সম্ভাবনা থাকে। এক্ষেত্রে আপনার প্রকাশিত গ্রন্থ কতটুকু নির্ভরযোগ্য।

প্রভাংশু : শতভাগ নির্ভরযোগ্য।

কোহেল : কিভাবে এত জোর দিচ্ছেন?

প্রভাংশু : দেখুন ইতিহাসের তথ্য, উপাত্ত‘র আলোকে আমি ইতিহাস গ্রন্থ লিখি। তথ্য ও উপাত্তগুলোর নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে আমি চুলচেরা বিচার বিবেচনা করি। একাধিক ঐতিহাসিক গ্রন্থর সমর্থন ও সহায়তা গ্রহণ করি। স্থান, কাল, পাত্র নিরুপণ করে আমি সম্যক সিদ্ধান্ত গ্রহন করি।

কোহেল : আপনি অন্যান্য জাতি সত্ত্বাকে নিয়ে গ্রন্থ না লিখে শুধুমাত্র ত্রিপুরা জাতি, সংস্কৃতি, লোকাচার বিষয়ে অধিক বই লিখেছেন কেন?

প্রভাংশু : ত্রিপুরা একটি প্রাচীর জাতি। এ জাতির রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। ১৯৪৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ভারত ইউনিয়নে যোগদানের মাধ্যমে ত্রিপুরা জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অবসান ঘটে। দেশ বিভাগের পর ভৌগলিক অবস্থান সীমারেখার কারণে ত্রিপুরা জাতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের নাগরিকত্ব অর্জন করে। কিন্তু পর্যাপ্ত সাহিত্য সম্পদ না থাকায় আধুনিক প্রজন্ম স্বকীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে ওয়াকিবহাল নয়। তাদের অজ্ঞতা দুর করার জন্য ত্রিপুরা জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, কৃষ্টি লোকাচার প্রভৃতি বিষয় নিয়ে লেখালেখি করার প্রয়াস পেয়েছি। অন্যান্য জাতি গোষ্ঠী নিয়ে যে লেখালেখি করিনি এমন নয়। আমার রচিত গ্রন্থ সমূহে অন্যান্য পার্বত্য জনগোষ্ঠীর কম বেশি তথ্য উপাত্ত সন্নিহিত আছে। তবে পৃথকভবে গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। প্রতিটি জনজাতি স্বকীয়ভাবে নিজেদের ইতিহাস রচনা করুক আমি এই কামনা করি।

কোহেল : ত্রিপুরা জাতির ইতিহাস নিয়ে পূর্বে কোন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে কি?

প্রভাংশু : ত্রিপুরা রাজন্যবর্গের জীবন ও কর্ম নিয়ে ইতোপূর্বে রচিত বহু গ্রন্থ আছে। তবে সমাজ সংস্কৃতি বিষয়ে রচিত গ্রন্থ আমার আগে কেউ প্রকাশ করেছেন বলে আমার জানা নেই।

কোহেল: সাহিত্য সৃষ্টিতে পার্বত্যবাসীর আগ্রহ কেমন?

প্রভাংশু : সাহিত্য সৃষ্টিতে পার্বত্যবাসীর আগ্রহ বর্তমানে বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে অনেকেই সাহিত্য সৃষ্টি করে চলেছেন। তাঁদের সাহিত্যকর্ম বিভিন্ন সংকলনে, সাময়িকীতে, স্মরনিকায় প্রকাশিত হতে দেখি। দুঃখের কথা হল, পার্বত্যাঞ্চলে এখনও প্রকাশনা শিল্প গড়ে উঠেনি। চট্টগ্রাম, ঢাকায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে বড় মাপের অতি পরিচিত লেখকের বই-ই প্রকাশিত হয় বেশি। ফলে নতুন লেখকের সাহিত্য রচনা করার ক্ষেত্রে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আমি মনে করি যাঁরা নতুন লেখক, বর্তমানে লিখেছেন তাঁদের অনেকেরই লেখনির মান খুবই ভালো।

কোহেল : আগামী দিনের আপনার পরিকল্পনা কি?

প্রভাংশু : আমি আমৃত্যু লিখে যাবো। বর্তমানে রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলার ইতিহাস রচনার কাজে হাত দিয়েছি। আগামী বছরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া আমার আরো অনেক বই লেখার ইচ্ছা রয়েছে। আদিবাসী মাতৃভাষার উপরও কাজ করার পরিকল্পনা আছে। দেশের অপরাপর জনগোষ্ঠীর ন্যায় আদিবাসী ছাত্রছাত্রীগণ যাতে স্ব-স্ব মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভ করার সুযোগ পায় সে ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা কামনা করছি।

কোহেল: আমরাও চাই সরকার আপনার ইচ্ছা পূরণ করতে সমর্থ হবে। আর আমরা আশা করি আপনি আরো আরো প্রন্থ প্রকাশ করে আমাদের সাহিত্য অংগনকে আরো সমৃদ্ধ করবেন। আমাকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

প্রভাংশু : আপনাকেও ধন্যবাদ।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

ভাষা শিক্ষায় আশার আলো

একটা সময় ছিলো যখন প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারকে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা মনে করতেন অনেকেই। …

Leave a Reply