অনন্য এক বৈশাখীতে সাধনাটিলায়..

IMG_20150503_071017বাবুছড়ার আঁকাবাঁকা তবে পিচঢালা রাস্তায় চাকমা জাতীয় ড্রেস পিনোন-খাদি পরিহিত একঝাক চাকমা তরুণী-কিশোরী। প্রত্যেকের হাতে একটা ছয় রঙা বুদ্ধ পতাকা। সবার চোখেমুখে এক অনাবিল আনন্দ ও প্রফুল্ল ভাব। অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সাড়িবদ্ধভাবে দাড়িয়ে আছে সবাই। প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তায় তারা র‌্যালি করছে। বৈশাখী পুর্ণিমা র‌্যালী। বাবুছড়া আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে বাবুছড়া সাধনাটিলা বন বিহারের যাচ্ছে র‌্যালিটি। প্রতিটি কর্মসুচী সাজানো-গোছানো। দিঘনিালা ডিগ্রি কলেজ, বাবুছড়া উচ্চ বিদ্যালয়,বড়াদম উচ্চ বিদ্যালয়, উদালবাগান উচ্চ বিদ্যালয় এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক- শিক্ষার্থী অভিভাবকরা অংশ নিয়েছে বৈশাখী র‌্যালীতে। সাধনাটিলা বন বিহারের প্রধান দাতা দাতু মনি চাকমা ও বিহার পরিচালনা কমিটির সভাপতিসহ কয়েকজন দায়িত্বপ্রাপ্ত গণ্যমান্য ব্যক্তি পুরো অনুষ্ঠানটি যাতে সর্বাত্মক সুন্দর হয় সেদিকে সযতœ দৃষ্টি।
তথাগত গৌতম বুদ্ধের ত্রিস্মৃতি বিজড়িত পবিত্র বৈশাখী পুর্ণিমা তিথিটা সমগ্র বিশ্বের বৌদ্ধ জাতির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ ও পবিত্র দিন। তাই এই দিনটিকে যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপুর্ণভাবে উদযাপনের জন্য সাধনাটিলা বন বিহার পরিচালনা কমিটি, বিহার অধ্যক্ষ বুদ্ধ বংশ স্থবিরের ক্লান্তিহীন পরিশ্রম ছিল দেখার মতো। র‌্যালীটি কিভাবে হবে, সেখানে কি কি থাকবে সবকিছুর একটি নির্দিষ্ট ছক ছিলো। রুটিন মাফিক সবকিছুই করার জন্য প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি নেই। সুন্দর এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য ২ মে শনিবার রাঙামাটি থেকে বাবুছড়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলাম আমি এবং ব্যবসায়ী পুর্ণ চক্র চাকমা (চক্ক দা)। বড় ভাই হলেও তিনি সবসময়ই বন্ধুর মতই। পথিমধ্যে আমি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। পরম যতেœ ওষুধ খাইয়ে তিনি আমাকে সুস্থ করে সাধনাটিলা বন বিহারের নিয়ে গিয়েছিলেন। সেটা কখনো ভুলতে পারবো না। সাধনাটিলা বন বিহার পৌঁছেই তো আমি বোকা বনে গেলাম। বর্ণনাতীত অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে আরো অনন্যরূপ এক দিতে নানভাবে সাজানো হয়েছে সাধনাটিলা বন বিহারের চারিদিক। ভাবলাম ভুল করে অন্য কোনো জায়গায় আসলাম নাতো? এত সুন্দর বন বিহার কি হয়? বৌদ্ধ প্রধান দেশ থাইল্যান্ড, মায়ানমার ও শ্রীলংকার প্রভৃতি দেশের স্থাপত্য শৈলীর আদলে নির্মিত হয়েছে বরমাগনী মন্দির, বিহারের প্রধান ভবন, উপগুপ্ত মহাথেরোর মন্দির, সীবলী বুদ্ধ ও গৌতম বুদ্ধের মন্দির। তাছাড়া বিহারের বিভিন্ন পয়েন্টে উন্মুক্ত স্থানে স্থাপন করা হয়েছে বুদ্ধ মুর্তি। পুণ্যার্থীরা এসব মন্দির ও বুদ্ধমুর্তির সামনে বসে নিজেদের মতো করে আপন মনে বুদ্ধ বন্দনা ও প্রার্থনা রত। দু’ হাত জোড় করে আকুল অন্তরে পুণ্যার্থীদের ভক্তি নিবেদন দর্শকদের মনকেও আকুল করে তোলে। মহামানব গৌতম বুদ্ধ জগতের সকল প্রাণীর হিতসুখ ও মঙ্গলের জন্য আড়াই হাজার বছর আগে এই উপমহাদেশে যে ধর্ম প্রচার করে গেছেন তা আজিও আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে নিজেদের মত করে প্রতিপালন করছি আমরা তা ভেবে ভেবে অন্যরকম এক অনুভবে ডুবে গেলাম। কিছুক্ষণ বিহারের চারিদিকে ঘোরার পর বিহার অধ্যক্ষ বুদ্ধবংশ স্থবিরকে বন্দনান্তে কুশল বিনিময়। তাঁর পাশে বিহারের প্রধান দাতা দাতুমনি চাকমা, বিহার পরিচালনা কমিটির সভাপতি জ্যোর্তিময় চাকমাসহ কয়েকজন প্রবীণ মুরুব্বির সাথে শুেভচ্ছা বিনিময়ের পর বৈশাখী পুর্ণিমার প্রস্তুতি সম্পর্কে কিছু জেনে নিলাম। বিহার পরিচালনা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের সৌজন্যতা ও ভদ্রতা ছিল অপরিসীম। তাঁদের বিনয়ী ও ভদ্র ব্যবহার ছিল অকল্পনীয়। মানুষ এত সুন্দর এত ভালো ও এত বিনয়ী-ভদ্র ব্যবহার করতে পারে সেটা আগে আমাদের জানা ছিলোনা।

৩ মে রোববার ভোরে যথাসময়ে আমরা হাজির হলাম বাবুছড়া আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। এখান থেকেই শুরু হবে বৈশাখী শোভাযাত্রা। সময়ের সাথে সাথে জড়ো হতে শুরু করে হাজার হাজার পুণ্যার্থী। বৈশাখী র‌্যালীটির শোভা বাড়াতে নানান রঙের পতাকা, ব্যানার আর বর্ণিল সাজ। সেখানেই দেখা হলো উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান গোপাদেবী চাকমার সাথে। বৈশাখী পুর্ণিমা তিথিতে পুণ্য সঞ্চয় করার জন্য র‌্যালি ও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন তিনি। দিঘীনালা উপজেলার গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিবর্গ সবাই এই বৈশাখী র‌্যালীতে অংশ নেয় প্রতিবছর। ভগবান গৌতম বুদ্ধের জন্ম, বুদ্ধত্বলাভ ও মহাপরিনির্বাণ এই ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত দিনটিকে সুন্দরভাবে পালন করতে নানা কর্মসুচি। পুণ্যার্থীরা কয়েকভাগে ভাগ হয়ে র‌্যালী করলেন। সবার আগের র‌্যালীতে রাজকুমার সিদ্ধার্থের জন্ম দৃশ্য। সেখানে এক শিশুকে রাজকুমার সিদ্ধার্থের বেশে সাজিয়ে সুন্দরভাবে তৈরি করা একটি পদ্মফুলের ওপর দাড় করানো হয়। সিদ্ধার্থ জন্মের পর যেভাবে হাত তুলে বলেছিলেন, এ জগতে আমিই জ্যৈষ্ঠ- আমিই শ্রেষ্ঠ ঠিক সেভাবেই হাত ওপরে তুলে দাড়িয়েছিলো বাবুছড়ার সেই নবজাতক সিদ্ধার্থ। এ ছিলো এক অপুর্ব দৃশ্য। কার মাথা থেকে কিভাবে এসব বের হয় মনে মনে ভাবি। যতই দেখি ততই অবাক লাগে। এরপর আসে অন্য দুটি দৃশ্য, সিদ্ধার্থ ও দেবদত্ত এবং ছন্দক ও সিদ্ধার্থ। রাজ কুমারের বেশ-ভুষায় আসলে দারুণ দেখায় আমাদের আদিবাসী তরুণদের। এই বেশভুষায় বাবুছড়ায় সেই যুবকদের সত্যি সত্যি রাজপুত্র এবং যুবরাজের মতোই দেখাচ্ছিলো।IMG_20150503_091441
সবশেষে আনা হয় বর্ণিল সাজে সুসজ্জিত একটি বিশালদেহী হাতি। হাতির পিঠে পবিত্র বুদ্ধ ধাতু তুলে শোভাযাত্রার অভুতপুর্ব আয়োজন আগে দেখিনি। এমনকি বুদ্ধ ধাতুও জীবনে দেখিনি আমি। সোনালী রঙের সুন্দর দুটি থাইল্যান্ডী পাত্রে তুলে শোভাযাত্রায় নেয়া হয় বুদ্ধ ধাতু। ছোট ছোট গোলাকার রঙের এই ধাতু ছোট্ট একটুা শিশিতে সযতনে রেখেছেন বিহার কতৃপক্ষ। পবিত্র বৈশাখী পুর্ণিমা তিথিতে শোভাযাত্রায় নেয়ার জন্য বের করা হয়েছে। খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেছি শোভাযাত্রা শেষে।
বুদ্ধধাতু সুসজ্জিত হাতির পিঠে তুলে দিয়ে র‌্যালী উদ্বোধন করলেন দিঘীনালা উপজেলা চেয়ারম্যান নবকমল চাকমা, বিহার পরিচালনা কমিটির নেতৃবৃন্দ, ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। সুন্দর পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তি সোনালী রঙের পাত্রটি মাথায় নিয়ে হাতির পিঠে চড়ে বসলেন। এরপর আস্তে আস্তে বিহারের দিকে এগিয়ে চলছে বিশাল দেহী হাতির পিছু পিছু অগণিত মানুষ। সকলের মুখে সাধু সাধু ধ্বনি। বুদ্ধ ধর্ম ও সংঘের জয়গানে চারিদিক মুখরিত। মাইকে সুমধুর সুরে বাজছিলো ধর্মীয় সঙ্গীত। আমার কাছে সবকিছুই নতুন নতুন লাগছিলো। মনে হচ্ছিল আমি প্রতিরূপ দেশে আছি। যে প্রতিরূপ দেশের কথা ভগবান বুদ্ধ বলেছিলেন আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে। ধর্মীয় সঙ্গীত ও সুরের তালে তালে আদিবাসী চাকমা বৌদ্ধ তরুণ-তরুণী, আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার কি এক আবেগী আনন্দ উচ্ছাস! সত্যিই কল্পনাতীত। আসলে এরাই সত্যিকারের বৌদ্ধ। একদিকে বিহারের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, অন্যদিকে রঙ-বেরঙের নানান সাজ-সজ্জা, পাশাপাশি পবিত্র বৈশাখী পুর্ণিমার দিনে হাজারো মানুষের সুন্দর মনের মহান সম্মিলন অন্যরকম এক আবহ তৈরি করেছিলো। অনন্য এক বৈশাখীতে বুদ্ধ পতাকা হাতে চাকমা তরুণীদের পিনোন-খাদি পরে রাজপথে এগিয়ে চলার দৃশ্য বহুদিন চোখে ভাসবে। বুদ্ধধাতু পিঠে বহনরত সুসজ্জিত হস্তীটি যেনো প্রতিদিন স্বপ্নে দেখতে পাই তাই মনে মনে কামনা করি। আগামী দিন দিনগুলোতে যেনো এমন সুন্দর শত শত দিন আমাদের জীবনে এসে আমাদেরকে আলোড়িত করুক, উচ্ছসিত করুক এটাই প্রত্যাশা।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কারাতে ফেডারেশনের ব্ল্যাক বেল্ট প্রাপ্তদের সংবর্ধনা

বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশন হতে ২০২১ সালে ব্ল্যাক বেল্ট বিজয়ী রাঙামাটির কারাতে খেলোয়াড়দের সংবধর্না দিয়েছে রাঙামাটি …

Leave a Reply