নীড় পাতা » ফিচার » খোলা জানালা » অথচ থেমে গেছে শৈলেন’র পথচলা

অথচ থেমে গেছে শৈলেন’র পথচলা

spolen-da-pic-022শৈলেন দে। দুটি শব্দ-একটি নাম। পাহাড়ে সংবাদ পত্র জগতে এই নামের পরিচয় একেবারে কম নয়। আমার প্রিয় বন্ধু-তারুণ্য-যৌবনের উচ্ছল আনন্দের স্মৃতিগাথা স্বজন। দুজনে কতদিন কাটিয়েছি নির্ঘূম রাত, বয়ে গেছে সময়। আলোর সন্ধানে ছিলাম। শান্তি-স্বস্তির সৈনিক ছিল শৈলন। আমি চৌধুরী আতাউর রহমান রানা-বন্ধু শৈলেন দে- তাওফিক হোসেন কবীর। উদ্যমী তারুন্য শক্তি। আজ আমি রানা আছি, তাওফিক আছে জীবন্ত সরব। কিন্তু শৈলেন নেই। এখন নিস্প্রাণ-নীরব। বন্ধু প্রতিভাবান তরুনকে হারালাম।

শৈলেন দে। পাহাড়ে সংবাদপত্র বিকাশের জগতে তার নামের পরিচয় একেবারেই কম নয়। এখন না ফেরার দেশে চলে গেছে সে। শৈলেনের ভেতর সম্ভাবনার আলো স্বক্রীয় থাকলেও শৈলেন জানতো না। শৈলেনের ভেতর সুপ্তভাবে লুুক্কায়িত ছিল একটি অভিমানী সত্তা, পাশাপাশি সততা এবং একরোখা মনোভাব। ‘শৈলেন দে’ নামের সাথে সাংবাদিকতাকে জড়াতে গেলে আমাকে-তাওফিক কে বাদ দেবার সূযোগ নেই। আমরা তিনটি মানুষ একটি চিন্তায় স্বপ্নের মাঝ দিয়ে নির্ধারিত লক্ষ্য প্রাপ্তির দুর্নিবার আকাঙ্খায় ঢেউ কেটে কেটে ছুটেছি প্রায় তিন যুগ ধরে। মনে হতো এই তিনজন বর্ণে-বননে, চিন্তাশক্তি মননে, ভাবনার বুননে নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছর ঘুরে তিনটি দশক এভাবেই ছুটেছি। কিন্তু আজ একজন আশাহত মানুষের কথা বলছি। আমি মুক্ত চর্চায় বুদ্ধি চর্চায় পেশাকে লালন করে সরব, তাওফিক তার নির্দিষ্ট চুেক্র সচল গতিধারা। কিন্তু সে -শৈলেন দে আমাদের স্বপ্নকে ভেঙ্গে চলে গেছে না ফেরার দেশে। সে এখন নীরব। এই হারিয়ে যাবার যন্ত্রনায় আমরা আজ ভারাক্রান্ত-চিন্তাগ্রস্ত এবং ভেঙ্গে যাচ্ছি যেন শক্তির সচল চাকার ক্রম ক্ষয়ে।

রানা-শৈলেন-তাওফিক এই তিনটি মানুষ জীবনের উত্থানে, তারুণ্যে উদ্দীপনায় উদ্যমী সাহসকে, মুক্ত বিশ্বাসকে লালন করে পাহাড়ের অশান্তির জীবনের মাঝে এক সময়ের জীবনের মাঝে আঁধার সরিয়ে আলোর খোঁজে ছুটেচি- দিনে কিংবা রাতে নির্ঘুম থেকে। অনিশ্চিত যাত্রায় এগুতে এগুতে খুঁজে ফিরেছি পাহাড়ে স্বস্তি-শান্তি-প্রগতি-অগ্রগতি-সম্প্রীতি। এ লক্ষ্য নির্ধারণ করে তারুণ্যে উত্থান, ঝুঁকি মৃত্যুর হুমকী-অসহযোগীতার বেড়াজাল-সবকিছু ঠেলে, কিছুটা দূরে সরিয়ে আলোকিত পথের সন্ধানে ছুটি। আশি, নব্বই, দুহাজার, দুহাজার দশ-এমন দশকে দশকে পাহাড়ে শান্তি প্রক্রিয়ার উত্তোরন ধারায় বিবর্তিত প্রেক্ষিতে উন্নতির গতি ধারায় যে কজন সাংবাদিক পার্বত্য শান্তি প্রক্রিয়ায় কলম সৈনিক শক্তিমান ভুমিকা রেখেছে সেই দলের একজন সৈনিক শৈলেন দে। আজ অনেকেই বেঁচে আছে-শৈলেন বেঁচে নেই। আমার বন্ধু শৈলেন না ফেরার দেশে চলে যাবার আগে একটু ইঙ্গিতও দিয়ে যায় নি- আমি চলে যাচ্ছি, তোমাদেরও চলে যেতে হবে। এ অনুভব এখন তাড়া করে দিনরাত-অনুখন। আমরা যারা সাহিত্য-সংস্কৃতি কিংবা সাংবাদিকতায় নিপূন সুতোর মালার মতো বন্ধনে আবিষ্ট ছিলাম সেই তিনজনের একজন শৈলেন কে আজ খুঁজে পাবো না। মনে হয় মালাটি ছিড়ে গেল। দুঃখের ভেতর থেকে অগ্নি যাতনা উত্তপ্ত লাভার মতো যেন যন্ত্রনার কোঠরে উত্তাপ ঠেলে দিচ্ছে।Soilen-da-pic-044

পাহাড়ে শান্তি প্রক্রিয়ায় আজ শান্তির সুবাতাস বইছে। একটি আনন্দিত প্রেক্ষিত সম্ভাবনার পথকে ধীরে ধীরে করছে উন্মুক্ত। শান্তির সুবাতাস বইছে। নেতৃত্ব এবং আদর্শিক দ্বন্ধ ছাড়া এখন পাহাড়ে মুখোমুখী শক্তিক্ষয়, দখল-বেদখলের অপচেষ্টা, দ্বিধা-সন্দেহ, ভুল-বোঝাবুঝি আর অশান্তির কালো ছায়া নেই। বর্তমান প্রজন্মের সংবাদ পত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল সাংবাদিকই যারা এজগতকে আলোকিত করার ক্ষেত্রে তথ্য প্রবাহে এগিয়ে যাচ্ছে কলবলিয়ে, তারা হয়তো জানেনা-পেছনের অনেক অজানা কথা। যাদের বয়স ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ তারা কিভাবে জানবে সেই পুরনো দিনের সংবাদ পত্র জগতের কষ্টের স্মৃতিময় অজানা গল্প ? তারা কিভাবে জানবে সাংবাদিক এ,কে,এম, মকছুদ আহমেদ-এর তারুণ্য কিভাবে ক্ষয়ে ক্ষয়ে শান্তির পতাকা হাতে পৌঢ়ে পৌঁছেছে- সে কথা ? তারা কিভাবে জানবে অবর্ণনীয় কষ্টে পড়ে সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে ষাটোর্ধ বয়সে সারা অংগে ব্যাথা লালন করছে। দন্তে-নখে-চোখে নির্যাতনে কষ্ট এখনও সুনীলকে পীড়া দেয় হঠাৎ একা থাকলে। ত্রিশ বছর আগের সেই সংবাদের জন্যে সুনীলের কষ্ট কে জানে ? শৈলেন দে আমার হাত ধরে আড্ডায় আড্ডায় কবিতা থেকে সাংবাদিকতায় এসে নিজের মেধা-শ্রম-নিষ্ঠা-সততা-আন্তরিকতা এবং প্রতিশ্রুতিকে ধরে রেখে সাংবাদিক হিসেবে স্বকীয় অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।soilen-da-pic-01

শৈলেন,তাওফিক এবং আমি-আমরা তিনজনেরই ২৫ বছর আগে ঘর ছিল কি-না জানি না। সাহিত্য-সংবাদের খোঁজ পেলে ছুটেছি শহর হতে দূর গ্রামে পাহাড়ী পল্লীতে। সংসার বলতে যা কিছু বোঝায়-কিছুই ছিল না আমাদের। আমার বাবা মারা যান চট্টগ্রামের পটিয়ায়। ছিলেন সি এন্ড বি ডিপার্টমেন্টের এস.ডি.ও। আর সেই সুবাদেই আমার জন্ম পটিয়ায়। আমার বাবা ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বিয়ের পর পরই আমার মাকে নিয়ে চাকুরীর প্রথম দিকে ময়মনসিংহে কাটিয়েছেন কিছু সময়। তারপর সীতাকুন্ডে। আর সীতাকুন্ডে দায়ীত্বের কারণে রামগড় পর্যন্ত পুরো রাস্তাটি তার উন্নয়ন তত্ত্বাবধানের আওতায় ছিল। ঊনিশ শত তিপ্পান্ন, চুয়ান্ন, ছাপ্পান্ন’র কথা বলছি। তখন রামগড়ের বাইরে খাগড়াছড়ির জন্মই হয়নি। বাবা উইলী জীপ-এ করে মাকে নিয়ে রামগড় যেতেন-থাকতেন এবং ওখানেই খাবাব-দাবার খেতেন। বিয়ের পর পরই অনুভবে পাহাড়ী জীবনের শান্ত-সৌম্য বৈচিত্র্য আবহ আমার মা’কে আকৃষ্ট করেছিল। প্রায় সময় তারা দুজন আমার সবার বড় ভাইকে নিয়ে রামগড় আসতেন, উন্নয়ন কাজ দেখতেন- শিকারও করতেন। এভাবে কেটেছে বেশ ক’বছর। সেই থেকে আমার মায়ের ুেমাহ জন্মে আতপ চাল আর শুটকীর ওপর। এর পর আমার বাবা বদলী হ’ন পটিয়ায়, ঊনিশ শ’আটান্ন ঊনষাট সালের দিকে। ওখানেই তার মৃত্যু হয়-ঊনিশ শ’বাষট্টি সালের আটাশে ডিসেম্বর। আমার এবং আমার ছোট ভাইয়ের জন্ম হয় পটিয়ায়, মুন্সেফ কোয়ার্টার এলাকায়। আমার বাবা প্রকৌশলী আলী আশরাফ ভ্রমণবিলাসী ছিলেন বলে কখনো রাঙ্গামাটি কখনো কক্সবাজার কখনো বান্রবান ঘুরতে যেতেন। সে সময় পথ ছিল বেশ দূর্গম। রেইসা পাহাড় উঠতে গিয়ে তার উইলী জীপ গোঙাতে গোঙাতে ক্লান্ত হয়ে যেত। আমার শিশু বয়সে এসব বুঝতে শিখিনি, গল্প শুনেছি মায়ের কাছে পরে।

একসময় কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের আওতায় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন হতো প্রতি বছর। সে সময় পাহাড় থেকে অনেক ছাত্র-ছাত্রী অংশ নিতো। আর ছোট্ট থাকতেই এসব অনুষ্ঠানে অংশ নিতে, পরিচালনা করতে ঝোঁক ছিল বলে- অংশ নিতাম, উপস্থাপনা করতাম। সে সুবাদে সুইচিং মার্মা, লোকমান, আবুশি, হিমাদ্রীসহ এমন অনেকের সাথেই পরিচয় ঘটে-যোগাযোগ হয়। পাহাড়ে স্বর্ণশীলা মেলা দেখতে আসতাম। বেড়াতাম বন্ধুদের বাড়ি। ঐ নজর থেকেই সম্পর্কের ুটিানে টানে আমার পাহাড়ে স্থায়ী বসবাস। সম্পর্কে আমার ভগ্নিপতি তাজুল ইসলাম রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন। তাঁর সঙ্গে পাহাড়ের দূর্গম অনেক এলাকায় আমি গিয়েছি। তখন দৈনিক বাংলায় ফিচার লিখি। তাজুল ইসলামের বাসা তবলছড়িতে। ওখানে থাকতাম, ঘুরতাম এখানে-ওখানে। আর বনভুমি পত্রিকায় চাকমা ভাষায় লেখা কবিতা পড়ে আকৃষ্ট হয়েছিল। মোহে এই পত্রিকার সম্পাদক এ.কে.এম.মকছুদ আহ্মেদ-এর সাথে এক নজর পরিচয়। ঊনিশ শ’বিরাশি সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড়ী জীবন-সংস্কৃতির খোঁজ-খবর নিতে এসে অনেকের সাথে পরিচয় হয়। সে সময় আমার বন্ধু মরহুম নুরুজ্জামান শেখ, আর আমার প্রেরণা-সাহসের উৎস সে সময়ের সৃষ্টিশীল নির্বাহী প্রযোজক ফিরোজ মাহ্মুদ আর সঙ্গীত পরিচালক সেলিম আশরাফ-আমরা চারজন নানাভাবে রাঙ্গামাটি চষে বেড়িয়েছি। ঐ সময় পরিচয় ঘটে সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, জাফার আহাম্মদ হানাফী, সুনীল কান্তি দে, গৌতম দেওয়ান, সাহানা দেওয়ান, নিরুপা দেওয়ান, নন্দলাল শর্মা, আরফান আলীসহ আরো ক’জনের সাথে। এরই ফাঁকে পরিচয় ঘটে শৈলেন দে, শাহ্রিয়ার রুমী, তাওফিক হোসেন কবীর এবং তার ভাই তাছাদ্দিক হোসেন কবীর-এর সাথে। এর কিছু সময় পর শৈলেন-তাওফিক-এর সহপাঠী পরিশ্রমী বন্ধু সুনীল-এর সাথে। পরিচয় ঘটে,সম্পর্ক হয় নীবিড়। ধীরে ধীরে নীবিড়তায় এক আতœা-একাকার। কথাগুলো এলোমেলো হলেও আসলে একথার পেছনে ছিল অনেক বড় ইতিহাস এবং স্বপ্ন। যা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এরপর যেহেতু দৈনিক বাংলা ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের হয়ে তিন পার্বত্য জেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত, আসা হয়-যাওয়া হয়-লিখা হয়-ঘুরা হয় তখন বেশীর ভাগ সময় থাকি চিটাগাং, আসি রাঙ্গামাটি, মাঝে মাঝে বান্দরবান, মাত্র জেলা হয়েছে। তখন খাগড়াছড়ি জেলা হয়নি। যে কথা বলছিলাম-সব সরে গেল মনের আঙিনা থেকে। কিন্তু একেবারে একেবারে একাকার হলো ২/৩টি পরিবার-শৈলেনের পরিবার,সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার পরিবার আর তাওফিক-এর পরিবার। তখন তাওফিকের বাবা মহকুমা কৃষি কর্মকর্তা হোসেন আহাম্মদ কবীর চাকুরী করেন কৃষি বিভাগে। থাকেন আসামবস্তি কৃষি ফার্মে। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা একজন বিশেষজ্ঞ মানুষ। তার ঘরে কখনো রাতে, কখনো দুপুরে খাবার। তিনি তো যেহেতু ছন্নছাড়া, সেহেতু কোথায় রাত, কি খাওয়া কিছুই হিসেব ছিল না।

