নীড় পাতা » ব্রেকিং » ‘অজানা ভয়’-এ ‘বিরল সমঝোতা’য় পাহাড়ের তিন দল !

‘অজানা ভয়’-এ ‘বিরল সমঝোতা’য় পাহাড়ের তিন দল !

pic-02
মিজোরামে বিপুল অস্ত্রসহ আটক পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি আঞ্চলিক সংগঠনের নেতারা
pic-01
এমন অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি পাহাড়ের নৈমত্তিক ঘটনা

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি বড়ই বিচিত্র আর বর্ণিল। এখানে এককালের মিত্র পরিবারগুলো যেমন পরিণত হয় শত্রুতে,তেমনি ঐতিহাসিকভাবে শত্রু পরিবারগুলোরও নিকটাত্মীয়তে পরিণত হওয়ার নজির দৃশ্যমান। তেমনি যে জনসংহতি সমিতির প্রকাশ্য রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জন্ম হয়েছিলো পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের,সেই সংগঠনের সভাপতি প্রসিত বিকাশ খীসা,সঞ্চয় চাকমা,দীপায়ন খীসাদের নেতৃত্বেই ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তির বিরোধীতা করে জন্ম হয়েছিলো ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)।
শুধু কি রাজনৈতিক বিরোধীতা ! দুই দলের সশস্ত্র লড়াইয়ে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত: ছয়শ মানুষ। এদের বেশিরভাগ এই দুই দলের কর্মী বা সমর্থক। আছে সাধারন গ্রামবাসী বা দশ মাস বয়সী শিশুও। শুধুই এই দুই দলই নয়,২০০৯ সালে জনসংহতি সমিতি থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন করে তৈরি হয় রূপায়ন দেওয়ান-সুধাসিন্ধু খীসা-তাতিন্দ্রলাল চাকমা পেলেদের নতুন দল-জনসংহতি সমিতি ( এমএনলারমা)। ইতোমধ্যেই এদেরও প্রায় ত্রিশজন কর্মী মারা গেছে সশস্ত্র হামলায়,যাদের মধ্যে রয়েছেন সুদীর্ঘ চাকমার মতো মেধাবী ও সাবেক পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সভাপতিও।

এমন সশস্ত্র সন্ত্রাস,হত্যা,খুন,অপহরণ ভুলে হঠাৎ করেই যেনো পরস্পরের প্রতি গভীর ভালোবাসায় জড়িয়ে গেলো দল তিনটি। অতীতে বারবার পাহাড়ী সুশীল সমাজ,দাতা সংস্থা,এনজিওরা চেষ্টা চালিয়েও যাদের এক নৌকায় তুলতে পারেনি,সমঝোতায় আনতে পারেনি,তারা নিজেরাই হঠাৎ ‘সমঝোতা’ করে বন্ধ করে দিয়েছে সশস্ত্র সংঘাত,ভ্রাতৃঘাতি হত্যা। বিষয়টি ভীষণ আনন্দের,সবার কাছেই। সাধারন মানুষ এটিকে ভালোভাবেই নিয়েছে। শুধু,নিহত ছয়শ জনের পরিবার হয়তো ভাবছে, এই সমঝোতা আরো আগে হলে হয়তো তাদের প্রিয় স্বজনের জীবন অন্তত: বাঁচতো।

pic-03
এভাবেই তিন দলের সংঘাতে প্রাণ খুইয়েছে কয়েকশ মানুষ

কিন্তু কি সেই চাবিকাঠি,যার কারণে হঠাৎই পরস্পর বৈরি তিন সংগঠন নীরব সমঝোতায় অংশ নিচ্ছে ! অনুসন্ধানে এবং সংগঠনটির তিনটির বিভিন্ন স্তরের অন্তত: সাতজন নেতার সাথে কথা বলে জানা গেছে,আসলে ‘ভয়’ই আপাতত: কাছাকাছি নিয়ে এসেছে তাদের ! কি সেই ভয় ?

গত কয়েকমাস আগেই পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ অস্ত্র ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান শুরু করে যৌথবাহিনী। ধরা পড়ে বেশ কিছু অস্ত্র ও অস্ত্রবাজ। যৌথবাহিনীর সরাসরি এ্যাকশনে মারাও হয় বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী। আপাতত দৃষ্টিতে প্রায় সবগুলো অভিযানেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইউপিডিএফ। আইনশৃংখলা বাহিনীর এমন কঠোর এ্যাকশনে ভয় পেয়ে যায় সংগঠনটি,কার্যক্রমও কিছুটা শিথিল হয়ে পড়ে তাদের।

pic-04
পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য অস্ত্র আনার সময় আটক হওয়ার পর সেখানকার পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ

ইউপিডিএফ এর বিরুদ্ধে এ্যাকশন দেখে প্রথমে খুশিই হয়েছিলো জনসংহতি সমিতি(সন্তু)। কিন্তু ‘অচেনা ভয়’ গ্রাস করে তাদেরও। তাদের শীর্ষ পর্যায়ে এই আতংক ভর করে যে,ইউপিডিএফ এর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ধ্বংস করার পর আইনশৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনী তাদের দিকেও হাত বাড়াবে ! তখন ‘অস্ত্রহীন’ গনতান্ত্রিক রাজনীতি করার রাজনৈতিক বুলি সংকটে পড়বে, এমন শংকায় পড়ে দলটিও। আবার আরাকান আর্মির নেতা রেনিন সো গ্রেফতার হলে তার সাথে জনসংহতি সমিতির সভাপতির অন্তরঙ্গ কিছু ছবি ফাঁস হওয়ায়,তাদের সম্পর্কের যোগসূত্র নিয়ে সতর্ক হয়ে উঠে আইনশৃংখলা বাহিনীও।

ফলে আপাতত: পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিকল্প হিসেবে নিজেদের মধ্যে আপদকালীন ‘বিরল সমঝোতা’য় বসে দল দুটি। পৌঁছায় মতক্যৈ। বন্ধ করে সশস্ত্র হামলা। প্রধান দুই দলের সমঝোতায় অংশ নিতে বাধ্য হয় তৃতীয় দলটিও (জনসংহতি সমিতি-এমএনলারমা অংশ)। ফলে দৃশ্যত: গত তিনমাস পাহাড়ে সশস্ত্র সংঘাত হয়নি বা করা হয়নি। বরং পরস্পরের কর্মসূচী সফল করতে দেখা যাচ্ছে পরস্পরকে। এক দলের কর্মসূচীতে অংশ নিচ্ছে আরেক দলের মানুষ। এমনকি নানিয়ারচর সেতু উদ্বোধনকালে একই স্পীডবোটে অন্তরঙ্গ মুহুর্তে দেখা গেছে উষাতন তালুকদার ও শক্তিমান চাকমাকে ! আবার জনসংহতির ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়েছে নানিয়ারচরেও,যেখানে গত ১৮ বছর কোন কর্মসূচীই পালন করতে পারেনি দলটি। সর্বশেষ ২ ডিসেম্বর রাঙামাটি শহরে জনসংহতির সমাবেশে অংশ নিচ্ছে ইউপিডিএফ এর সমর্থক এলাকাগুলোর হাজারো মানুষ।
পাহাড়ের এই তিন দলের ঐক্যকে ‘সতর্ক’তার সাথেই পর্যবেক্ষন করছে আইনশৃংখলা বাহিনীও। তারা বিষয়টি ‘ইতিবাচক’ ও ‘নেতিবাচক’ দুইভাবেই বিশ্লেষন করছে।
আইনশৃংখলা বাহিনীর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ওরা কেনো কি কারণে এমন ‘সমঝোতা’য় পৌঁছেছে তা আমরা জানি ও বুঝি। কিন্তু যদি তারা সন্ত্রাস,চাঁদাবাজি ছেড়ে দিয়ে নিজেদের মধ্যে ঐক্যের পথে বাড়ায়, আমাদের কোন সমস্যা নেই। কিন্তু যদি সংঘবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সাধারন মানুষের বিরুদ্ধে কোন ‘অগনতান্ত্রিক’ কর্মসূচী নেয়,তবে তা কিভাবে মোকাবেলা করা হবে সেই প্রস্তুতিও আমাদের আছে। রাষ্ট্রবিরোধী কোন তৎপরতাকেই ন্যুনতম ছাড় দেয়া হবেনা বলে জানিয়ে দেন তিনি।

তবে নিজেদের ভেতরকার এই ‘অদৃশ্য ঐক্য’ নিয়ে খুব একটা প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না দলগুলোর দায়িত্বশীল নেতারা। এমনকি এনিয়ে কথা বলতে আগ্রহী নয় সুশীল সমাজের মানুষও। তবে একজন বললের, এই ঐক্য কতদিন থাকে,আর তা কোনদিকে মোড় নেয়, আর বাঘে মহিষে একঘাটে কতদিন জল খায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে ‘অজানা ভয়’ই যে তিনদলের মধ্যে ‘বিরল সমঝোতা’র ভীত রচনা করেছে,সেই মতকে সমর্থনকারি মানুষের সংখ্যাটাই বেশি।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

রাঙামাটিতে এক দিনেই ১১ জনের করোনা শনাক্ত

শীতের আবহে হঠাৎ করেই পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি জেলায় করোনা সংক্রমণে উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। বিগত কয়েকদিনের …

One comment

  1. অনেক তাজা রক্ত ঝড়ে গেলো,প্লিজ আর নয়।

Leave a Reply

%d bloggers like this: