নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » অদৃশ্যে যা দৃশ্যমান

অদৃশ্যে যা দৃশ্যমান

একটা সময় ছিল রাতে ঘুমানোর আগেই পরিকল্পনা করতাম সকালে ঠিক কয়টায় উঠব। সেই পরিকল্পনার নিরিখেই কখনো কখনো ঘুম ভাঙতো সূর্য উদয়ের আগে, আবার কখনো কখনো বেলা শেষে! অথচ সেই একটা সময়টাই এখন হারিয়েছে আরেক বাস্তবতায়। শুধুমাত্র অদৃশ্য এক করোনাভাইরাসের প্রকোপে দুনিয়া আজ থেমে গেছে। হয়ত এর আগে এমনিভাবে থেমে যাইনি কখনোই। যদিও ক্ষুদ্র ও খালী চোখে অদৃশ্য ভাইরাস; তবুও সে আজ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিমান। এই শক্তিমানের ভয়েই আড্ডা পাগল মানুষরাও আজ সঙ্গনিরোধ! যে মানুষগুলো সব সময় চাইতো, কবে যে কয়েকটা দিনের জন্য ছুটি পাব। এই ‘মরার’ অফিস করতে আর ভালো লাগে না বলা মানুষগুলোও এখন ঘরে বসে আপসোস করছে সেই ‘মরার’ অফিসে কবে ফিরবে তাই। হয়ত অলস ও কর্মহীন এই সময়টাতেই তারা সবচেয়ে মিস করছে ব্যস্ততার সেই দিনগুলি। কিংবা ট্রি স্টলের রঙ চা অথবা কফি শপের ব্ল্যাক কফি!

বাংলাদেশ সরকারের সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি জেলায়ও একইভাবে সাধারণ ছুটি চলছে। প্রায় পুরো দু’টি মাস যেন আমাদের মত ঘুরে বেড়ানো যুবাদের কাছে বন্দি কারাগার! সেই শহুরে জীবনের ব্যস্ততা, এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতে যাওয়া সবই একটি ঘরের মাঝে সীমাবদ্ধ আজ। কেন জানি এখন আর রাত-দিনের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পাইনা। কারাগারে বন্দি কয়েদি কিংবা চিড়িয়াখানায় বন্দি প্রাণীর রাত-দিনের পার্থক্যই বা-কি?

এখন আর বেলাভরে চলে না ‘আইডি আড্ডা’ কিংবা সন্ধ্যার আগেই অফিসে ফেরা। হয়না রাতে বের হয়ে শহর দেখা, হয়না রাতের চায়ের আড্ডাটাও। কার্যত লকডাউনের দিন যত বাড়ছে চারদিকটা কেন জানি আরও ছোট্ট হয়ে আসছে। সেই একজন-দুইজন থেকে শুরু করে দেশে এখন প্রতিদিন কুড়ি খানেক মানুষ মরছে করোনায়। সংক্রমণও বাড়ছে ব্যাপক হারে। রাঙামাটিতেও সংক্রমণ থেমে নেই। প্রথম ধাপের চার সংখ্যা বেড়ে ছুঁয়েছে সতেরোকে। তবুও কেনজানি মানুষের মাঝে বোধ কাজ করে না! জনসমাগমের স্থান বাজারে প্রতিদিনই মানুষের উপস্থিত যেন বাড়ছে। অলিগলিতেই থেমে নেই আড্ডা।

অবশ্য এ বছর পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সামাজিক অনুষ্ঠান বিজু, বিষু, বৈসু, সাংগ্রাই ও বাংলা নববর্ষের আমেজ পায়নি এ জেলাবাসী। একটা বছর পেরিয়ে আরেক বছর এল যেন গোপনেই। ক’দিন পরেই আবার আসছে ইসলাম ধর্মাবলম্বী ভাইদের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদ। করোনা হয়ত এই ঈদকেও অম্লান করে রাখবে!

তবে, সব খারাপের শেষেও ভালো লাগার কিছু দৃশ্য দেখিয়ে দিল অদৃশ্য এই ভাইরাস। করোনার কারণে রাঙামাটিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলাতেই পর্যটকের সমাগম নেই। এতে করে প্রকৃতির যেন প্রাণ ফিরেছে। অথচ এই সময়টাতেও যেন মানুষের ভারে দম বন্ধ হয়ে যেত প্রকৃতির। গ্রীষ্মের এই দিনে গাছে-গাছে ফুটেছে কৃষ্ণচূড়া। ফোটা ফুল ঝরে পড়ছে ব্যস্ত সড়কেও। কিন্তু দেখে মনে হবে যেন এই সড়কে কেউ কখনো হেঁটেও যায়নি।

স্বচ্ছ কাপ্তাই হ্রদ যেন আরও স্বচ্ছ হয়েছে উঠেছে। নেই ইঞ্জিনচালিত নৌকা, লঞ্চের বর্জ্য, কিংবা ভ্রমণপিপাসু পর্যটকের ফেলে যাওয়া পলিথিন। সব মিলিয়ে করোনা যেন বলছে, প্রকৃতিকে বড্ড বেশি ভালোবাসার কমতি ছিল মানুষের। যেন প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখাতেই এই শাস্তি দিচ্ছে আমাদের। তবুও আশাবাদ একদিন সবই স্বাভাবিক হবে। ব্যস্ত শহর, ব্যস্ত নগর আবারও লোকে-লোকারণ্য হবে। খালি পড়ে থাকবে না চায়ের টেবিল কিংবা পার্কের বসে আড্ডা মারা সেই স্থানটিও। তবে সেই দিনটি কবে ফিরবে আদৌ ফিরবে কি-না তা হয়ত কেউই জানে না।

তবুও ঘরে থাকুন, সঙ্গনিরোধ থাকুন। নিজে বাঁচুন, পরিবারকে বাঁচান, সমাজকে বাঁচান। বাঁচিয়ে রাখুন প্রিয় স্বদেশ-ধরণীকে…

লেখক : অনলাইন ইনচার্জ, দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম

Micro Web Technology

আরো দেখুন

জনপ্রিয় হচ্ছে ‘তৈলাফাং’ ঝর্ণা

করোনার প্রভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল খাগড়াছড়ির পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্র। তবে টানা বন্ধের পর এখন খুলেছে …

Leave a Reply