তবলছড়ির শেষ মাথায় শাহ্ হাই স্কুলের ঠিক উল্টো দিকে মসজিদের পাশ ঘেঁষে চলে যাওয়া গলিপথে অল্প কিছু পরেই শৈলেনের বাসা। শুধু শৈলেন নয়-রক্তের বন্ধনে সম্পর্কিত ভাই বোন সবাইকে নিয়ে তার মা থাকতো। অল্প বয়সে বাবাকে হারায় শৈলেন। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার বাবা শহীদ হ’ন, সঙ্গে আরো ক’জন আত্মীয়। এ ধাক্কা অল্প বয়সে বেসামাল করে দেয় তাকে। কিন্তু মনের দিক থেকে খুব আয়েসী ছিল শৈলেন। কখনো পরতো খড়ম, কখনো কাঠের সেন্ডেল। ধুতিও পরতে দেখেছি তাকে। উদোম গায়ে যখন এসে বসতো তখন তার চেহারা দেখে মনে হতো কে যেন তার গায়ে হলুদ মেখে দিয়েছে। আমাকে এবং তাওফিক’কে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে দেখলেই প্রাণবন্ত এ তরুন উঠতো খলবলিয়ে। চাপাভাবে কথা বলতো শৈলেন, লিখতো ছোট ছোট করে চমৎকার কবিতা। বেশী লিখতো না, কিন্তু আবৃত্তি করতে পছন্দ করতো। একটা কথা না বল্লেই নয়-কেন যে শৈলেন চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে কিংবা তার কাঠের ইজি চেয়ারটি ছেড়ে দিতো আমাকে-কেন, তা আজও জানতে পারিনি। জোর করে ধরে বসাতো। প্রথম প্রথম দ্বিধা ছিল, পরে দ্বিধা কেটে গেছে। শৈলেন শুরু থেকেই কেন জানি ওস্তাদ বলে সম্বোধন করতো। কিছু ুহলেই-ওস্তাদ এটা না, ওটা হ্যাঁ। আর বন্ধু সুনী আসলেই একেবারেই জম্জমাট-প্রাণবন্ত। জন্ম হতো এক আনন্দস্নাত পরিবেশের। শৈলেনের দুজন চাচাত বোন লিপা-শিলু টুক্টাক্ খাবার দিত আমাদেরকে, ওপরে। শিলু-লিপাদের পাঠানো খাবার সাথে সুনীলের আনা জলে কলের জল মিশিয়ে মিশিয়ে একটু একটু খেতাম। রাত গভীর হতো, শান্ত হতো পুরো মাঝের বস্তি এলাকা। এই শান্ত শহরে দ্রুত পায়ে আমি আর তাওফিক দ্রুত পায়ে সুনীলসহ কিছুটা পথ পেরিয়ে চলে যেতাম যার যার ঠিকানায়। ওখানে আড্ডা হতো, ঘটনা পর্যালোচনা হতো, অনেক বিষয় নিয়ে মূল্যায়ন হতো। এমন চলতে চলতে এক ফাঁকে শৈলেনকে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো গিরিদর্পণে। আমি আমার বন্ধু আবুল মনসুর সেলিমের চাপে আর মকছুদ ভাইয়ের সরল অভিব্যাক্তি আর কাজ করার আহ্বানে সুযোগ লুফে নিই। বলা চলে গিরিদর্পণ-বনভুমির সম্পাদকের সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব নিই। তবলছড়িতে থাকা পাৃল্টে গিয়ে আমার অবস্থান হয় রিজার্ভ বাজারে গফুর হাজীর গুদামঘরে। রাঙ্গামাটি গেলেই এখানে থাকা, অন্যথায় চিটাগাং ফিরিঙ্গী বাজারে। কারণ ওখান থেকেই ছাপা হতো বনভুমি-গিরিদর্পণ। রিজার্ভ বাজারে ছোট্ট একটি প্রেস ছিল, পত্রিকা ছাপার সুযোগ ছিল না। এই রিজার্ভ বাজারে আমি, মকছুদ ভাই, সুভাষ আর বোবাইয়ার চার জনের সংসার।

মকছুদ ভাইয়ের ছোট ভাই হুমায়ুন তখন রাঙ্গামাটি আসে, টুক্ টাক্ কাজ করে। মাঝে মাঝে বসে রাঙ্গামাটি প্রকাশনীতে। তখন কাজের প্রয়োজনে-পত্রিকায় সংবাদের স্বার্থে শৈলেন দে’কে আমি যতটা পারি গিরিদর্পণের সাথে মিশিয়ে দিই। প্রথমে শহরের খবর-পরে মাঝে মাঝে বড় বড় বিষয় নিয়ে লেখা-পরে আস্থা অর্জণ করে নিজেই হয়ে গেলেন বার্তা সম্পাদক। শৈলেন আছে বলেই আমি আছি। দুটো শক্তি-একত্রে একটি শক্তি। যে কারণে দৈনিক গিরিদর্পণ-সে সময়ে আশির দশকে সবচেয়ে জনপ্রিয় পাঠক নন্দিত পত্রিকা। যদিও টেবলয়েড সাইজ, কিন্ত চাহিদা অনেক। গিরিদর্পণে কাজ করতে করতে মকছুদ ভাই আমার আর শৈলেনের সাথে মিশিয়ে দেন প্রতিম রায় পাম্পু, অঞ্জন দে, জামাল উদ্দিনসহ একঝাঁক তরুনকে। এদের মধ্যে সাংবাদিকতায় আসে দু’জন-অঞ্জন দে আর জামাল উদ্দিন। ওরা মেধাসম্পন্ন, কিন্তু এখন ভিন্ন পেশায়। পরে পুলক চক্রবর্তী, ওলি আহমেদ, শামসুল আলম। এই তিনজন সরাসরি আমাদের সঙ্গে চলতে চলতে আড্ডায়-আলোচনায়-মেধা চর্চায় আজকের রাঙ্গামাটি জেলায় স্বনামে-সুপরিচিত খ্যতিমান তরুণ সাংবাদিক। কিন্তু এই ঝাঁকে দলের আগে যে দুজন মানুষ অভিভাবকের মতো চলতেন, তাঁদের একজন আজ আর নেই। তিনি শৈলেন দে। অনেক কষ্ট হয় এই নাম উচ্চারণে। কারণ, আমি আছি-বন্ধু তাওফিক আছে, বয়সে বড় সুনীল দে আছেন, সবার বড় মকছুদ ভাই আছেন-কিন্তু সে নেই। এই কষ্ট খামচে আছে বুকে। এলোমেলো হলেও এই কথাগুলো বল্লাম, যা’ না বল্লে স্মৃতি ম্লান হয়ে যাবে। এই কষ্টে মাঝে সম্ভাবনাময় তরুণ সাংবাদিক ফজলে এলাহীর অনেকটা চাপে পড়ে এই লিখাটি লিখতে হলো। আমি বাংলাদেশ টেলিভিশনের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো বৈচিত্র্য-ঐতিহ্যিক জীবনধারা এবং বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে অনুষ্ঠান করার দায়িত্ব পেলে শৈলেন-তাওফিক ওরা দুজন আমাকে সহযোগিতা-সাহায্য-প্রেরণা-উদ্দীপনা এবং দৃষ্টিভঙ্গী বিনিময়- বিষয় নির্ধারণ- এসব কিছুতে সাহস ও উৎসাহ যুগিয়েছে বরাবর। আর সাংস্কৃতিক পরিবারের সদস্য বন্ধু জীবন রোয়াজা আজকে যিনি নির্বাহী প্রকৌশলী, রণেশ্বর বড়–য়া, দিলীপ বাহাদুর, মনোজ বাহাদুর, মুজিবুল হক বুলবুল, হুমায়ুন কবীর, প্রদীপ বাহাদুর লালে, স্বদেশ দাশ, সজীব বাবুসহ আরো অনেকে আমাকে সহযোগিতা করেছে। সর্বোপরি সাহানা দেওয়ান, নিরূপা দেওয়ান, গৌতম দেওয়ান সহযোগিতা করেছে বলেই আজ আমি একত্রিশ বছ ধরে সারা দেশের কহু ভাষাভাষি ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর জীবন-সংস্কৃতি নিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিয়মিত অনুষ্ঠান ‘বনফুল’ পুরে লোক-লোকালয় নামের অনুষ্ঠানটি এখনো সংগঠন-উপস্থাপন করছি একজন অনুঘটক হিসেবে। এই সাফল্যের পেছনে প্রয়াত সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার অবদান খাট করে দেখা যাবে না কোনো ভাবেই।

বাবা-মায়ের পাহাড়ের প্রতি আকর্ষণ ও সম্পর্ক এবং আমার বন্ধু সাংবাদিক সৈয়দ আব্দুল ওয়াজেদ-এর বাবা রাঙ্গামাটি সরকারী হাই স্কুলের ইংরেজী শিক্ষক মরহুম আব্দুস সামাদ কিংবা নির্বাহী প্রকৌশলী দুলাভাই তাজুল ইসলামের সম্পর্কের কারণে পাহাড়ে আসা-এখন পাহাড়েই বসবাস এবং পাহাড়ীদের মাঝে নিজেকে মেলে ধরে আছি।

বন্ধু সাংবাদিক শৈলেন দে আমাকে এবং তাওফিক’কে ছেড়ে চলে যাবে এত আগে-যা আমার ভাবনার গন্ডীতে ছিল না। নির্দয় হলেও সত্যি-শৈলেনের মত সবাইকেই একিিদন চলে যেতে হবে। কেউ আগে, কেউ পরে। মৃত্যু নিশ্চিত। কিন্তু জন্ম জন্মান্তরের পথে যদি কেউ বাড়ন্ত বয়স থেকে যতদিন বেঁচে থাকেন, এ’সময়টিতে যদি কিছু মনে দাগ কাটে কিংবা কল্যানের উৎস হয়-এমন কাজ করে যান- তিনি বেঁচে থাকেন সারাজীবন। কারও মৃত্যুর পর তার সুখ্যাতি-সুনাম, অস্থায়ী-ক্ষণস্থায়ী-স্থায়ী কিংবা চিরস্থায়ী তার সাফল্যকর্ম অক্ষুন্ন থাকে। আলোকবর্তিকা হিসেবে পথ দেখায়। আর ঐক্যের বন্ধনে শক্তি যোগায়। সাংবাদিক শৈলেন দে তেমটি একজন শক্তিমান মানুষ। বন্ধু শৈলেন দে সম্পর্কে যদি মূল্যায়ন করতে বলা হয়- আমি নির্দ্বিধায় বলবো-শৈলেন দে একজন সৎ সাংবাদিক। তিনি নিষ্ঠাবান পরিশ্রমী তরুণ। জ্ঞান মেধাসম্পন্ন আধুনিক মনস্ক সমাজ সংস্কারক। আমি হলফ করে বলছি- আমার দেশে যত সাংবাদিকই আছেন তাঁর মাঝে সৎ-উত্তম চরিত্রের অধিকারী হাতে গোনা দুচারজন যে সাংবাদিক আছেন-আমাদের শৈলেন দে’র নাম শীর্ষে। আমি কতটা সৎ জানিনা, কিন্তু শৈলেন দে’র সততা, সরলতা, সহমর্মিতা, সাহার্য, সাহচর্য, সহযাত্রা, সহযোগিতা, সহ-অবস্থান অনেক বড় গুণ। শৈলেন দে’কে হারিয়ে চলমান পার্বত্য স্থায়ী শান্তি প্রক্রিয়ায় আমরা একজন কলম সৈনিককে হারালাম। ক্ষতি অপূরণীয়।

স্মৃতিকথা আর একটু বলতে হয়। সংসারে পারিবারিক সীদ্ধান্তে বিয়ে করার প্রসঙ্গ এল আমি যেভাবে পালাতাম, তার চেয়ে বেশী দৌড় ছিল শৈলেনের। তাওফিক সিদ্ধান্তহীতায় ভুগতো। কিন্তু এক ক্ষণে-তিথিতে শৈলেনের ঘাড়ে বিয়ের চাপ আমরাই দিলাম। তার বিয়েতে তার সহযাত্রী হিসেবে কালীবাড়ি থেকে রাউজান পর্যন্ত সেই লগ্ন আসার আগ পর্যন্ত যতরকমের আনুষ্ঠানিকতা ছিল, শৈলেনের সাথে থেকে আমরাও উপভোগ করেছি-সাহস দিয়েছি। বরের বন্ধু বলে লগ্ন আসার আগ পর্যন্ত উপোষ থেকেছি। আর শৈলেন বিয়ে করে আসার পর তার সামাজিক আনুষ্ঠানিকতায় স্বীকৃতিপর্বে আমরা ছিলাম অগ্রগণ্য বন্ধু। আজ এসব স্মৃতিকথা বেশী বেশী মনে পড়ে। যদিও শৈলেনের আগে তাওফিক বিয়ে করে শৈলেন এবং আমাকে সাহস যুগিয়েছে। তাওফিক-এর সুখ দেখে আমরাও সাহসূ হই। শৈলেনের পর পর আমিও বিয়ে করি অল্প সময়ে। মূলতঃ আমার জীবনের বেশীর ভাগ সময় কেটেছে মাঝের বস্তির ত্রিপুরা বাড়িতে। মাসী ভানুমতি ত্রিপুরা তার দুই ছেলে মলয় ত্রিপুরা ও মনোজ ত্রিপুরার বাইরে আমাকে দেখতো বড় ছেলে হিসেবে। আমাকে কড় কড়ে রান্না করা ভাত দিত। আমি ঐ পরিবারের সঙ্গে খেয়ে-থেকে নিজেকে বড় করেছি। আমার বিয়ের পর নতুন বউ মাঝের বস্তির ত্রিপুরা বাড়িতে উঠেন।

একেবারে মায়ের মত আদর দিয়ে আমাকে আগ্লে রেখেছিলেন। যে কারণে আজও আমি ঘোষণা দিই-ভানুমতি ত্রিপুরার কাছে আজন্ম কৃতজ্ঞ আমি। না বল্লেই নয়, আমি নতুন বিয়ে করে আসার পর আমরা যেভাবে শৈলেনের বউ বরণ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, তাওফিক-শৈলেনও আমার বউ বরণ নিয়ে ব্যস্ত সহয়। শৈলেন-তাওফিক, অলি, মলয় ত্রিপুরা, মনোজ ত্রিপুরা, বঙ্কিম আসাম, অনিল আসাম, এমন আরো অনেকসহ ভুঁইয়া মোখলেছুর রাহমান ভাই এবং বন্ধু জসীম উ্িদ্দন এর বুদ্ধি এবং কৌশলী কর্মপ্রক্রিয়ায় রাঙ্গামাটিতে আমার নব বধুকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করা হয় বিয়ের সাত মাস পর। অবশ্য বউ বরণ অনুষ্ঠানটি ছিল একটু ভিন্ন ধাাঁচের। সবাই বউ ভাত অনুষ্ঠান করে। কিন্তু আমার বউ বরণ অনুষ্ঠানের নাম ছিল ‘বউ চা’ অনুষ্ঠান। যা একেবারেই নতুন একটি ধাঁচ। শহরের গণ্য-মান্য থেকে শুরু করে বহু শিল্পী-সাংবাদিক, প্রশাসনিক সকলেই এসেছিল, ‘বউ চা’ অনুষ্ঠানের কথা শুনে, নিমন্ত্রিত হয়ে-যোগ দিতে। সবাইকে আমন্ত্রন জানিয়ে সেই অনুষ্ঠানের চিঠিটিতে নিমন্ত্রনকারী ছিলেন-তাওফিক ও প্রয়াত বন্ধু শৈলেন দে। একথাগুলো এ’কারণেই শুধু বল্লাম-শৈলেন অনেক কিছু দিয়ে গেছেন আমাদেরকে। কিন্তু আমরা তাঁকে তেমন কিছুই দিতে পারিনি। যেহেতু পার্বত্য শান্তি প্রক্রিয়ায় একজন আদর্শ কলম সৈনিক ছিলেন শৈলেন দে-অসাম্প্রদায়িক পার্বত্য অঞ্চল গড়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। পাহাড়ী-বাঙ্গালীর বিভক্তির দেয়াল ভেঙে একটি সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ার কাজে সচেষ্ট থাকতেন যিনি- নিেেজকে দংশন করে অন্য কাউকে বিষমুক্ত করার কাজে নিবেদিত ছিলেন প্রয়াত সাংবাদিক শৈলেন দে। দারিদ্রক্লিষ্ট টানাপোড়নের জীবনে তিনি নতজানু হননি কখনো। একরোখা এবং সততার আদর্শে যে সাংবাদিকের বিকাশ-তার জীবনের অবসান ঘটেছে। তার জীবনের সবগুলো দিক মূল্যায়ন করে স্থায়ী শান্তি স্থাপনের জন্য যার যার অবস্থান
থেকে কাজ করছেন- এই প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক অবস্থানে আছেন- তাদের শৈলেন দে’র অসহায় পরিবারের কাছে দাঁড়ান বড় বেশী জরুরী হয়ে পড়েছে। তার সন্তানদের ভবিষ্যতের উন্নতির জন্যে সাহার্য করা প্রাসঙ্গিক বিষয়। শৈলেন দে’র বাবা শহীদ হয়েছেন মৃক্তিযুদ্ধে। মা কষ্ট করে তাদের আঁকড়ে রেখেছেন। আর কাপ্তাই বাঁধ সৃষ্টির কারণে শৈলেন দে’র জমি সব দুঃখের জলের নীচে চাপা পড়ে আছে। কিছুই পায়নি তাঁরা। এই পরিবারের পাশে সহৃদয়বান প্রতি জনেরই আন্তরিক সহযোগিতাপূর্ণ অবস্থান আশা রাখি। একটি উদয়ের তারা ঝরে গেছে। কিন্তু তারাভরা আকাশে কালো মেঘের ছায়া। আমরা কি এই কালো মেঘ দূর করতে পারি না ?
যুগ যুগ জিয়ো শৈলেন। যুগ যুগ জিয়ো। তোমার আদর্শ নতুনদের অনুপ্রাণিত করুক। তোমার শোকে শোকাহত পরিবার শক্তি সঞ্চয় করুক। বিধাতার কাছে এই প্রার্থণা করি।

লেখক : বাংলাদেশ স্থানীয় সংবাদপত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং খাগড়াছড়ি থেকে প্রকাশিত দৈনিক অরণ্যবার্তা’র সম্পাদক

Micro Web Technology

আরো দেখুন

ফুটবলের বিকাশে আসছে ডায়নামিক একাডেমি

পার্বত্য এলাকা রাঙামাটিতে ফুটবলকে আরও জনপ্রিয় করে তোলা, তৃনমূল পর্যায় থেকে ক্ষুদে ফুটবল খেলোয়াড় খুঁজে …

Leave a Reply